
সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরাও সহকর্মীদের মাধ্যমে নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। ওয়ান-ইফরা উইমেন ইন নিউজ, ‘সিটি সেন্ট জর্জেস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন’ ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন ২০২৫ সালে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপে অংশ নেওয়া ৩৩৯ বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ সংবাদকর্মীর মধ্যে ১৫ শতাংশ যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
আজ বুধবার সংবাদমাধ্যমের জন্য যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ‘স্ট্রেনদেনিং উইমেন জার্নালিস্টস নেটওয়ার্ক টু ট্যাকল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা গ্রহণ ও তা চর্চা করা উচিত। হয়রানির ঘটনায় নীরব না থেকে প্রতিকার চেয়ে সোচ্চার হওয়া উচিত ভুক্তভোগীদের। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক, সম্পাদক ও ব্যবস্থাপকেরা যেন ঘটনা প্রতিকারে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেন, সেটা নিশ্চিত করা উচিত।
অনুষ্ঠানে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (নোয়াব) সভাপতি ও দৈনিক মানবজমিনের প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের চুপ না থেকে ঘটনার প্রতিকার চাইতে সোচ্চার হতে হবে। যৌন হয়রানির প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনকে যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা নিয়ে সম্পাদক পরিষদ, নোয়াবসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে বৈঠক করার আহ্বান জানান।
প্রথম আলো ইংরেজি ওয়েবের হেড অব কনটেন্ট আয়েশা কবির বলেন, সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নীতিমালা সম্পর্কে জানতে হবে। তাদের স্বচ্ছতার সঙ্গে নীতিমালাগুলো অনুসরণের চর্চা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, যৌন হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীর পক্ষে অনেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে জানান। সেসবের কোনোটি সত্য হতে পারে, না–ও হতে পারে। নীতিমালায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করার বিষয়টিকে কীভাবে যুক্ত করা যায়, সেটা নিয়েও ভাবতে বলেন তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. আল মামুন বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হলেও নারী সাংবাদিক ৮-১০ শতাংশের বেশি নয়। সংবাদমাধ্যমে নারী সহায়ক পরিবেশ তৈরি না হলে নারী সংবাদকর্মী বাড়বে না। নারী সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরির জন্য বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন যৌন হয়রানি প্রতিকার নীতিমালা তৈরি করেছে। এ ধরনের একটি নীতিমালা সাংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, ওয়ান-ইফরা ও বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের ২০২৫ সালের সমীক্ষা প্রতিবেদনটি এখন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ আরব অঞ্চল, সাবসাহারা আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ২০টি দেশের সংবাদকর্মীরা জরিপে অংশ নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ থেকে অংশ নিয়েছিলেন ৩৩৯ সংবাদকর্মী। এর মধ্যে ১০০ জন নারী, ১৯০ জন পুরুষ ও বাকি ৪৯ জন তাঁদের লিঙ্গভিত্তিক পরিচয় জানাননি। বাংলাদেশি সংবাদকর্মীদের মধ্যে সাংবাদিক, ফটোসাংবাদিক, কারিগরি ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন এমন ব্যক্তি ছিলেন ২৪২ জন। সম্পাদক, প্রযোজক, ব্যবস্থাপক, বিভাগীয় প্রধান, টিম লিড পর্যায়ের সংবাদকর্মী ছিলেন ৮৬ জন। সংবাদমাধ্যমের নির্বাহী, পরিচালক, ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক পর্যায়ে অংশ নিয়েছিলেন ১০ জন। এ ছাড়া শীর্ষ কর্মকর্তাদের একজনও এই জরিপে অংশ নিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জরিপটি পরিচালিত হয়। জরিপ অনুসারে, ৬০ শতাংশ নারী ও ৯ শতাংশ পুরুষ মৌখিকভাবে যৌন হয়রানি, ৪৮ শতাংশ নারী ও ১৫ শতাংশ পুরুষ অনলাইনে যৌন হয়রানি আর ২৪ শতাংশ নারী ও ৭ শতাংশ পুরুষ শারীরিকভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ধর্ষণের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের সংবাদমাধ্যম উন্নয়ন ব্যবস্থাপক রাশেদুল হাসান অনুষ্ঠানে বলেন, জরিপে অংশগ্রহণকারী যে ৯ জন (৭ জন নারী ও ২ জন পুরুষ) ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন, সে বিষয়ে বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশন আরও বিশদভাবে জানতে চেয়েছে ওয়ান-ইফরার কাছে। এ ব্যাপারে জবাব আসার পর জানা যাবে, ধর্ষণের ঘটনা সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সহকর্মীদের মাধ্যমে ঘটেছে, নাকি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে ঘটেছে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন উইমেন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (ডব্লিউজেএনবি) সমন্বয়কারী আঙ্গুর নাহার মন্টি। তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা অন্যদের বৈষম্য-নিপীড়ন নিয়ে লেখেন। তাই নিজেদের সঙ্গে ঘটা নিপীড়ন চেপে রাখার দায় সংবাদকর্মীদের নেওয়া উচিত নয়। নিজেরা যৌন হয়রানির শিকার হলে কীভাবে প্রতিকার চাইতে হবে, আইনি লড়াই করতে হবে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে এই নীতিমালা থেকে।
অনুষ্ঠানে নীতিমালাটি উপস্থাপন করেন বিবিসি মিডিয়া অ্যাকশনের আরাফাত সিদ্দিক। অনলাইনে যুক্ত হয়ে নীতিমালা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন নীতিমালাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত সুলাইমান নিলয়।
কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা অনুসারে তৈরি এই নীতিমালায় বলা হয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর বিলম্ব, উপেক্ষা বা অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা যাবে না। অভিযোগ পাওয়ার পর প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় প্রাথমিক মূল্যায়ন ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তদন্তের সময়সীমা সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ৬০ কার্যদিবস হবে। ৫ সদস্যের কমিটি করতে হবে, কমিটির প্রধান হবেন নারী ও কমিটিতে প্রতিষ্ঠানের বাইরের অন্তত দুজন সদস্য রাখতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা অভিযোগ বলে প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বিদেশি সংবাদমাধ্যম প্রতিনিধিদের সংগঠন ওকাবের সভাপতি নজরুল ইসলাম, চ্যানেল আইয়ের প্রধান বার্তা সম্পাদক (সিএনই) মীর মাসরুর জামান, ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বিশেষ প্রতিনিধি মুনিমা সুলতানা, বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক সমিতির সভাপতি নাসিমা আক্তার সোমা, ইন্টারনিউজের কান্ট্রি প্রতিনিধি শামীম আরা শিউলী, ডেইলি অবজারভারের বিশেষ প্রতিনিধি শাহনাজ বেগম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নাদিরা কিরণ, বৈশাখী টেলিভিশনের হেড অব নিউজ জিয়াউল কবীর সুমন।
এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন ইনস্টিটিউট অব সাইকোলজি অ্যান্ড হেলথের (আইপিএইচ) পরিচালক নাজমুল হোসেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. মিনহাজ উদ্দিন, ডিজিটালি রাইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী, গ্লোবাল ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের (জিআইজিএন) সম্পাদক তানভীর সোহেলসহ অনেকে।