
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। নিজেদের ঘরে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। সেই হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ এই সময়ে বদলেছে সরকার, বদলেছে তদন্ত সংস্থা, কিন্তু মূল প্রশ্নটি এখনো রয়ে গেছে—সাগর-রুনিকে কে হত্যা করেছিল?
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর অনেকের মনে আশা জেগেছিল, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্যভেদ এবার হবে। কিন্তু তা হয়নি। ছেলে ও পুত্রবধূর হত্যার বিচার না পাওয়ার বেদনা আর হতাশা নিয়ে ১৪ বছর পরও দিন গুনতে হচ্ছে সাগর সরওয়ারের মা সালেহা মনিরকে।
‘অন্তর্বর্তী সরকার সাগর-রুনি নিয়ে কোনো কাজই করেনি। ওনাদের প্রতি অনেক আশা করেছিলাম। কিন্তু ১৭ মাস পরও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। আমি আশাহত। আর কিছুই হবে না। ওনারাও লিখে যাবেন, আর আমি শুধু তারিখ গুনব,’ প্রথম আলোকে বলেন সালেহা মনির।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাড়িতে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির লাশ পাওয়া যায়। সাগর তখন মাছরাঙা টিভিতে আর রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাঁদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ।
রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির রক্তাক্ত লাশ। সাগর তখন মাছরাঙা টিভিতে আর রুনি এটিএন বাংলায় কর্মরত ছিলেন। হত্যাকাণ্ডের সময় বাসায় ছিল তাঁদের সাড়ে চার বছরের ছেলে মাহির সরওয়ার মেঘ।
পরদিন ১২ ফেব্রুয়ারি হত্যা মামলা করেন রুনির ভাই নওশের আলম। প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানাকে এ মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিন দিন পর মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিবিও এতে ব্যর্থ হলে ২০১২ সালের ১৮ এপ্রিল তদন্তভার দেওয়া হয় র্যাবকে। ১২ বছরেও র্যাব তদন্ত শেষ করতে পারেনি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত র্যাবকে তদন্তের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেন। ওই দিন বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মুহাম্মদ মাহবুব উল ইসলামের বেঞ্চ একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন।
হাইকোর্টের নির্দেশনায় চার সদস্যের এই টাস্কফোর্সের আহ্বায়ক করা হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মুস্তফা কামালকে। ছয় মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয় এই টাস্কফোর্সকে। কিন্তু পিবিআই ছয় মাস করে তিন দফা সময় নেয়। সর্বশেষ গত বছরের ২৩ অক্টোবর উচ্চ আদালতে আবেদন জানিয়ে আরও ছয় মাস সময় চাওয়া হয়। আগামী এপ্রিলে এই সময়সীমা শেষ হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার সাগর-রুনি নিয়ে কোনো কাজই করেনি। ওনাদের প্রতি অনেক আশা করেছিলাম। কিন্তু ১৭ মাস পরও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। আমি আশাহত। আর কিছুই হবে না। ওনারাও লিখে যাবেন, আর আমি শুধু তারিখ গুনব।সালেহা মনির, সাগর সরওয়ারের মা
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের পরপরই তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হবে। পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, তদন্তে ‘প্রণিধানযোগ্য’ অগ্রগতি হয়েছে।
ওই হত্যাকাণ্ডের দুই বছর পর ২০১৪ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান মহীউদ্দীন খান আলমগীর। সেই সময় তিনি হত্যার রহস্য উন্মোচনের সুনির্দিষ্ট তারিখও ঘোষণা করেছিলেন। সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে এই হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে।’ ওই ঘোষণার পর ১০ অক্টোবর রুনির বন্ধু তানভীর রহমান ও বাসার দারোয়ান পলাশ রুদ্র পালকে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। কিন্তু তদন্ত আর এগোয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত ৪ নভেম্বর এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পান পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক। এরপর এক বছর দুই মাসে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় পিছিয়েছে ১২ বার। সব মিলিয়ে এই মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় এখন পর্যন্ত ১২৫ বার পিছিয়েছে।
সর্বশেষ ৯ ফেব্রুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। সেদিনও প্রতিবেদন দিতে পারেনি পিবিআই। এ কারণে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুর রহমানের আদালত আগামী ১ এপ্রিল প্রতিবেদন দাখিলের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেন। একই সঙ্গে কেন প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি, তার ব্যাখ্যা চেয়ে তদন্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
এভাবে তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নানা আশ্বাসে ১৪ বছর কেটে গেছে। তারপরও এই চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি।
এই মামলায় এখন পর্যন্ত মোট আটজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, আবু সাঈদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণ, সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনাম, পলাশ রুদ্র পাল ও রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তানভীর রহমানসহ আটজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। অন্য সাতজন হলেন ভাড়া বাসার নিরাপত্তা প্রহরী পলাশ রুদ্র পাল, এনাম আহমেদ, এটিএন বাংলা টেলিভিশনের সাবেক সাংবাদিক ফারজানা রুপা, মামলার তদন্তকাজে সম্পৃক্ত থাকা র্যাবের সাবেক মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. সোহাইল, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, ডিবির লালবাগ বিভাগের সাবেক ডিসি মশিউর রহমান ও সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পুলিশের দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের কাছ থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ পাওয়া গেছে। তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তবে অগ্রগতি নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত সাপেক্ষে যথাসময়ে মামলার প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’
আগামী এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়া সম্ভব কি না, এ প্রশ্নের জবাবে মো. আজিজুল হক বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব।’
এই মামলায় এখন পর্যন্ত মোট আটজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, আবু সাঈদ, মিন্টু, কামরুল হাসান ওরফে অরুণ, সাগর-রুনির ভাড়া বাসার নিরাপত্তা প্রহরী এনাম, পলাশ রুদ্র পাল ও রুনির কথিত বন্ধু তানভীর রহমান। এর মধ্যে প্রথম পাঁচজনই মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র হত্যার ঘটনায় র্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।
আসামিদের মধ্যে তানভীর রহমান জামিনে আছেন। পলাশ রুদ্র পাল জামিন নিয়ে পলাতক। আর অন্য আসামিরা কারাগারে আটক আছেন।
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তবে অগ্রগতি নিয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত সাপেক্ষে যথাসময়ে মামলার প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।—মো. আজিজুল হক, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
দীর্ঘ অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও শেষ আশাটুকু আঁকড়ে ধরে আছেন সাগরের মা সালেহা মনির। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পিবিআই আমাদের কোনো পজিটিভ কথাই বলেনি। একবার বলেছে, ধরেন খুনি মারা গেছে। মারা গেলে ওনারা জানে কীভাবে? এটা কী ধরনের কথা! কেন ওনারা এ কথা বলল, আমি জানি না।’
সাগর সরওয়ারের মা আরও বলেন, ‘পিবিআই পারে না—এমন কিছু নেই। অনেক ক্লুলেস ঘটনাও ওনারা বের করে আনেন। আসলে ওনারা বের করবেন না, এটাই কথা। কোনো সরকার বিচার করবে বলে মনে হয় না। হয়তো আমি বিচার দেখে যেতে পারব না। তবু মৃত্যুর আগপর্যন্ত আশা ছাড়ব না। মৃত্যুর আগে যেন বিচার দেখে যেতে পারি, এটাই আমার চাওয়া।’
মামলার বাদী ও মেহেরুন রুনির ছোট ভাই নওশের আলম রোমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচার নিয়ে আমরা আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর মনে হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত সত্যটা উদ্ঘাটন করবে। কিন্তু এই সরকারের দেড় বছরে ন্যূনতম অগ্রগতি না হওয়া খুবই দুঃখজনক।’
শেষ আশাটুকুও এখন শেষ। কারণ, পলিটিক্যাল সরকারের কাছে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো কিছু দেখিনি। ভবিষ্যতে কী আছে, আমরা জানি না।নওশের আলম রোমান, মামলার বাদী ও মেহেরুন রুনির ছোট ভাই
মামলার বাদী আরও বলেন, ‘শেষ আশাটুকুও এখন শেষ। কারণ, পলিটিক্যাল সরকারের কাছে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো কিছু দেখিনি। ভবিষ্যতে কী আছে, আমরা জানি না। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা খুবই হতাশ।’
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সরকারি কোনো বাহিনীর জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করে নওশের আলম রোমান বলেন, ‘আমরা আগে বিশ্বাস করতাম, এটার সঙ্গে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কোনো বাহিনী জড়িত, সেটাই এখন সত্যি হচ্ছে। নিশ্চয়ই পেছনে এমন কেউ জড়িত, যার কারণে কোনো কূলকিনারা হয়নি।’
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, তদন্তে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। অবশ্যই তদন্তকারী কর্মকর্তার একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া উচিত। তা না হলে সাধারণ জনগণ আস্থা হারিয়ে ফেলবে।
আবার তদন্ত প্রতিবেদনটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার ওপর জোর দিয়ে ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, প্রতিবেদন আসামাত্রই রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য প্রস্তুত আছে।