জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করা যথার্থ হয়নি। কারণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচার বিভাগে দলীয়করণ—এই দুই বিষয়ে বিএনপির যে রাজনৈতিক অবস্থান ছিল, তার সঙ্গে অধ্যাদেশগুলো বাতিল করা মানানসই নয়। অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন পুনর্বহাল হচ্ছে, অথচ ওই আইনের অধীনে মানবাধিকার কমিশন একটা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের অধ্যাদেশের অধীন যে কমিশন ইতিমধ্যে গঠিত হয়েছে, সেটির গঠনপ্রক্রিয়া, এখতিয়ার ও ক্ষমতা—সবকিছু নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখার বিধান ছিল। এ ছাড়া গুম প্রতিরোধ এবং জুলাই অভ্যুত্থানের দায় নির্ধারণে কমিশনকে সুনির্দিষ্ট এখতিয়ার দেওয়া হয়েছিল। কমিশন নিয়োগের যে বাছাই কমিটি, তাতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধিত্ব সংকুচিত করা হয়েছিল। সদস্যদের যোগ্যতাও সুনির্দিষ্টভাবে বলা ছিল।
কমিশনে আগে দুজন সার্বক্ষণিক সদস্য ছিল। অধ্যাদেশে চেয়ারপারসনসহ সব সদস্য সার্বক্ষণিক এবং সুনির্দিষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন। মানবাধিকার কমিশনকে তদন্ত পরিচালনার জন্য কার্যকর ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য কিংবা সরকারি কর্মকর্তা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।
সুতরাং অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বর্ধিত ক্ষমতা ও নিরপেক্ষতা বিলুপ্ত হবে। আবারও এটি একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনাও থাকছে।
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বিচারক নিয়োগের যে বিধান ছিল, সেটি ছিল অসম্পূর্ণ। কারণ, মূল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো এমন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল, যাতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন কাউন্সিল প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের তালিকা তৈরি করতে পারত এবং নির্বাহী বিভাগও তা মেনে চলতে বাধ্য হতো। তা ছাড়া একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিরাও বিচারক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারতেন। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তির কাছে গিয়ে ধরনা দেওয়ার প্রয়োজন হতো না।
আমরা দেখেছি, অধ্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৫ সালে যাঁরা বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন, তাঁদের ব্যাপারে বিএনপির নেতৃস্থানীয় আইনজীবীসহ সবাই সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
এখন অধ্যাদেশটি বাতিলের ফলে আবারও আমরা আগের অবস্থানে ফিরে গেলাম। আশঙ্কা করার যথেষ্ট কারণ আছে যে রাজনৈতিক বিবেচনাই বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে মুখ্য হয়ে উঠবে। তবে আমি আশা করি এবং বিশ্বাস করতে চাই, আইনমন্ত্রী যে রকমটি বলেছেন যে এই অধিবেশনে কিংবা পরের অধিবেশনে বিল আকারে ওই দুটি আইন আবারও উপস্থাপিত হবে এবং অধ্যাদেশের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো অক্ষুণ্ন রেখে এগুলোকে আইনে পরিণত করা হবে।
তানিম হোসেইন শাওন: সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য