‘আমার শ্বাস নিতে অনেক কষ্ট অইতাছে, হাসপাতালে আসবার সময় জ্যামে (যানজটে) পইড়া মইরা যাইবার লইছিলাম। আমার খুব কষ্ট অইতাছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে স্ত্রী নাছিমা খাতুনের কোলে মাথা রেখে হাসপাতালের বেঞ্চে শুয়ে পড়েন বরকত আলী (২৯)। বরকত আলীর পুরো শরীরে লাল ছোপ ছোপ র্যাশ। শরীরের ওপরের অংশে একটি গামছা কোনোমতে জড়িয়ে রয়েছেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড-১৯ হাসপাতালে দেখা যায় এ দৃশ্য। হামের উপসর্গ নিয়ে বরকত আলী সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থেকে এসেছেন। সঙ্গে স্ত্রী ছাড়া ছোট ভাইও এসেছেন। তাঁরা দ্রুত তাঁকে চিকিৎসকের কক্ষে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাঁকে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিয়ে ওপরে পাঠিয়ে দেন।
নাসিমা খাতুন জানান, তাঁর স্বামী গাজীপুরে একটি চীনা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পর জ্বর আসে। শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। তিন দিন আগে ১২ হাজার টাকায় গাড়ি ভাড়া করে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকার এই হাসপাতালে এসেছিলেন। তখন শরীরে র্যাশ কম থাকায় চিকিৎসকরা ভর্তি নেননি। ওষুধ লিখে দিয়ে বাড়িতে চলে যেতে বলেন। তাঁরা বাড়ি চলে যান। এরপর বরকত আলীর জ্বর ও র্যাশ বাড়তে থাকে। বাধ্য হয়ে আজ আবার হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
এর আগে যখন হাসপাতালে এসেছিলেন, তখন ভর্তি নিলে আজকে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না—এমটাই মনে করছেন নাসিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘ডাক্তার বলছেন, ওষুধ খাইলে কইমবো। ওই ওষুধ নিয়মিত খাওয়ায়তেছি কিন্তু কমে নাইকা। আরও বেশি অইছে। ওই দিন ভর্তি করলে এই দুই দিনে সুস্থ অইলোনি। কিন্তু ওই দিন রাহে নাই এরা। আইজকা ভর্তি দিছে।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছেন। এখানে এখন পর্যন্ত ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ১৬ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি।
বেলা দেড়টার দিকে স্যালাইন হাতে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামতে দেখা যায় বিপ্লব শেখ (৩৪) নামের এক রোগীকে। জানা যায়, ঈদের আগের দিন জ্বরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। এরপর পাঁচ দিন মুন্সিগঞ্জের জেনারেল হাসপাতাল চিকিৎসা নেন। একপর্যায়ে হাম হয়েছে নিশ্চিত হওয়ার পর সেখানকার চিকিৎসক ঢাকায় চলে যেতে বলেন। আজ মুন্সিগঞ্জ থেকে সরাসরি চলে আসেন ডিএনসিসির এই হাসপাতালে।
বিপ্লব শেখকে ভর্তি করানোর জন্য তাঁর শ্বশুর নুর জামাল ও ছোট ভাই রিমন যখন চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যান, তখন হাসপাতালের বেঞ্চে বসে কাঁদছিলেন বিপ্লবের মা মনি বেগম। আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞেস করছিলেন এখানে চিকিৎসা দিলে তাঁর ছেলে সুস্থ হবে তো। মনি বেগম বলেন, ‘পাঁচ বছরের একটা নাতি ও তিন মাসের একটা নাতনি আছে। আমার ছেলের কিছু হলে এদের কী হবে, কে দেখবে তাদের। দেখার মতো তো কেউ নেই।’
ছয়তলা ভবন হাসপাতালের চতুর্থ তলায় আট বছরের বেশি বয়সী যারা হামে আক্রান্ত, তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। আজ দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, মা ফরিদা আক্তার ১৫ বছর বয়সী ছেলে মামুদ হাসানকে (১৫)–কে নেবুলাইজ করছেন।
ফরিদা আক্তার জানান, গতকাল দুপুরে কুমিল্লার হোমনা থেকে এই হাসপাতালে এসেছেন তাঁরা। ছেলের বেশ কয়েক দিন ধরে জ্বর। এরপর জানতে পারেন হাম হয়েছে। তখন চলে আসেন ঢাকায়। প্রথমে ঢাকা মেডিকেলে গেলেন, সেখান থেকে তাঁদের এই হাসপাতালে পাঠানো হয়। ছেলের শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ায় নেবুলাইজ করছেন।
মাহমুদ হাসানের একটু পেছনে একটি শয্যায় বসে কাতরাচ্ছিলেন খাদিজা বেগম (২২)। তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন স্বামী মো. শামীম। তিনি জানান, ভোলার বোরহানউদ্দিন থেকে তিন দিন আগে তাঁরা এখানে এসেছেন। খাদিজা বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ থাকলেও প্রথমে হাম হয়েছে এটি বুঝতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘শুরুতে তো বুঝতে পারিনি যে হাম হয়েছে। কয়েক দিন যাওয়ার পর দেখি শরীরের র্যাশ উঠেছে। পরে একজন বলল এটি হামের লক্ষণ। তাই ঢাকায় নিয়ে আসি। এখন আগের তুলনায় কিছুটা ভালো আছে।’
মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালের প্রশাসন কর্মকর্তা আসিফ হায়দার প্রথম আলোকে জানান, এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন সাত হাজারের বেশি রোগী। এর মধ্যে ১৬ শতাংশ রোগীর বয়স ১৫ বছরের বেশি। বর্তমানে ভর্তি আছে ৩৫৭ জন। এর মধ্যে আইসিইউতে আছে ৫১ জন। তাদের মধ্যে আটজনের বয়স ১৫ বছরের নিচে।
এই হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ৪২ জন মারা গেছে। তাদের মধ্যে ১৫ বছরের বেশি বয়সী রোগীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত কত জানতে চাইলে আসিফ হায়দার বলেন, ‘১৫ বছরের বেশি বয়সী এখন পর্যন্ত দুজন মারা গেছে এই হাসপাতালে। শিশুদের তুলনায় বয়স্কদের মারা যাওয়ার হার খুব কম। বয়স্কদের বেশির ভাগই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।’