‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: সহিংসতার ধারাবাহিকতা ও সম্প্রীতির দায়বোধ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের একাংশ। আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনে
‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: সহিংসতার ধারাবাহিকতা ও সম্প্রীতির দায়বোধ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থিত আলোচকদের একাংশ। আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনে

সম্প্রীতি যাত্রার গোলটেবিল

নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার শঙ্কায় অস্বস্তিতে মানুষ

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেনি। তাই আসন্ন নির্বাচনে সহিংসতা হতে পারে, এমন শঙ্কা রয়েছে মানুষের মনে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভবনে ‘জাতীয় নির্বাচন ২০২৬: সহিংসতার ধারাবাহিকতা ও সম্প্রীতির দায়বোধ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকেরা এ কথা বলেন। ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের আয়োজনে এই গোলটেবিলে রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিকর্মী, অধিকারকর্মী ও সংগঠকেরা অংশ নেন।

গোলটেবিল বৈঠকে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে সহিংসতা এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। বিএনপির সহ–আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ফাহিমা নাসরিন মনে করেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। গত ১৭ মাসে এই পরিস্থিতি আরও অনেক ভালো করার সুযোগ ছিল। তিনি বলেন, ‘গণ–অভ্যুত্থানের পর ফ্যাসিবাদীরা পালিয়ে গেছে। কিন্তু প্রশাসনে, বিভিন্ন বাহিনীতে এখনো তাদের লোকেরা বসে আছে। তাদের সমর্থকেরা থেকে গেছে। এর সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতি এবং ভারতের হস্তক্ষেপ আছে।’

‘সরকারের বড় অংশ অস্থিরতা চায়’

আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বড় অংশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হোক, সেটা চায় না। তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করতেই মাঠপর্যায়ে তাদের অস্থিরতা দরকার। তিনি বলেন, ‘তারা কোনো সংস্কার করে নাই। পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করলে সংস্কার হয়ে যায় না। তাহলে পুলিশের মনোবল ফিরবে কোথা থেকে? এটা তো লীগের পুলিশ। যখন যে দল পারছে মাঠপর্যায়ে তাদেরকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

বৈঠকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, যেদিন প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানটে হামলা হয়, তার পরদিন ভোরে তারা থানায় নিরাপত্তা চেয়ে ফোন করেছিলেন। কিন্তু কোনো পুলিশ উদীচীতে যায়নি। তিনি বলেন, ‘দেশে যে সরকার আছে, সেটাই তো বিশ্বাস হতে চায় না। সরকার সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা করার জন্য সময় করে দিয়েছে। সুযোগ করে দিয়েছে। কারণ, সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।’

প্রশাসন দুর্বল

বাসদের (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা মনে করেন, দেশের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে নির্বাচন ঘিরে নানা ঘটনা ঘটার ঝুঁকি রয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষে এক জামায়াত নেতার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার উদাহরণ টেনে বৈঠকে তিনি বলেন, শেরপুরের ঘটনায় বোঝা যায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা কতটা দুর্বল ও ভঙ্গুর। কোনো ঘটনা ঘটলে প্রশাসন সেটা কতটা মোকাবিলা করতে পারবে, তা নিয়ে শঙ্কা আছে।

বিপদের লক্ষণ

‘ইসলামবিদ্বেষী’ অ্যাখ্যা দিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) থেকে চাকরিচ্যুত করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়টির বেসিক সায়েন্সেস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশীরকে। গোলটেবিল বৈঠকে তিনিও উপস্থিত ছিলেন।

লায়েকা বশীর বলেন, সামগ্রিকভাবে একটা দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে দেশ রয়েছে। যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের বিশেষ প্রভাব লক্ষণীয়। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং সাংস্কৃতিক চর্চার ওপর আঘাত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা, শিক্ষকদের ওপর নানা রকমের হামলা হচ্ছে। নারীর স্বাধীনতার ওপর, বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী, আদিবাসীদের ওপর হামলা হচ্ছে। এই সবকিছুই বিপদের লক্ষণ।

সাংবাদিক রাফসান গালিব বলেন, যেসব ঘটনা ঘটছে, সরকার কোনো না কোনোভাবে সেগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। সরকারের এই মানসিকতার কারণে প্রথম আলো, ডেইলি স্টারে হামলা হয়েছে।

বৈঠকে ধারণাপত্র পাঠ করেন সজীব তানভীর। এতে আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা ইবনুল সাইদ, অরূপ রাহী, নবী দিবস ও মহাত্মা সম্মেলন উদ্‌যাপন পরিষদের সহকারী সচিব শাফায়াত এইচ চৌধুরী, নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এনপিএর অনিক রায় প্রমুখ। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন মীর হুযাইফা আল–মামদূহ।