
নারী ও কন্যাশিশুর জন্য কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আদালতের পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ের উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে আইনি সহায়তা সেবা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি জোরদার করা জরুরি। বাংলাদেশে নারীর ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় বাধা হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ‘চুপ থাকার সংস্কৃতি’।
জাতিসংঘের নারীবিষয়ক ‘কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেন’ (সিএসডব্লিউ)–এর ৭০তম অধিবেশন উপলক্ষে আজ বৃহস্পতিবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। অনলাইনে এই প্যারালাল ইভেন্টের আয়োজন করে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপ উল্লেখ করে বলা হয়, দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে একবার হলেও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ নারী স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতনের শিকার হন। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
‘আদালতের গণ্ডি পেরিয়ে ন্যায়বিচার: বাংলাদেশে নারী ও মেয়েশিশুরা কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অবসরপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ জেলা ও দায়রা জজ ফওজুল আজিম। তিনি বলেন, শুধু আদালত নয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাও নারীর বিচার পাওয়ার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। কার্যকর ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাঠামোগত বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, গ্রামাঞ্চলে আদালতের বাইরে সালিসের মাধ্যমে দ্রুত ও কম খরচে বিরোধ মেটানো সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেখানে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব প্রকাশ পায়। তবে ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালত ও লিগ্যাল এইড ভুক্তভোগীদের আইনি সেবা দিচ্ছে। এ ছাড়া মহিলা পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টসহ (ব্লাস্ট) বিভিন্ন সংস্থা বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সমাজসচেতন না হলে শুধু পরিবারকে সচেতন করে লাভ হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, গ্রাম্য সালিসে ধর্ষণের বিচার চাওয়া বেআইনি। ধর্ষণ একটি ফৌজদারি অপরাধ, এর বিচার অবশ্যই আদালতে হতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, নারী অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি করেছে। এরপরও দেশের নারী ও শিশুকন্যাদের জন্য আইনি কাঠামো এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি ও বৈষম্য রয়েছে। পুরুষতান্ত্রিকতা, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা, আইনবিষয়ক সচেতনতার অভাব, সামাজিক সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা—নারীর বিচার চাওয়া ও পাওয়ার পথকে সংকুচিত করে ফেলেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব রেহানা পারভীন নারীর অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক খান বলেন, এ দেশে নির্যাতনের বিরুদ্ধে চুপ থাকার সংস্কৃতি রয়েছে। এখনো পুরুষতান্ত্রিকতার চর্চা চলে। অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে পরিবারের পুরুষ সদস্যের ওপর নির্ভরশীল। পারিবারিক সহিংসতা, যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার অনেক নারী জানেন না, কোথায় গিয়ে বিচার চাইতে হবে। শুধু আইনি সুরক্ষা নয়, আইনের বাস্তবায়ন নিয়েও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে গণমাধ্যমকেও বড় ভূমিকা পালন করতে হবে।
মূল প্রতিবেদনে জানানো হয়, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা মোকাবিলায় এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপকমিটি নানা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ২০২৫ সালে সংস্থাটি ৯৯০টি সরাসরি অভিযোগ গ্রহণ করে, যার মধ্যে ৮৫০টির বিপরীতে আইনি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পারিবারিক বিরোধ নিরসনে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি’ (এডিআর) পদ্ধতির মাধ্যমে ৪৭৩টি মামলা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার প্রায় ৫০ শতাংশই শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগী নারীদের জন্য ৬৩ লাখ টাকারও বেশি দেনমোহর আদায় করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালে ফৌজদারি ও পারিবারিক আইনসংক্রান্ত মোট ২৩২টি মামলা সরাসরি পরিচালনা করেছে সংস্থাটি।