
কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) সুগন্ধা-কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ কার্যক্রম বন্ধে আট সপ্তাহের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট। এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার রুলসহ অন্তর্বর্তীকালীন এ আদেশ দেন।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ও ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোনে’ কক্সবাজার পৌরসভার সড়ক (১ দশমিক ৬ কিলোমিটার) নির্মাণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) ওই রিটটি করে।
এদিকে কক্সবাজারের বালিয়াড়িতে ওই নির্মাণ কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও প্রকল্প পরিচালকসহ চারজনের বিরুদ্ধে করা আদালত অবমাননার আবেদনের বিষয়টি আট সপ্তাহের জন্য মুলতবি রেখেছেন আদালত।
এইচআরপিবির করা আদালত অবমাননার আবেদন ও বেলার করা রিট একসঙ্গে শুনানির জন্য আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। আদালতে বেলার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী। তাঁকে সহায়তা করেন আইনজীবী হাসানুল বান্না ও রুমানা শারমিন। আদালত অবমাননার আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মুহাম্মদ আজমী।
রিটের পরিপ্রেক্ষিতে দেওয়া রুলে কক্সবাজার পৌরসভার ওই সড়ক নির্মাণ রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও জনস্বার্থবিরোধী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে নির্মিত ওই সড়কের অংশবিশেষ অপসারণ করে সমুদ্রসৈকত ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা–ও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
পরিবেশসচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, গৃহায়ণ ও গণপূর্তসচিব, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, কক্সবাজার পৌরসভার প্রশাসকসহ বিবাদীদের দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বেলার আইনজীবী হাসানুল বান্না।
বেলা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে হোটেল সায়মন পর্যন্ত প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ও ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোনে’ কক্সবাজার পৌরসভা ওই সড়ক নির্মাণ করছে। ‘নগর উন্নয়ন ও নগর শাসন প্রকল্প’–এর আওতায় জাইকার অর্থায়নে সৈকতের বিশাল এলাকা ভরাট করে প্রায় ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ ওই সড়ক নির্মাণকাজ শুরু হলে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবাদীরা এর প্রতিবাদ করেন। সড়ক নির্মাণের জন্য উপকূল সুরক্ষার অন্যতম প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত বহু বছরের বালিয়াড়ি নির্বিচার এক্সক্যাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ধ্বংস করা হয়েছে সৈকতের পরিবেশের জন্য অপরিহার্য উদ্ভিদ সাগরলতাসহ লাল কাঁকড়া ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থল।
সমুদ্রসৈকতের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে এবং নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ইতিপূর্বে সুপ্রিম কোর্ট একাধিক রায় ও আদেশ দিয়েছেন উল্লেখ করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বেলা বলেছে, সর্বোচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ অমান্য করে কক্সবাজার পৌরসভার সৈকতের বুক চিরে সড়ক নির্মাণের বিরুদ্ধে এবং বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত রক্ষায় জনস্বার্থে চলতি সপ্তাহে ওই রিটটি করে বেলা।
এর আগে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দখল ও স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইআরপিবি) রিট করে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে হাইকোর্ট সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখা ও বালিয়াড়িতে স্থাপনা অপসারণের নির্দেশ দেন। এ সত্ত্বেও কক্সবাজার পৌরসভার উদ্যোগে সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়ির ওপর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ সৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস করছে যা, আদালত অবমাননার শামিল উল্লেখ করে এইআরপিবি ৩০ আগস্ট আবেদন করে।
পরে এইআরপিবির প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, ওই প্রকল্পের পরিচালক, কক্সবাজারের পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা ও জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি—এই চারজনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার আবেদনটি করা হয়। আদালত আট সপ্তাহের জন্য বিষয়টি মুলতবি রেখেছেন।