
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠদানের মান ও পেশাদারত্ব এবার শিক্ষার্থীদের দিয়ে মূল্যায়ন করাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। এ জন্য ‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষকদের রেটিং দেওয়া হচ্ছে।
তবে শিক্ষক মূল্যায়নের এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তাদের ভাষ্য, শিক্ষক মূল্যায়ন ডাকসুর কাজ নয়; এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা তিনটায় ডাকসু ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে ওয়েবসাইটটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ডাকসুর নেতারা জানিয়েছেন, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বিভাগের শিক্ষকদের বিভিন্ন মানদণ্ডে মূল্যায়ন করতে পারবেন।
ওয়েবসাইটে এরই মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষকের রেটিং দেখা যাচ্ছে। কেউ পেয়েছেন ৫-এর মধ্যে ৫। আবার কারও রেটিং নেমে এসেছে ১ কিংবা ২-এ।
‘ডিইউ ইভাল্যুয়েশন’ ওয়েবসাইটে শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয় রাখা হয়েছে। এর মধ্যে আছে কোর্সের কাঠামো ও পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা, পরীক্ষা ও মূল্যায়ন, পেশাদারত্ব এবং সার্বিক সন্তুষ্টি।
এসব বিষয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষকদের রেটিং পয়েন্ট দেওয়া হচ্ছে।
কোনো শিক্ষার্থী তাঁর একাডেমিক ই-মেইল ব্যবহার করে ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে ওই ই-মেইলে একটি কোড পাঠানো হবে। কোড ব্যবহার করে প্রবেশের পর ওই শিক্ষার্থী শুধু নিজের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। অন্য বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে না।—উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া, কার্যনির্বাহী সদস্য, ডাকসু
ডাকসুর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দিন আগে ওয়েবসাইটটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়। এরই মধ্যে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষকদের মূল্যায়ন করেছেন। আগামী সাত দিন ওয়েবসাইটটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলবে। এ সময়ে পাওয়া সমালোচনা ও পরামর্শের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে।
এরপর তিন মাসের মূল্যায়ন ও মতামতের ভিত্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। সেই প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডাকসু।
ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়ার তত্ত্বাবধানে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ডাকসুর নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করেও বিষয়টির প্রশাসনিক সমাধান না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়নের অফিশিয়াল ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।—আবদুস সালাম, অধ্যাপক ও সহ–উপাচার্য (শিক্ষা), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
রাফিয়া বলেন, কোনো শিক্ষার্থী তাঁর একাডেমিক ই-মেইল ব্যবহার করে ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করলে ওই ই-মেইলে একটি কোড পাঠানো হবে। কোড ব্যবহার করে প্রবেশের পর ওই শিক্ষার্থী শুধু নিজের বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন। অন্য বিভাগের শিক্ষকদের মূল্যায়নের সুযোগ থাকবে না।
শিক্ষক মূল্যায়নের বিষয়ে ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, এই ব্যবস্থা চালুর উদ্দেশ্য শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ তৈরি করা নয়; বরং পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং একটি কার্যকর ফিডব্যাক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু এক বছরেও প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।—সাদিক কায়েম, ভিপি, ডাকসু
ডাকসুর ভিপি বলেন, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা, ক্লাস টেস্ট, মিডটার্ম ও সেমিস্টার ফাইনালের মাধ্যমে নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু শিক্ষকদের পাঠদান কীভাবে হচ্ছে, কোথায় উন্নতির প্রয়োজন—এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মতামত নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা এত দিন ছিল না।
সাদিক কায়েমের দাবি, ডাকসু দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করেছে। কিন্তু এক বছরেও প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ডাকসুর উদ্যোগে ওয়েবসাইট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শিক্ষক মূল্যায়নের নামে ডাকসু যেটা করছে, এটা অনধিকার চর্চা। এর ফলে অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের রেটিং হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এমন পরিস্থিতি পরবর্তী সময়ে ‘মব’-এ রূপ নিতে পারে।—মো. খোরশেদ আলম, সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সাদিক কায়েম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যর্থ হওয়ায় আমরা ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি শুরু করেছি।’
ডাকসুর উদ্যোগে শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালুর বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ ডাকসুর কাজের মধ্যে পড়ে না। তবে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন শিক্ষকের বিষয়ে নিজেদের মতামত জানাতে পারেন, এ ধরনের রেটিংয়ের ব্যবস্থা আন্তর্জাতিকভাবেও রয়েছে বলে উল্লেখ করে তাঁর মত, এটি কোনো অফিশিয়াল মূল্যায়ন নয়; এ ধরনের উদ্যোগ থাকতেই পারে।
ডাকসুর পাবলিকলি এই ওয়েবসাইট তৈরি করাটা কোনোভাবেই সঠিক নয়।—মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী, অধ্যাপক ও সহ–উপাচার্য (প্রশাসন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
তবে শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মনে করেন অধ্যাপক আবদুস সালাম। এর মাধ্যমে শিক্ষকেরা বুঝতে পারবেন, তাঁদের অবস্থান কোথায় এবং কোথায় উন্নতির প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন, সেটিও নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে ঠিক করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই সহ–উপাচার্য।
অধ্যাপক আবদুস সালাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মূল্যায়নের অফিশিয়াল ব্যবস্থা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং ইভাল্যুয়েশনের জন্য নিজস্ব একটি নীতিমালা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুমোদিত হয়েছে। এখন শুধু এর বাস্তবায়ন বাকি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সহ–উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীও ডাকসুর এই কার্যক্রমকে সঠিক মনে করেন না। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শিক্ষক মূল্যায়ন প্রশাসনের কাজ। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ইতিমধ্যে শেষের দিকে। নির্দিষ্ট নীতিমালা মেনেই তা করা হচ্ছে।
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করতে পারবেন।
কোন শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করবেন, সে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করেছে জানিয়ে এই সহ–উপাচার্য বলেন, এমন কোনো শিক্ষার্থী যদি শিক্ষককে মূল্যায়ন করেন, যিনি নিজেই ক্লাসে উপস্থিত থাকেন না, তাহলে সেই মূল্যায়ন কোনোভাবেই যৌক্তিক হবে না।
অধ্যাপক আলমোজাদ্দেদী বলেন, ‘ডাকসুর পাবলিকলি এই ওয়েবসাইট তৈরি করাটা কোনোভাবেই সঠিক নয়।’
ডাকসুর শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম।
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এই শিক্ষক লিখেছেন, শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ কে নেবে—এটি ডাকসুর কাজ কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষক মূল্যায়নের দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এ ক্ষেত্রে ডাকসু কর্তৃপক্ষকে প্রভাবিত করতে বা চাপ তৈরি করতে পারে।
খোরশেদ আলম আরও লিখেছেন, ‘শিক্ষক মূল্যায়নের নামে ডাকসু যেটা করছে, এটা অনধিকার চর্চা।’
এর ফলে অনানুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকদের রেটিং হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এমন পরিস্থিতি পরবর্তী সময়ে ‘মব’-এ রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এই শিক্ষক। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষক মূল্যায়নের ইতিবাচক ফলাফল থেকে বঞ্চিত হতে পারেন বলে মত দিয়েছেন খোরশেদ আলম।