
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত নিজেদের দেড় বছরের কাজের খতিয়ান তুলে ধরেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ আপৎকালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান, গণরুম প্রথা বিলুপ্তকরণ, ছাত্ররাজনীতির সংস্কার, ক্যাম্পাসে শাটল পরিবহন সার্ভিস চালুসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
আজ শনিবার বিকেলে নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। এর আগে সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ৪১টি কাজের কথা তুলে ধরেন উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান।
এসব কাজের মধ্যে রয়েছে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম গঠন, বিশেষ আপৎকালীন আর্থিক সহায়তা প্রদান, গণরুম প্রথা বিলুপ্তকরণ, ছাত্ররাজনীতির সংস্কার, ক্যাম্পাসে শাটল পরিবহন সার্ভিস চালু করা, র্যাঙ্কিংয়ে অগ্রগতি, ঈদ শোভাযাত্রা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধবিষয়ক কোর্স, যৌন হয়রানি, নিপীড়ন এবং বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে পদক্ষেপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন, ‘জাতীয় ঐক্যের প্রতীক’ হিসেবে খালেদা জিয়াকে স্মরণ, সাত কলেজের ‘সম্মানজনক’ পৃথক্করণসহ নানা কার্যক্রম।
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য নিয়াজ আহমদ বলেন, ‘আমরা সবকিছু একদম পুরোপুরি করতে পেরেছি এমন নয়। আমরা আপনাদের নিয়ে চেষ্টা করছি।’
লিখিত বক্তব্যে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম গঠনের বিষয়ে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট টিম (এসএমটি) হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রশাসনিক সমন্বয়কারী কাঠামো, যা উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যক্রম দক্ষভাবে বাস্তবায়নে সহায়তা করে। এই টিমে উপাচার্য, সহ–উপাচার্যদ্বয়, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার ও প্রক্টর রয়েছেন। এসএমটি গঠনের মধ্য দিয়ে উপাচার্য তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অধ্যাদেশ আছে, সেখানে এমন টিম গঠনের কোনো নীতিমালা আছে কি না—এমন প্রশ্নে প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল ও ডিন’স কমিটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ, ১৯৭৩–এ এমন নীতি না থাকলেও সিন্ডিকেট এটি গঠন করেছে। ফলে অধ্যাদেশ–২–এ এটি সংযুক্ত হবে।
‘ছাত্ররাজনীতির সংস্কার’ নিয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ক্যাম্পাসে রাজনীতিচর্চার প্রকৃতি ও ধরন বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সুপারিশ প্রদানের জন্য খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে প্রধান অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা, মতবিনিময় ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পরামর্শ গ্রহণ করেই কমিটি কাজ করছে।
এ ছাড়া গত ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান উপাচার্য পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিবেদনটি তৈরির আগপর্যন্ত ১৬ বছরের ‘বৈষম্য’ নিয়ে ২৬টি কমিটি গঠন করা হয় বলে জানান প্রক্টর সাইফুদ্দিন। তবে এ কমিটিগুলোর কয়টি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকটির কাজ চলমান আছে। আমাদের ঠিক মনে নেই কয়টি কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।’
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ফ্যাসিবাদের সঙ্গে জড়িতদের’ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দেক ইবনে আলী মুহাম্মদ। এ প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রথম আমরা অভিযোগের ভিত্তিতে পুনর্বিবেচনা কমিটি করেছি। তারা তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’
এ ছাড়া ‘যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন এবং বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে পদক্ষেপ’ নেওয়ার কথা জানায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত দেড় বছরে কোনো যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নজির আছে কি না, জানতে চাইলে সহ–উপাচার্য অধ্যাপক সাইমা হক বিদিশা বলেন, ‘আমরা প্রতিটি হলে, বিভাগে ও অনুষদে যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের অভিযোগ বক্স স্থাপন করেছি। সেটার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও সুফল পাবে।’
সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান, রেজিস্ট্রার মুন্সী শামসুদ্দিন আহমদ, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অফিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ জাবেদ আলম, ডাকসুর নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
পরে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়–সংবলিত বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস অনুষদ এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের জন্য ২১তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন নির্মাণ, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের আবাসিক ভবন, ১৫তলা আইটি হাব ভবন নির্মাণ, নয়টি হল নির্মাণ (ছাত্রদের জন্য ৪টি, ছাত্রীদের জন্য ৫টি), ৬টি একাডেমিক ভবন নির্মাণ, কেন্দ্রীয় মসজিদ, ডাকসু ভবন, মেডিকেল সেন্টার, প্রশাসনিক ভবন ও খেলার মাঠ উন্নয়নের পাশাপাশি জিমনেসিয়াম নির্মাণ, জলাধার সংস্কার এবং সৌন্দর্যবর্ধন, রোড নেটওয়ার্ক এবং গণশৌচাগার নির্মাণ।