বেলা ১১টা। বাংলাদেশ সচিবালয়ের ৬ নম্বর ভবনের ১৮ তলার বারান্দা। বারান্দার দেয়াল বেয়ে তিনটি সাপের বাচ্চা ওপরে ওঠার চেষ্টা করে। আবার আবার কিছুক্ষণ পর সামনে এগোয়। পরে সাপগুলো পিটিয়ে মারা হয়।
বৃহস্পতিবার এ ঘটনা ঘটে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বারান্দায়। সাপ–গবেষক আবু সাইদ প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনার ভিডিও দেখে তাঁর মনে হয়েছে, এগুলো পাতি নেকড়ে সাপ হতে পারে। এটি নির্বিষ প্রকৃতির সাপ। এই সাপ খাড়া দেয়াল, পাইপ, তার বেয়ে উঠতে পারে।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উদ্ধারকারীদের দিয়ে সাপগুলো সরিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু তা না করে সেগুলো পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। এ ঘটনায় একটি অসংবেদনশীল দৃষ্টান্ত তৈরি হলো। সরকারের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে এ ধরনের ঘটনা বন্য প্রাণী রক্ষায় জনসচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করবে।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করে প্রথম আলো। কিন্তু তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বন অধিদপ্তর বলছে, সাপের বাচ্চা পাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে সচিবালয় থেকে কোনো খবর আসেনি। তারা পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমের খবর থেকে বিষয়টি জানতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের অসচেতনতার কারণে এমনিতেই বন্য প্রাণী রক্ষায় তাঁরা হিমশিম খাচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা বন্য প্রাণী রক্ষায় সচেতনতা তৈরির কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে।
ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য জানতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে বৃহস্পতিবার যোগাযোগ করে প্রথম আলো। কিন্তু তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আমাদের প্রথম কাজই যেন বন্য প্রাণী—সেটা সাপ হোক, মেছো বিড়াল হোক মেরে ফেলা! ঢাকায় এখন অনেক সংগঠন সাপ উদ্ধার করে। তাদের কাউকে জানালে তারা গিয়ে সাপগুলো উদ্ধার করতে পারত। এর বদলে সাপগুলো মেরে ফেলাটা একটা বাজে উদাহরণ হয়েছে।রেজা খান, বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ
জানতে চাইলে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও সরকার গঠিত ওয়াইল্ডলাইফ কমিশনের সদস্য রেজা খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোথাও কোনো স্থানে সাপ দেখা গেলে প্রথমে ওয়াচ (দেখা), অবজার্ভ (পর্যবেক্ষণ), দ্যান কল দ্য রাইট পারসন অর অর্গানাইজেশন (সঠিক ব্যক্তি-সংগঠনকে খবর দেওয়া)—এভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়।’
সচিবালয়ের মতো জায়গায় যদি ন্যূনতম এই সচেতনতা না থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ বন্য প্রাণীর প্রতি অসংবেদনশীল হবে বলে মনে করেন রেজা খান। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথম কাজই যেন বন্য প্রাণী—সেটা সাপ হোক, মেছো বিড়াল হোক মেরে ফেলা! ঢাকায় এখন অনেক সংগঠন সাপ উদ্ধার করে। তাদের কাউকে জানালে তারা গিয়ে সাপগুলো উদ্ধার করতে পারত। এর বদলে সাপগুলো মেরে ফেলাটা একটা বাজে উদাহরণ হয়েছে।’
আইনে তফসিলভুক্ত বন্য প্রাণী শিকার (ধরা, আহত করা, হত্যা ইত্যাদি) নিষিদ্ধ। আইনের লঙ্ঘন দণ্ডনীয় অপরাধ।
বন্য প্রাণী সংরক্ষণ-নিরাপত্তায় আইন আছে। এটি ‘বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬’ নামে পরিচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের যে কটি অধ্যাদেশ বর্তমান সরকার আইনে পরিণত করেছে, তার মধ্যে এটি অন্যতম। আইনে তফসিলভুক্ত বন্য প্রাণী শিকার (ধরা, আহত করা, হত্যা ইত্যাদি) নিষিদ্ধ। আইনের লঙ্ঘন দণ্ডনীয় অপরাধ।
এই আইনে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ তফসিলভুক্ত করা হয়েছে। তফসিল-২-এ পাতি নেকড়ে সাপের নাম অন্তর্ভুক্ত আছে। এ ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। অপরাধের পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড।
সচিবালয়ের ১৮ তলায় কীভাবে সাপগুলো উঠল, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এ বিষয়ে একটি সম্ভাব্য ধারণা দিয়েছেন বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কিছু সাপ গাছসহ ভবন বেয়ে উঠতে পারে। যদি ভবন ঘেঁষে কোনো গাছ থাকে, সে ক্ষেত্রে সেই গাছ দিয়ে ভবনে যেতে পারে সাপ।
বাংলাদেশে সাপ উদ্ধার ও সাপ নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে আসছে ‘ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ ফাউন্ডেশন’। সংগঠনটির সহপ্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার ইটপাথরের জঙ্গলে এখনো কিছু বন্য প্রাণী টিকে আছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাপ।
দেশে এখন অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আছে, যারা সাপ উদ্ধারে কাজ করে বলে উল্লেখ করেন সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া। তিনি বলেন, খবর দিলে এই সংগঠনগুলো সাপ উদ্ধার করতে পারত। দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে বন্য প্রাণী সুরক্ষা না পাওয়ার বিষয়টি হতাশার। এমন হলে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা আরও কঠিন।