
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোর আত্মহত্যার ঘটনার বিচার এবং বিভাগে বিরাজমান নিপীড়ন বন্ধের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এ ঘোষণা দেন। এ সময় এ ঘটনায় দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করাসহ সাত দফা দাবি তুলে ধরেন তাঁরা।
গত রোববার বাড্ডা থেকে মিমোর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে আটক করে পুলিশ। পরে বাড্ডা থানায় তাঁর বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেন মিমোর বাবা। ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় আয়োজিত সমাবেশ চলাকালে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনের নেতারা। বিভাগের চেয়ারম্যান ও শিক্ষকেরাও শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে বিভাগের চেয়ারম্যান কাজী তামান্না হক সিগমা বলেন, ‘আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভাগের সব শিক্ষক একাত্মতা প্রকাশ করছেন। তাঁদের চাওয়া মানে আমাদের সবার চাওয়া। আমাদের এখতিয়ারভুক্ত যত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, তার সবই আমরা নিয়েছি। আমি প্রক্টর ও ডিনকে জানিয়েছি। বিভাগের সব কার্যক্রম, ক্লাস ও পরীক্ষা থেকে সুদীপ চক্রবর্তীকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’
শিক্ষকের কক্ষে তালা দেওয়ার বিষয়ে তামান্না হক বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য এবং পরবর্তী সময়ে ভেতর থেকে কোনো আলামত যেন নষ্ট না হয়ে যায়, সে কারণেই তালা দেওয়া হয়েছে। আমরা আগের তালাটি খুলিনি, সেটির ওপর নতুন একটি তালা দিয়েছি, যাতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলামত অন্যের হাতে চলে না যায়।’
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ লক্ষ করছি না। যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, তা আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই।’
ডাকসুর এই নেতা বলেন, ‘তাঁরা (বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন) যদি আমাদের শিক্ষার্থীর সাথে যে ঘটনাটি ঘটেছে, সে বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারে, তাহলে শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলনের ঘোষণা করেছে, সে লড়াই আমরা (ডাকসু) চালিয়ে যাব।’ তিনি আরও বলেন, ‘থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থীরা সাত দফা দাবি জানিয়েছেন এবং এর অংশ হিসেবে সব একাডেমিক কার্যক্রম বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। ডাকসুর পক্ষ থেকে এ দাবির সঙ্গে আমরা সংহতি জানাচ্ছি।’
সমাবেশে শিক্ষার্থীরা মিমোর আত্মহত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ সেলের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তাঁরা।
থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা তাসনিম হৃদি বলেন, ‘আমাদের দাবিগুলো আপনারা ইতিমধ্যে জানতে পেরেছেন। এখন দেশের আইনি প্রক্রিয়ার ওপর যথেষ্ট সম্মান রেখে আপনাদের কাছে আহ্বান জানাই, এই তদন্ত যেন স্বচ্ছভাবে হয়।’
ফারিহা তাসনিম আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে কী রকম সম্পর্ক বহাল থাকবে, তার একটি স্পষ্ট নীতিমালা তৈরি করতে হবে। শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ কেমন হওয়া উচিত, সেটা কত দূর গড়াতে পারে বা তা ভীতির কারণ হতে পারে কি না, সেগুলো নিয়ে আবার আলোচনায় আসা দরকার।
মিমোকে জড়িয়ে কোনো প্রকার অপতথ্য যেন না ছড়ানো হয়, সে বিষয়ে ফারিহা তাসনিম সংবাদমাধ্যমকে অনুরোধ জানান। পাশাপাশি দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের সহায়তা কামনা করেন এই শিক্ষার্থী।
বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী অর্ক বড়ুয়া বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে এ ঘটনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে স্পষ্ট ও কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রক্টর ও উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কথা জানান।