'জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম: শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ' শীর্ষক অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতা করেন কবি ও প্রাবন্ধিক এবং প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ ৷ ১০ জানুয়ারি, ঢাকা
'জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম: শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ' শীর্ষক অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতা করেন কবি ও প্রাবন্ধিক এবং প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ ৷ ১০ জানুয়ারি, ঢাকা

একক বক্তৃতায় সাজ্জাদ শরিফ

শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে আলাদা ফ্রেমে দেখা বিপজ্জনক

‘জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম—এ রকম ফ্রেমে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দুই কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে আলাদা করে দেখা বিপজ্জনক। নির্দিষ্ট কোনো ফ্রেমে একজন কবিকে বন্দী করলে আমরা তাঁকে নয়, নিজেদেরই সেই ফ্রেমে আটকে ফেলি। এভাবে কবির বিচার হয় না। এ রকম ফ্রেমের ভেতর থেকে আমাদের বের হয়ে আসা দরকার।’

শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর পরীবাগে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে এক অনুষ্ঠানে এ কথাগুলো বলেছেন কবি ও প্রাবন্ধিক এবং প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। সংস্কৃতি বাংলা নামের একটি সংগঠনের বর্ষশুরু আয়োজন উপলক্ষে এই অনুষ্ঠানে তিনি ‘জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম: শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ’ শিরোনামে একক বক্তৃতা দেন।

বক্তৃতায় সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘এখন যে আমরা ধর্ম ও জাতীয়তাবাদ—এই দুই ফ্রেমে আলাদা করে যে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে দেখি, এগুলো পরের ঘটনা। ১৯৫০–এর দশকে কবি হিসেবে উন্মেষের পর সাংস্কৃতিক ভাবাদর্শের দিক থেকে তাঁরা এক ছিলেন। সেটি জাতীয়তাবাদের যুগ। দেশে দেশে উপনিবেশের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম চলছে। পূর্ববঙ্গও এর ব্যতিক্রম নয়। বৃহত্তর অর্থে এই দুই কবিও তখন “জাতীয়তাবাদী” সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করছেন। আমরা এটা পছন্দ বা অপছন্দ করতে পারি, পরিচয়বাদী রাজনীতির সমালোচনা করার মতো নানা তাত্ত্বিক অস্ত্র এখন আমাদের কাছে আছে। কিন্তু এটাই ইতিহাসের বাস্তবতা। আমরা ইতিহাস বদলাতে পারি না।’

কবি সাজ্জাদ শরিফ বলেন, শামসুর রাহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় যেসব কবিতা লিখেছেন, মজলুম আদিব বা নিপীড়িত কবি ছদ্মনামে—সেসব কলকাতায় ছাপা হয়েছে। সেসব কবিতায় বাংলাদেশের সব মানুষের মুক্তির বাসনাই প্রকাশিত হয়েছে। এই জাতীয় মুক্তির স্বপ্ন আর জাতীয়তাবাদ এক নয়। আবার আল মাহমুদ আধুনিক কবিতাকে পূর্ববঙ্গের স্বভাবের মধ্যে আত্মস্থ করেছিলেন। এটা তাঁর বড় কীর্তি। পূর্ববঙ্গের প্রকৃতি ও জীবনযাত্রা তাঁর কবিতায় শুরু থেকেই এত জীবন্ত ও সপ্রাণ যে তাঁকে প্রায় সর্বপ্রাণবাদী বলা যায়। সে অর্থে শুরু থেকেই তাঁর কবিতায় ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম: শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ' শীর্ষক অনুষ্ঠানে সভাপ্রধানের বক্তব্য দেন বিশিষ্ট অনুবাদক ও লেখক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস ৷ ১০ জানুয়ারি, ঢাকা

সাজ্জাদ শরিফ বলেন, ‘আমরা সব সময় নতুন বিবর্তিত ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছি। ভবিষ্যৎ আমাদের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে। আগের ইতিহাসকে যদি নতুন সময়ের মধ্যে আমরা উন্মোচিত করতে না পারি, তাহলে ওই কবিরা ব্যর্থ হবেন না, আমরা ব্যর্থ হয়ে যাব। ফলে এ ধরনের ফ্রেমের ভেতর থেকে আমাদের বের হয়ে আসা দরকার।’ শামসুর রাহমানকে আঘাত করার একটা হিড়িক পড়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ইতিহাসকে এভাবে বর্জন করতে চাইলে আমরা নিজেরাই যে বাদ পড়ে যাব, সেটা আমরা লক্ষ রাখি না।’

‘বাংলা সাহিত্যের দুই শ্রেষ্ঠ কবি’

শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে বাংলা সাহিত্যের দুজন শ্রেষ্ঠ কবি বলে মনে করেন বিশিষ্ট অনুবাদক ও লেখক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। বক্তৃতা অনুষ্ঠানে সভাপ্রধানের বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই দুই কবিকে যেটুকু পড়েছি, তাতে মনে হয়েছে তাঁরা আমাদের সেরা প্রতিভা। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু এই ইতিহাসে শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ খুব উজ্জ্বল হয়ে আছেন।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পর আল মাহমুদই কবিতায় সবচেয়ে সফলভাবে মুসলমানি শব্দ ব্যবহার করেছেন বলে মন্তব্য করেন খালিকুজ্জামান ইলিয়াস।

অনুষ্ঠানের শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আয়োজক সংগঠন সংস্কৃতি বাংলার সদস্যসচিব ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ। পরে সমাপনী বক্তব্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানান সংগঠনের আহ্বায়ক মাসউদ ইমরান।