প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

হামে আক্রান্ত সেই ২১ দিনের শিশু সুস্থ হয়ে এখন বাড়ির পথে

পরিবারে সন্তান আসার আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই নেমে আসে দুশ্চিন্তা। জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় হামে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে নবজাতকটি। একপর্যায়ে তাকে নিতে হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। ১২ দিন চিকিৎসার পর নবজাতকটি এখন সুস্থ। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট থেকে শিশুটিকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে পরিবার।

শিশুটির বাবার মুখে এখন স্বস্তির হাসি। হাসপাতালে স্ত্রী ব্যাগ গোছাচ্ছেন, পাশে সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে আছেন তিনি। সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে নিয়ে যেতে পারছেন, এটাই এখন তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়।

শিশুটির বাবা জানান, গত ১৪ জুলাই শরীয়তপুরের একটি হাসপাতালে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর মাত্র ১০ দিনের মাথায় হামে আক্রান্ত হন তাঁর স্ত্রী। কিছুদিন পর শিশুটিও হামে আক্রান্ত হয়। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করানো হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকের পরামর্শে শিশুটিকে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন। ১ আগস্ট সেখানে ভর্তি করা হয়। পরদিনই গুরুতর অবস্থায় তাকে নেওয়া হয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। এরপর চলে চিকিৎসা। অবস্থার উন্নতি হলে তাকে হাসপাতালের বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে (এ ব্লকের ২ নম্বর ওয়ার্ড) নেওয়া হয়। সেখানেই চিকিৎসা শেষে আজ হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন তাঁরা।

মায়ের কাছ থেকেই সংক্রমণ

এত কম বয়সী নবজাতকের হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা চিকিৎসকদের কাছেও ব্যতিক্রমী। সাধারণত এত কম বয়সে শিশুদের হাম হয় না। ধরে নেওয়া হয়, শিশু তার মায়ের কাছ থেকে হাম প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। সে কারণে শিশুর বয়স ৯ মাস হওয়ার পর তাঁকে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয়। টিকার দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে। কিন্তু এ বছর ৯ মাসের কম বয়সী অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য, এই শিশুর ক্ষেত্রে সংক্রমণের উৎস তার মা। শিশুটির মা নিজেও শিশু। তার বয়স এখন ১৫। তিনি সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় হামে আক্রান্ত হন। এরপর সেই হামে আক্রান্ত হয় তার সন্তানও।

২০১১ সালে জন্ম নেওয়া শিশুটির মাকে জন্মের পর হামের টিকা দূরে থাক, অন্য কোনো টিকাও দেওয়া হয়নি। ফলে তিনি নিজেই হামে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর সদ্যোজাত শিশুও আক্রান্ত হয়।

শিশুটির নানি জানান, ছোটবেলায় তাঁর মেয়েকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। শুধু হামের টিকা নয়, অন্য কোনো টিকাও দেওয়া হয়নি। চরাঞ্চলে বাড়ি হওয়ার কারণে সময়মতো তাঁরা টিকা পাননি।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই শিশু যখন হাসপাতালে আসে, তখনই আমরা অ্যালার্ট (সতর্ক) হয়ে যাই। কারণ, বাচ্চাটির বয়স মাত্র ২১ দিন। এত কম বয়সেই বাচ্চাদের রোগ প্রতিরোধের সক্ষমতা এত কম থাকে যে যেকোনো সময় বিপদ হয়ে যেতে পারে। তাই প্রথম দিন থেকেই আমরা বিশেষ সতর্কতা নিই। তাকে অনেকগুলো পরীক্ষা করার পর যখন দেখলাম, রিপোর্ট খারাপ, তখন তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। তৃতীয় দিনের মাথায় বাচ্চাটির উন্নতি হতে শুরু করে। পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার পর আজ তাকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে। তবে ওভারঅল বিষয়টি খুবই বিপজ্জনক ছিল।’

ঋণ করে চিকিৎসা

শিশুটির বাবা অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করে সংসার চালান। একসময় বরিশালের হিজলা উপজেলায় তাঁদের বাড়ি ছিল। নদীভাঙনে সব হারিয়ে চলে আসেন শরীয়তপুরের চর মাইজারী এলাকায়। সংসারে অভাব-অনটনের মধ্যে স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সব মিলিয়ে অনেক খরচের মুখে পড়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়স্বজন ও এলাকার লোকজনের কাছ থেকে এক লাখ টাকার বেশি ঋণ নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি।’

তবে হাসপাতালের বেডে সন্তানকে কোলে নিয়ে বসে থাকার সময় সেই ঋণের চিন্তা যেন কিছুটা আড়ালেই ছিল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘টাকা গেলেও দুঃখ নেই। বাচ্চাটি সুস্থ হয়েছে, এতেই আমি খুশি।’

‘ছেলেকে ডাক্তার বানাব’

এই বাবা নিজে বেশি দিন পড়াশোনা করতে পারেননি। চার ভাই ও তিন বোনের সংসারে ছোটকালেই বাবার সঙ্গে কাজে নেমে গিয়েছিলেন। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। নিজের সন্তান অসুস্থ হওয়ার পর তাঁর মনে হয়েছে, পড়াশোনা জানাটা জরুরি ছিল। হাসপাতালের ডাক্তারদের সেবায় মুগ্ধ তিনি।

প্রথম আলোকে এই বাবা বলেন, ‘নিজে পড়াশোনা করতে পারিনি। অনেক কিছুই জানি না, কীভাবে সন্তানের দেখভাল করতে হয়, সেসবও জানতাম না। যার কারণে আমার সন্তান ও স্ত্রীর এত বড় একটা বিপদ চলে আসল। যত কষ্টই হোক, সন্তানকে লেখাপড়া করাব। যাতে বড় হয়ে ডাক্তার হয়ে সবার চিকিৎসা করতে পারে।’