ভৈরব নদের তীরে একটি বটগাছ। বটগাছটির চারপাশজুড়ে বসেছে হরেক দোকান। কোনোটিতে মাটির সরা, মাটির হাঁড়ি, কোনোটিতে মাটির পুতুল, কাঠের একতারা, বাঁশের বাঁশি, বাঁশ ও বেতের সামগ্রী, দা, বঁটি, কাঁচি, শিশুদের নানা রকম খেলনা, মোয়া, মুড়কি, বাতাসা, মিষ্টি। দুটি নাগরদোলা শিশু-কিশোর–কিশোরীদের নিয়ে অনবরত ঘুরছে। মঞ্চের ওপর শিশুরা আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে পড়ছে। পাশের ভৈরব নদের পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে মানত করা মুরগি, ডাব, গাব, লবণ, বাতাসা। সেসব ধরতে নদের পানিতে কিছু লোক ঝাঁপিয়ে পড়ছে। নদের পাড়ে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছেন অনেক মানুষ।
ভৈরব নদের তীরের মেলাটি পৌষসংক্রান্তির মেলা। মেলাটি বসছে ১০৯ বছর ধরে। স্থানীয় লোকজনের কাছে মেলাটি ‘আফরার মেলা’ নামেও পরিচিত। নড়াইল সদর উপজেলার শেখহাটি গ্রামে বুধবার অনুষ্ঠিত হলো পৌষসংক্রান্তির মেলা। ঐতিহ্যবাহী এ মেলায় সব ধর্মের মানুষ অংশ নিয়েছেন। এই গ্রামীণ মেলা যেন সম্প্রীতির এক অপূর্ব মিলনমেলা।
ভৈরব নদ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে শেখহাটি গ্রামে শ্রীশ্রী ভুবনেশ্বরী মায়ের মন্দির। মন্দিরটি শতবর্ষী। জনশ্রুতি আছে, ১০৯ বছর আগে মকরসংক্রান্তিতে সেই মন্দিরের পুরোহিত স্বপ্নে দেখলেন, ভুবনেশ্বরী মা তাঁকে আদেশ করছেন পাশের গঙ্গা (ভৈরব নদ) থেকে জল এনে তাঁকে (ভুবনেশ্বরী মা) স্নান করাতে। সেই থেকে সেখানে ভৈরব নদে গঙ্গাস্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মেলার শুরুও সেই থেকে। মেলায় মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ গাব, ডাব, বাতাসা, লবণ, মুরগি, ছাগল মানত করেন। মেলার দিন তাঁরা মানত শোধ করতে আসেন। তাঁরা যা যা মানত করেন, তা নদের জলে ভাসিয়ে দেন।
মেলা হয় মাত্র এক দিন। বুধবার ভোর থেকে পূর্ণার্থীরা ভৈরব নদে স্নান করেন। এরপর তাঁরা মানত শোধ করেন। সকাল থেকে শুরু হয় মেলা, চলে রাত পর্যন্ত। দুপুরের পর মেলায় লোকসমাগম বাড়তে থাকে। আশপাশের জেলা থেকে লোকজন এ মেলায় আসেন। বিকেলে মেলাটি মানুষে পরিপূর্ণ হয়।
মেলায় গিয়ে দেখা যায়, পশ্চিম দিক থেকে আসা ভৈরব নদ আমচকা বাঁক নিয়েছে। এই বাঁক থেকে নদ দুই ভাগে ভাগ হয়ে একটি শাখা সোজা দক্ষিণে এবং অপর শাখা কিছুটা উত্তরে গিয়ে পূর্বমুখী হয়েছে। নদের পশ্চিম-দক্ষিণ পাড়ে যশোর সদর উপজেলা আর পূর্ব-পশ্চিম পাড়ে নড়াইল সদর উপজেলা। এই ত্রিমোহিনীতে নদের তীরে একটি বটগাছ। বটগাছের চারপাশে অনেকটা জায়গাজুড়ে বসেছে মেলা। মেলায় পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা। মিষ্টি, খেলনা, চুড়ি, ফিতা, আলতা থেকে শুরু করে ঘর–গৃহস্থালির নানা জিনিস বিক্রি হচ্ছে এখানে। মিষ্টি, জিলাপি বানানো হচ্ছে। ফুচকা, চটপটি, চানাচুর, বিভিন্ন রকম পিঠা, পাঁপড় বিক্রি হচ্ছে এক শর বেশি দোকানে। বিক্রিও হচ্ছে বেশ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে নাগরদোলা।
মেলা আয়োজক কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও যশোর সদর উপজেলার সিঙ্গিয়া আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সুজিত বিশ্বাস বলেন, ‘১০৯ বছর ধরে এই দিনে মেলাটি বসছে। প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এই মেলায় আসেন। এবারও মেলায় প্রচুর মানুষের সমাগম হয়েছে।’ তাঁর হিসাবে শতাধিক ব্যবসায়ী মেলায় অংশ নেন।
নদের পাড়ে বাঁশের তৈরি কুলা, চালুনি ও খালুই নিয়ে বসেছেন যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভূগিলহাট গ্রামের নিতাই দাস (৬৩)। তাঁর মতে, এবার মেলায় লোকসমাগম কিছুটা কম। তবে বেচাকেনা একেবারেই খারাপ না।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের খুকু বৈরাগী (৭৪) আগেও একবার এই মেলায় এসেছিলেন। এবারও এসেছেন। তিনি বলেন, ‘এবার এসেছি মানত শোধ দিতে। একটি ডাব, একটি গাব এবং এক কেজি লবণ কিনে পানিতে ভাসিয়ে দিয়ে মানত শোধ করেছি।’ এ ছাড়া বাড়ির ছেলেমেয়ে, পরিবারের জন্য কিছু জিনিস কিনেছেন।
সবমিলে মেলা যেন উৎসবমুখর পরিবেশ। আয়োজক কমিটির সভাপতি অরুণ সাহা সে কথাই বললেন, পৌষসংক্রান্তির এই মেলা সম্প্রীতির মেলা।
চার বছরের নাতনিকে নিয়ে মেলায় এসেছিলেন যশোর সদর উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের মাজেদ খান (৭৫)। শিশুকাল থেকেই এ মেলায় আসছেন তিনি। মাজেদ খান বলেন, আফরার মেলায় সব ধর্মের মানুষ আসেন। মেলায় অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। খুব ভালো লাগে।’ মেলা থেকে নাতনির জন্য একটি খেলনা কিনেছেন বলে জানালেন তিনি।
এ মেলার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে বলে মনে করেন যশোর সরকারি এমএম কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আফসার আলী। এই শিক্ষকের মতে, ভৈরব নদের ত্রিমোহিনীতে আফরার পৌষসংক্রান্তির মেলাটি আনন্দের, সৌহার্দ্যের।