‘এখন আমার কাছে এ শহর বড় বেশি ধূসর ধূসর বলে মনে হয়।’ সৈয়দ শামসুল হকের এই কবিতাংশ আজকাল সমস্ত বোধ অধিকার করে রাখে। আমি তাকে পারি না এড়াতে। কী রকম ফাঁকা হয়ে গেছে এই দেশটা। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ডিসেম্বর—পরিকল্পিতভাবে শ্রেষ্ঠ মনীষীদের তালিকা করে ধরে নিয়ে হনন করল পাকিস্তানি সৈন্য আর আলবদরেরা। আর ২০২০-এর পর করোনার করালকালে আমরা একযোগে কত যে বুদ্ধিজীবী, লেখক, চিন্তাবিদকে হারালাম। একটু স্নেহচ্ছায়ার জন্য যে যাব, তেমন বিটপী কই, একটু আলোরেখার জন্য যে তাকাব, তেমন বাতিঘর কই?
আছেন একজন—সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। সবার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় ‘সিক স্যার’। তিনি ছাড়া কেই–বা এই দুঃসময়ে স্পষ্ট, ঋজু, নিরাবেগ কণ্ঠে বলবেন, ‘একাত্তরকে ভুলতে পারে উন্মাদ বা বিকৃত মনের মানুষ। স্মৃতিভ্রংশ মানুষ যেমন স্বাভাবিক মানুষ নয়, স্মৃতিভ্রংশ জাতিও তেমন স্বাভাবিক জাতি নয়।’ বিরূপ প্রতিকূল বিপন্ন বিভ্রান্ত সময়ে ধীরস্থিরভাবে তিনি এমনটা বলতে পারেন, কারণ তিনি আগাগোড়া আদর্শবাদী, সৎ, নির্লোভ, যা ভালো মনে করেছেন, তাকে পথ ও পাথেয় করে তুলেছেন, আপন স্বার্থে, পদ-পদবি-পদকের টংকারে কথা ও কর্তব্য থেকে চ্যুত হননি, একসুতাও, কখনো।
আজ ২৩ জুন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ৯০ বছর পূর্ণ করলেন। ১৯৩৬ সালের ২৩ জুন তাঁর জন্ম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক থেকে তিনি আজ আমাদের সবার শিক্ষক, জাতির শিক্ষক। জাতীয় অধ্যাপক তিনি নন, তবু তিনি জাতির কিংবদন্তি শিক্ষক।
তাঁর সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি চালু আছে। তিনি কোনো দিন কোনো ক্লাসে গরহাজির ছিলেন না। এমনকি তাঁর স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরী যেদিন মারা যান, সেদিনও তিনি ক্লাসে গিয়েছিলেন। শিক্ষার্থীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন, আজ তিনি পড়াতে পারবেন না। এই ঘটনা সত্য হোক বা হোক কিংবদন্তি, শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা আর একাগ্রতা এমনই প্রবাদপ্রতিম। জীবনযাপনেও আশ্চর্য পরিমিতি ও শৃঙ্খলা তাঁকে ৯০ বছরেও সুঠাম রেখেছে, ঋজু রেখেছে। স্বাস্থ্য ভালো, স্মৃতি প্রখর, চিন্তা স্পষ্ট।
কিছুদিন আগে ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো সিরিজে তাঁর ভিডিও সাক্ষাৎকার নিয়েছি। দেখতে পারেন, পুরোটা পড়তেও পারেন।
আমাদের ছাত্রজীবনে তাঁর লেখা ‘সময় বহিয়া যায়’ কলামের জন্য অপেক্ষা করতাম। ইতিহাস, রাজনীতি, সাহিত্য, সমাজ—বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন, সেসব লেখা পড়তে বসা মানে আস্বাদে মন ভরে ওঠা, পড়া শেষে নিজের সঙ্গে নিজেই তর্কে মেতে ওঠা।
একই কথা বলা যাবে তাঁর বইগুলো সম্পর্কে। আমার পিতার মুখ যিনি হাতে নেবেন, তিনি পাঠমুগ্ধ হবেন, পড়ার পর মগ্নতা তাঁকে ভর করবে। কিংবা শেকস্পীয়রের মেয়েরা। শেক্সপিয়ারের সব নাটক তো আমি পড়িনি, কিন্তু বইটি পড়তে এত ভালো লাগে, স্রোতস্বিনী ঝরনার মতো ঝংকার আর সৌন্দর্য নিয়ে পাতার পর পাতায় শেক্সপিয়ারের নারী চরিত্রগুলো সম্পর্কে স্যারের ভাষ্য তরতর করে এগিয়ে যায়।
কৈশোরেই তিনি হাতে লেখা পত্রিকা বের করতেন। তাতে বিখ্যাত মানুষদের লেখাও প্রকাশিত হতো। আজিমপুরে এসে ছেলেমেয়েরা মিলে দেয়ালপত্রিকা করতেন, বাঁশে টাঙানো পত্রিকার নাম দিয়েছিলেন ‘বাঁশ-পত্রিকা’। তিনি নিজে হতে চেয়েছিলেন গল্পকার, ঔপন্যাসিক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধ্যাপনা তাঁকে প্রাবন্ধিক করে তুলল। তিনি নিজেই বলেন, অধ্যাপকের কাজ বিশ্লেষণ করা, আর কথাসাহিত্যিকের কাজ সংশ্লেষণ করা। দুটি কাজ ভিন্ন।
তাঁর জন্ম বিক্রমপুরে, নানাবাড়িতে। আড়িয়ল বিলকে তাঁর মনে হতো সাগরের মতো। বাবার চাকরির সূত্রে গেছেন রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কলকাতা। দেশভাগের অভিজ্ঞতা তাঁর কিশোর মনে গভীর ছাপ ফেলেছে। পদ্মার ধারে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের পতাকাবাহী স্টিমারকে স্বাগত জানানোর স্মৃতি তাঁর মনে আছে, আবার দেশভাগের ফলে মানুষের জীবনে নেমে আসা অনিশ্চয়তার কথাও তাঁর মনে আছে।
ঢাকায় এসে প্রথমে ভালো লাগেনি। কলকাতার তুলনায় ছোট, অপরিচ্ছন্ন, ঘোড়ার গন্ধে ভরা একটি শহর। কিন্তু সেই ঢাকাতেই তিনি বড় হয়েছেন, সেন্ট গ্রেগরী স্কুলে পড়েছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন এবং সারা জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তাঁর বয়স ১৬। তিনি মিছিলে গেছেন, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, পুকুরের পানিতে চোখ ধুয়েছেন। পরদিন আবার মিছিল হয়েছে। তিনি মনে রেখেছেন, পুরান ঢাকার উর্দুভাষী মানুষও ছাত্র নিহত হওয়ার খবর শুনে মিছিলে যোগ দিয়েছিল।
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফলের ঘটনাটিও সুন্দর। প্রথম শ্রেণিতে নাম নেই, দ্বিতীয় শ্রেণিতেও নেই। মন খারাপ করে ফিরছেন। মেজ ভাই আবার নিয়ে গিয়ে দেখালেন, তাঁর নাম প্রথম পাতায়—মেধাতালিকায়। তিনি নবম হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বের হলেন। ২১ বছর বয়সে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। সেই যে যোগ দিলেন, আজ ৯০ বছর বয়সেও তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ইমেরিটাস অধ্যাপক।
উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতে গিয়ে তিনি সমাজতন্ত্রের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হন। সারা জীবন সেই আদর্শ থেকে সরে আসেননি। পুঁজিবাদী বৈষম্য ও অন্যায়ের সমালোচনা তিনি করে গেছেন নিরন্তর। তাঁর বিশ্বাস, মানুষের মুক্তি সমষ্টির মধ্যেই নিহিত।
১৯৭১ সালে তাঁর নামও হত্যাকারীদের তালিকায় ছিল। জগন্নাথ হলের বিভীষিকাময় দিনগুলো তিনি দেখেছেন। অনেকেই শহীদ হয়েছেন, তিনি বেঁচে গেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি দেখেছেন সমষ্টির স্বপ্ন ধীরে ধীরে ব্যক্তিস্বার্থের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
১৯৮৯ সালে স্ত্রী নাজমা জেসমিন চৌধুরী মারা যান। ‘বন্ধুর মুখচ্ছবি’ নামে তিনি একটি অসাধারণ প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তারপর দুই মেয়েকে নিয়ে দীর্ঘ জীবন কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়েরা আছে বলেই নিজেকে একা মনে হয় না।’
তাঁর সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে তিনি আবার স্বপ্নের কথায় ফিরে আসেন। বলেন, এই গ্রহটাকে বাঁচাতে হবে। বলেন, স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না। বলেন, পৃথিবীকে সুন্দর করবে সেই মানুষেরা, যারা একই সঙ্গে হৃদয়বান এবং বুদ্ধিমান।
৯০ বছর বয়সে পৌঁছে একজন মানুষের এই বিশ্বাস ধরে রাখা সহজ নয়। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এখনো সেই বিশ্বাস ধারণ করেন। সম্ভবত এ কারণেই তিনি আমাদের কাছে শুধু একজন অধ্যাপক নন, শুধু একজন প্রাবন্ধিকও নন। তিনি আমাদের চিন্তার জগতের একজন শিক্ষক।
আর আমরা, তাঁর বহু পাঠকের মতো, এখনো তাঁর কাছ থেকে এই কথাটিই শিখে চলেছি—স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না।
শুভ জন্মদিন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার।