গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে তারেক রহমানকে অ্যামনেস্টি-সিপিজেসহ ৯ সংগঠনের চিঠি

মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার ‘জরুরি চ্যালেঞ্জগুলো’ মনে করিয়ে দিয়ে তা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসসহ (সিপিজে) মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা ৯টি আন্তর্জাতিক সংগঠন।

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে যৌথভাবে লেখা এক চিঠিতে সংগঠনগুলো এ আহ্বান জানিয়ে গ্রেপ্তার সাংবাদিকদের মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি আহ্বান জানিয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে করা মামলাগুলো পর্যালোচনা করতে।

প্রথম আলো, ডেইলি স্টার কার্যালয়সহ সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের ঘটনাগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোকে আহ্বানও জানিয়েছে সংগঠনগুলো।

গত ১২ মার্চ তারেক রহমানকে লেখা এই চিঠি সিপিজের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও সিপিজের সঙ্গে এ চিঠিতে যুক্ত সংগঠনগুলো হলো আর্টিকেল ১৯, ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, এফআইডিএইচ, ফোর্টিফাই রাইটস, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, রবার্ট অ্যান্ড এথেল কেনেডি হিউম্যান রাইটস সেন্টার এবং টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট।

এ চিঠি প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানের উদ্দেশে লেখা হয়েছে, ‘আমরা সাম্প্রতিক নির্বাচনে আপনার বিজয়ের পর এ চিঠি লিখছি। আপনি নিজেই বলেছেন, “এখন বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ এসেছে।” তাই আপনার উদ্যোগগুলো বহু বছর ধরে বাংলাদেশে মানুষের অধিকারের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।’

বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু জরুরি চ্যালেঞ্জের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই এ চিঠি বলে ৯টি সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়।

‘আমরা ৯টি সংগঠন এ চিঠির মাধ্যমে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির কিছু জরুরি চ্যালেঞ্জ আপনার নজরে আনতে চাই। আমরা আপনার অঙ্গীকার এবং পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানাই, যা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার সুরক্ষা আরও জোরদার করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, জোরপূর্বক গুমের ঘটনা তদন্ত, বিচার ও প্রতিরোধের অঙ্গীকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। যদিও এখন পর্যন্ত নিখোঁজ অন্তত ২৮৭ জনের পরিবারের সদস্যরা উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন।’

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা বিভিন্ন সংস্কার কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে, তা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার বিষয়ে নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি পূরণে সহায়ক হবে বলে মনে করে সংগঠনগুলো। বিভিন্ন ঘটনার তদন্ত ও ভবিষ্যতে নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অপরিহার্যতার কথাও বলা হয় তাদের চিঠিতে।

এতে বলা হয়, যদিও শেখ হাসিনার সরকারের অধীন সংঘটিত অনেক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা পরবর্তীকালে বন্ধ হয়ে গেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নির্বিচার আটকের মতো কিছু ঘটনা ঘটেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার কারণে তা ঝুঁকির মধ্যে ছিল।

ক্রমেই বাড়তে থাকা মব সংস্কৃতি বাংলাদেশে আইনের শাসনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে বলেও মনে করছে এই ৯ সংগঠন। তারেক রহমানকে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, মব বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ঝুঁকিতে ফেলেছে। ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো নারী ও মেয়েদের স্বাধীনতা সংকুচিত করতে চায়, তাই তাঁদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। নিরাপত্তা বাহিনীও পার্বত্য চট্টগ্রামে হামলা কিংবা নির্যাতনের মতো দমনমূলক কর্মকাণ্ড চালু রেখেছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন ব্যাপক চ্যালেঞ্জ এবং উল্লেখযোগ্য কৌশলগত, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। এটা আমরা উপলব্ধি করতে পারি। মানবাধিকারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও বিশেষভাবে প্রতিকূল। এখন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ হুমকির মুখে, অর্থনৈতিক সংকট ব্যাপক ও জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে লাখো মানুষের অধিকার বিপন্ন।’

এ পরিস্থিতিতে ৯টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের মত হলো, যেহেতু সব সরকারকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে মনোযোগী হতে হয়; এরপরও শুধু দেশে নয়, বিদেশেও মানবাধিকারের প্রসারে ভূমিকা রাখার জন্য এটা বাংলাদেশের সামনে উপযুক্ত সময়।

‘আমরা কয়েকটি বিষয়ের প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ এবং কিছু সুপারিশ হাজির করতে চাই। এর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকারের মান রক্ষার জন্য যেসব আইন ও অধ্যাদেশের সংশোধন বা বাতিল করা সবচেয়ে বেশি দরকার, সেগুলোর তালিকা করা। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সেসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ যেগুলো সংসদে পাস করাতে হবে, সেগুলোর তালিকা শেষে উপস্থাপন করাও প্রয়োজন।’

চিঠিতে এই ৯ সংগঠন লিখেছে, সুপারিশের তালিকা দীর্ঘ মনে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সব মানুষের অধিকার রক্ষায় এগুলো প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আর এসব প্রচেষ্টা এগিয়ে নিতে তারা সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে আগ্রহী।