
তাহমিনা সালেহ ‘খেরোখাতা’ নামের একটা স্মৃতিচারণামূলক বই লিখে অভিনন্দিত হয়েছেন। তিনি ভাষাসংগ্রামী। ১৯৫২ সালে ছিলেন স্কুলের ছাত্রী, প্রথম যে ১০ জন ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছিলেন, তিনি তাঁদের একজন। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল, মুক্তিযুদ্ধ থেকে আজকের বাংলাদেশ—তিনি একজন নিভৃতচারী পর্যবেক্ষক, সময়ের সাক্ষী। ক্রাউন সিমেন্ট–অভিজ্ঞতার আলোর আয়োজনে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক।
আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি ক্রাউন সিমেন্ট-প্রথম আলোর অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে। আজকে আমরা এসেছি একজন প্রাজ্ঞজন তাহমিনা সালেহর কাছে। ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁর বয়স ৮৮ পূর্ণ হয়েছে। তিনি সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন, যে কারণেই আসলে আসা, সেটা হচ্ছে ‘খেরোখাতা’। এই ‘খেরোখাতা’ বইটা সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বাতিঘর থেকে। এই বইটা পড়ে আমি অভিভূত হয়েছি এবং তাঁর জীবনের গল্প শোনার জন্য অস্থির হয়ে আছি।
প্রসঙ্গক্রমে বলে নিই যে, তাঁর নিজের দুলাভাই ছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। কামরুল হাসানের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ছিল। তাঁর বিয়ে কামরুল হাসান দিয়েছেন। সৈয়দ মুজতবা আলী আবার তাঁর স্বামীর দিক থেকে আত্মীয়। তাঁদের সঙ্গে তাঁর স্মৃতি আছে। সব মিলিয়ে এবং ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম যাঁরা মেয়েদের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন, তাহমিনা সালেহ তাঁদের একজন এবং ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে তিনি কাপ্তাইয়ে ছিলেন। সেখানে যে অনেক ঘটনা ঘটে, সে সম্পর্কেও আমরা জানতে পারব।
খালাম্মা, আপনাকে স্বাগত জানাই। আপনাকে খালাম্মা বলছি। আপনি তো জানেনই যে আপনার ছেলে ইমন আর আমি বুয়েটে সহপাঠী ছিলাম। আর আপনার আরেক ছেলে আসিফ সালেহ সুজন, তিনিও আমাদের ঘনিষ্ঠজন। তিনি এখন ব্র্যাকের সিইও, তাই তো? তো আমরা এই অনুষ্ঠানে শৈশব থেকেই গল্পটা শুরু করি। জীবনের গল্প বলি। গল্পই করব আমরা। আপনার জন্ম হয়েছিল কি পুরান ঢাকায়?
তাহমিনা সালেহ: নিশ্চয়ই তা-ই। সেটাও জানি না। মিরপুরেও হতে পারে আমার গ্রামের বাড়ি দাদাদের।
আপনাদের বাবার একটা বাসা ছিল পুরান ঢাকায়, আবদুল হাদী লেনে।
তাহমিনা সালেহ: আবদুল হাদী লেনে।
আপনার আব্বার ফার্ম হাউস ছিল মিরপুরে।
তাহমিনা সালেহ: একদম। ওটা আমার স্মৃতিতেও নেই।
ওটা আপনার স্মৃতিতেও নেই। তারপর আপনারা আট ভাইবোন। তো শৈশবের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে ভাইবোন মিলে?
তাহমিনা সালেহ: খুব খুব মনে পড়ে। একসঙ্গে খাওয়া। সেই সেই খাওয়া। রোজ রোজ বাজার। এ চার আনা দামের ইলিশ খুব মনে পড়ে।
১৯৩৮ সালে জন্ম আপনার। আর আপনি গেলেন কামরুন্নেসা স্কুলে। ওই স্কুলে যাওয়ার ঘটনাগুলো মনে পড়ে? কীভাবে যেতেন? হেঁটে যেতেন?
তাহমিনা সালেহ: না, রিকশা করে যেতাম।
আপনার বোনেরাও ওই স্কুলে পড়ত?
তাহমিনা সালেহ: আমার বোন, জয়নুল আবেদিনের ওয়াইফ পড়ত ইডেন স্কুলে।
ইডেন স্কুলটা তখন আপনি বলছিলেন সদরঘাটে ছিল।
তাহমিনা সালেহ: সেখান থেকে এই এখন যে আমাদের ইডেন ভবন আছে, যেটা সরকারি কারখানা আরকি।
সচিবালয়?
তাহমিনা সালেহ: সচিবালয়। ওইটা স্কুল ছিল। আমি নিজেও এসেছিলাম। স্কুলটা বড়, মাঠ বড়, বলত, স্কুল মাঠের ওই দিকে যাবে না, এটা করবে না, ওটা করবে না, মেয়েদের হোস্টেল ছিল, তারপর তো সরকার ৪৭-এ তো নিয়েই নিল, ভবনটা তো নিয়েই নিল, ওটা কিন্তু ইডেন ভবন নাম ছিল।
ব্রিটিশ আমলে।
তাহমিনা সালেহ: ব্রিটিশ আমলে। আর কামরুন্নেসা স্কুল আর ইডেন স্কুল একসঙ্গে মিলে গিয়ে হলো কামরুন্নেসা স্কুল। কামরুন্নেসা কলেজ আর ইডেন কলেজ নিয়ে মিলে হলো ইডেন কলেজ। দুইটা এক।
এখন যে ইডেন কলেজের ক্যাম্পাস, ওইটা আজিমপুরের এদিকে।
তাহমিনা সালেহ: ওটা বকশীবাজার। নিউমার্কেটের পেছনে যেটা। বুয়েটের উল্টো দিকেই তো।
উল্টো দিকে সেইটাতে কি আপনি ক্লাস করতেন না?
তাহমিনা সালেহ: ওইটাতে ক্লাস করতাম। ওইটাতে রিকশায় করে আসতাম।
আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন, আপনি পুরান ঢাকার, কিন্তু আপনার বাংলাটা পুরান ঢাকার মতোন না হয়ে মান বাংলা হলো কোত্থেকে?
তাহমিনা সালেহ: কথা বলছি যে...জানি না। আমার ছেলেমেয়েদের তো আমরা পুরা ক্যালকেশিয়ান শিখিয়ে ফেলছিলাম। করেছি, খেয়েছি, বুঝেছ। এখন ওরা বলে না, কিন্তু ছোটবেলায় বলত। খুবই মিষ্টি মিষ্টি কথা বলত, বিশেষ করে মেয়েটা। সবাই ওকে বলত গল্প বলো। ... (কোত্থেকে শিখেছিলাম) আমি জানি না, বলতে পারব না। আমাদের তো সব এই দেশি বাংলাই বলা হয়। করসো, খাইসো, এটাই বলা হয়। আমিও বলি।
পুরান ঢাকার ভাষা পারেন আপনি?
তাহমিনা সালেহ: চেষ্টা করলে পারি। এই সিলেটি একটু একটু পারি।
সৈয়দ মুজতবা আলীর সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, উনি আমাদের সঙ্গে ছিলেন। দেখা হয়েছে। উনি আমাকে বলছেন, তুমি তো আমার মার লাহান। এই যে সিলেটি বলল মার লাহান। উনি তো খুব ভালো সিলেটি বলতেন। ১৪ থেকে ১৫টা ভাষা জানতেন। গীতা বলেন মুখস্থ। পুরা ‘সঞ্চয়িতা’ একদম ঠোঁটের আগায়...ওই পুরোহিতের ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন উনি।
সৈয়দ মুজতবা আলী হচ্ছেন আপনার স্বামীর দিক থেকে আত্মীয়। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়।
তাহমিনা সালেহ: স্বামীর আপন মামা। আপন মামা। ‘দেশে বিদেশে’ ওদের বাড়িতেই লেখা হয়েছে।
সেটা কোন বাড়ি, সিলেটে?
তাহমিনা সালেহ: ওদের সিলেটের বাড়ি...কাজীবাড়ি বলে। সবাই চেনে। খুব নামকরা পরিবার ওদের।
আর কিছু মনে পড়ে মুজতবা আলী সম্পর্কে?
তাহমিনা সালেহ: খুব সুন্দর ছিলেন দেখতে। এটা মনে পড়ে। ওনার জীবনকাহিনি যতই পড়ি, ততই আশ্চর্য হই। ওনার ওয়াইফটা ভালো ছিল। বোনেরা বিয়ে দিয়েছেন এই ওয়াইফের সঙ্গে। উনি বলেছেন, আমি কোনো দায়িত্ব নিতে পারব না। তো ওই ওয়াইফ রাজি হয়েছেন। স্ত্রী স্কুল ইন্সপেক্টর ছিলেন। উনি একাই দুই ছেলে মানুষ করছেন।
সৈয়দ মুজতবা আলী শান্তিনিকেতন থাকতেন। বগুড়ায় ওনার ভাই ছিল কমিশনার বোধ হয়। মূর্তজা আলী। সেখান থেকে ওনাকে কী কী বলা হলো, উনি আবার চলে গেলেন। আচ্ছা। না বাজে কথা বলা হইছিল, উনি আর থাকেন নাই।
আর ব্রিটিশ আমলের কথা আর কী আপনার মনে আছে? আপনার ভাই জেলখানায় ছিলেন? ওই যে শিবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গেলেন। খুবই ভালো ছাত্র, কিন্তু গিয়ে কমিউনিস্ট হয়ে গেলেন—ওই গল্পটা একটু করবেন?
তাহমিনা সালেহ: উনি খুবই প্রতিবাদী ছিলেন, কিন্তু ওটাতে আমার বাবার চোখের পানিতেই আমার মনে পড়ে বেশি। আমার বাবা এত অনুরোধ করছেন, এত কান্নাকাটি...আমি তখন একটা পিতার হৃদয় অনুভব করতে (চেষ্টা করি) আমার বাবার কী রকম লেগেছিল যে ছেলেটা গেল।
আপনার ওই ভাইটার নাম কী?
তাহমিনা সালেহ: নাসিরুদ্দিন। শেষে তো আমেরিকায় গিয়ে মরল। আমরা খুব ঠাট্টা করতাম—এখন তুমি আমেরিকা আসছ কেন, ক্যাপিটালিজমের দেশে। ওর এখানে বাচ্চাকাচ্চা বড় হয়েছে।
তো আপনারা যেহেতু আট ভাইবোন এবং আপনি বলছেন, আপনি সবার ছোট। তাহলে আপনার বড় ভাই আপনার চেয়ে কত বড় ছিল?
তাহমিনা সালেহ: প্রায় ২৪ বছর। ওনার বিয়ে আমি দেখিনি। আমার ভাবি আমাকে হতে দেখছে।
আপনার আব্বার চোখের পানি দেখলেন...উনি কোন জেলে ছিলেন?
তাহমিনা সালেহ: এই ঢাকা জেলে, রাজশাহী জেলে।
খাপড়া ওয়ার্ড, রাজশাহী।
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, হত্যাকাণ্ডগুলো হলো ভেতরে।
ওই সময় উনি রাজশাহী জেলে?
তাহমিনা সালেহ: ওই ঘরেই ছিলেন।
যারা তার মানে যারা ওই বিদ্রোহটা করেছিল, উনি তাদের একজন।
তাহমিনা সালেহ: ওই ঘরেই ছিলেন। আবার বলে যে আমাকে এত মারছে। ওরা বাঁশটাশ দিয়ে পিটিয়েছে তো বলে, সেই ব্যথা আমার আজও যায় না—বুড়ো বয়সে বলতেন। উনি আমেরিকা মারা গেছেন।
পরে ইঞ্জিনিয়ারিং আর পড়েন নাই।
তাহমিনা সালেহ: না, কিসের ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বে। বলে, ওদের চেয়ে আমি কম জানি নাকি। ভীষণ পড়ুয়া ছিল।
আর আপনার বোন জাহানারা। তাঁর বিয়ে হলো জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে। তখন আপনার বয়স?
তাহমিনা সালেহ: ৭-৮, এ রকম। ছোট, একদম ছোট। আমার ওই বোনও খুব বেশি মেধাবী ছিল। ফার্স্ট হতো। তারপর আমার দুলাভাই একবার লন্ডনে গেলেন। তখন আমার মা বললেন, এবার তুমি ম্যাট্রিকটা দিয়ে ফেলো। তখন ওর দুইটা বাচ্চা। তখন আমরা বাচ্চাগুলো কোলে রাখতাম। ও সাত মাস পড়ে লেটার-টেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে ম্যাট্রিক পাস করে বসে থাকল। সেই সময় অ্যাডিশনাল ছাড়াই।
১৯৫২ সালে আপনার বয়স হবে ১৪ বছর। আপনি তার মানে স্কুলেই পড়েন, কামরুন্নেসায়?
তাহমিনা সালেহ: আমি স্কুলেই পড়ি, এইটে পড়ি।
তো আপনারা যে একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গেলেন, ওই গল্পটা, আপনার ওই স্মৃতিটা আছে কি না, বলেন একটু।
তাহমিনা সালেহ: আছে আছে, পুরো আছে। ওই যে আফিয়া আপার হাজব্যান্ড শামসুল ইসলাম তখন বোধ হয় সেক্রেটারি ছিলেন আওয়ামী লীগের। উনি ভাঙতে দিতে চান নাই।
শামসুল হক আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি। উনি চাইছিলেন না যে ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করুক।
তাহমিনা সালেহ: কিন্তু ছাত্ররা বললাম আমরা ভাঙবই। তখন ওরা বলল, ১০ জন ১০ জন করে বের হবে। ছেলেরা তো প্রথম ১০ জন বের হলো। ওদের তো ধরে নিয়ে গেল। তারপর আমরা মেয়েরা কা কা করতে করতে ১০ জন বের হলাম। আমাদের ধরে। সবাই চামেলী হাউসে গেলাম। জুলেখা ছিল, এনামুল হকের বউ। আমার বোনের মেয়ে ছিল। আমি ছিলাম। এগুলোই মনে আছে। ওই জুলেখা আপু প্রত্যেক একুশে ফেব্রুয়ারি ফোন করত। চলো মিনা, আমরা টিভিতে যাই। আমি বলছি, না, আমি যাব না।
আমাদের কাছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি বলতে এখনকার কলাভবন বোঝায়, তখন তো এটা অন্য জায়গায় ছিল...
তাহমিনা সালেহ: না, মেডিক্যাল কলেজটাই। এখন যেটা মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগ, ওই সব জায়গায় ছিল (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)।
এখন যেখানে শহীদ মিনার?
তাহমিনা সালেহ: ওইখানটাতে আমরা গিয়ে দেখি কী লঙ্কাকাণ্ড! পুলিশ, গুলি, টিয়ার গ্যাস। কে যেন আমার ওড়না ছিঁড়ে দিল। বলে, চোখে পানি দাও, পানি দাও। এ তো টিয়ার গ্যাস। আমাকে ধাক্কা দিয়ে মেডিক্যাল কলেজের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। আমি তো বেফানা হয়ে ভেতরে ঢুকলাম। গিয়ে দেখি, রক্তাক্ত ছেলেরা সব বেডের মধ্যে, মানে চিৎকার করছে আরকি। এ-ই দেখে ভয় পেয়ে আমি পেছন দিক দিয়ে দৌড় দিলাম। বাড়ি কাছেই ছিল। আমি বাসায় তো যাই। আমার বাবা না জানি আমায় কত বকা দেবে। (বলবে) তুমি কোথায় ছিলা? দেখি, জানালা দিয়ে এ রকম করে বসে আছে। আমাকে দেখে কিছুই বলল না। কেন বলল না? এখন আমি ভাবি, মেয়ে তো ফিরে আসছে আর যা-ই হোক।
এটা আবদুল হাদী লেনের বাড়িতেই তো?
তাহমিনা সালেহ: আবদুল হাদী লেনে, বাবা একটা কথাও জিজ্ঞেস করেনি, তুমি কোথায় ছিলে।
তো ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে মেয়েরা প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করল, আপনি তাদের একজন। কিন্তু এটা নিয়ে কখনো কাউকে কিছু বলেননি, টিভিতে যেতে বলেছে, যাননি!
তাহমিনা সালেহ: আমার ছেলেমেয়েরাও জানে না।
তারপর এই প্রথম, এই যে এই বইটাতে বের হলো, ‘খেরোখাতা’য় এই কথাগুলো দুবার আপনার স্মৃতির মধ্যে আছে। আর আপনার ছেলে আসিফ সালেহ আপনাকে বলেছিল যে আপনার এই টুকরা টুকরা স্মৃতিগুলো লিখে ফেসবুকে দাও, তা আপনি এগুলো প্রতিদিন লিখতেন এটা...
তাহমিনা সালেহ: মাঝে মাঝে লিখে ফেলতাম আরকি। যেমন এখন আমাকে বলছে আবার লিখো।
লিখবেন। এই বইটা খুব সুন্দর হয়েছে, দর্শকমণ্ডলী, আপনাদের আমি বলতে পারি যে এত স্নিগ্ধ সুন্দর বই সাম্প্রতিককালে আমি দ্বিতীয়টা হাতে নিয়েছি বলে আমার মনে পড়ে না। আমি শুধু ওনার ২৫ মার্চের একটু বর্ণনা আমি পড়ে শোনাব। ওনার ভাষাটা কী সুন্দর এটা বোঝানোর জন্য। ‘২৫ মার্চ মধ্যরাতে রণদামামা বেজে উঠল, অশ্বের হ্রেষাধ্বনি শোনা যাচ্ছে। যূথবদ্ধ হস্তীর দল এগিয়ে যাচ্ছে সব দলিত-মথিত করতে, সেইক্ষণে বুঝতে পারিনি আগামীতে অদৃষ্টে কী লেখা আছে।’ আমরা কাপ্তাইয়ে ছিলাম...সেই গল্পে পরে আসব, আমি শুধু ভাষাটার কথা বলছি।
তারপর আপনার বিয়ে হলো কত সালে?
তাহমিনা সালেহ: ’৬০ সালের অক্টোবরে।
২২ বছর বয়সে। এর মধ্যে আপনি ম্যাট্রিক পাস করেছেন, ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছেন, বিএ পাস করেছেন...
তাহমিনা সালেহ: আমার বিএ পাস করার পরেই বিয়ে হয়েছে।
বিএ পাস করেছেন, তারপরে বিয়ে হয়ে গেল আপনার, ১৯৬০ সালে।
তাহমিনা সালেহ: অক্টোবরে।
বিয়ের অনুষ্ঠান কোথায় হয়েছিল?
তাহমিনা সালেহ: আমাদের বাসাতেই।
বাসাতেই হলো। তারপর আপনার হাজব্যান্ড হচ্ছেন আবুল খায়ের সালেহ। এ কে সালেহ নামে তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রকৌশলী আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পড়েছেন, যেটা এখন বুয়েট। যেখান থেকে পরে আপনার তিন ছেলেমেয়েই পড়ল, বড় মেয়ে লোপা পড়েছে, আমার বন্ধু ইমন এবং তার ছোট সুজন—আসিফ সালেহ। আচ্ছা, আপনার হাজব্যান্ড তো দেখতে অপূর্ব ছিল।
তাহমিনা সালেহ: খুব ভালো ছিল।
লোকে তাঁকে কী বলত, কার মতো দেখতে বলত?
তাহমিনা সালেহ: বিশ্বজিৎ। বিশ্বজিৎ তখন সিনেমার নায়ক। গোলাম মুস্তাফা বলতেন। আমাদের কাপ্তাইতে খুব শুটিং হতো, তো সব শুটিং ওই কাপ্তাইতেই হয়। ওই যে শাবানা-রাজ্জাক, রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমরা গল্প করতাম। নাদিম-শবনম রোগা পটকা ছিল।
বিয়ের পরে আপনারা, ওনার পোস্টিং ছিল কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রে, আপনারা কাপ্তাই চলে গেলেন, আপনিও চলে গেলেন। সেইখানে আপনার বাসাটা কোথায় ছিল?
তাহমিনা সালেহ: একদম স্পিলওয়ের ওপরে। নায়াগ্রা ফলস। আমি বলতাম নায়াগ্রা ফলস।
আপনার তিন ছেলেমেয়ের জন্মই ওখানে, কাপ্তাইয়ে।
তাহমিনা সালেহ: ওখানে থাকাকালীনই জন্ম। বাচ্চা নিতে যেতাম আর কি বাপের বাড়ি থেকে? তখন একটু কষ্ট হতো মনে যে আমি এখানে থাকলাম, অনেক কিছু বোধ হয় পেলাম না। এখন আমি ভাবি, আমি খুব ভালোই ছিলাম, ওরাও ভালোভাবেই বড় হয়েছে।
আপনি বলতেন যে ওদের প্রচুর খেলাধুলায় আপনি উৎসাহিত করেছেন।
তাহমিনা সালেহ: আমি বলতাম সারা দিন খেলো। কিসের এত পড়া পড়া।
কিন্তু তারা খুবই ভালো ছাত্র ছিল তিনজনই।
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, খুব। এটা বলতে হবে, আমরা দুজনেই মনোযোগী ছিলাম আরকি। আমি বলতাম বাংলা-টাংলা পড়াই, তুমি অঙ্কটা, আমি তো অঙ্ক পারি না। আমার হাজব্যান্ড পড়াত, সে-ও খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াত ওদের।
ওই বাড়িতে জয়নুল আবেদিন যেতেন।
তাহমিনা সালেহ: হুম, বছরে তিন-চারবার। আমার বোন চিঠিতে (লিখত) তোমার দুলাভাই তো খালি তোমার কাছে যেতে চায়। আমি বললাম, আচ্ছা। এখন আমি ভাবি যে আমি দুলাভাইকে কী দিয়ে সমাদর করতাম...
ইঞ্জিনিয়ার। কিন্তু সীমিত বেতনেরই সংসার।
তাহমিনা সালেহ: একদম।
আমাদের খালু সাহেব, উনি অনেক সৎ ছিলেন।
তাহমিনা সালেহ: খুব সৎ, মানে এক পয়সা এদিক-ওদিক না।
জয়নুল আবেদিনের একটা বিখ্যাত ছবি, একটা বালিকা বই পড়ছে। এই বালিকাটি তো আপনি।
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ।
উনি আপনার জন্য সব সময় বই আনতেন।
তাহমিনা সালেহ: সব সময়।
আচ্ছা, এই ছবিটা, আপনি যে মডেল হয়েছিলেন, উনি কোথায় এঁকেছিলেন?
তাহমিনা সালেহ: এইটা আমাদের বাসায়, আমার বাপের বাসায়। তখন তো আমি ছোট, বিয়ে হয়নি।
জয়নুল আবেদিন আপনাকে কী কী বই দিতেন?
তাহমিনা সালেহ: সত্যজিৎ রায়ের ওই যে ‘পাগলা দাশু’, ওপরে ছবি আঁকা ‘ক্ষীরের পুতুল’, ‘ঝালাপালা’—এসব মনে আছে। এত সুন্দর প্রচ্ছদ, সত্যজিৎ রায় যে আর একটা মানুষ। আমি তো অবাক, উনি তো সিগনেট প্রেসে ছিলেন। আমি আবার বই পড়তে গেলে না সব পড়ি; কার ছাপা, কী ছাপা, কোথায় মুদ্রণ, কত দাম। এগুলো এখনো পড়ি, আমার ভালো লাগে পড়তে। মানে তারপরে ওনার বাবা সুকুমার রায়, ওনার কবিতা-টবিতা, তাঁর দাদামশাই উপেন্দ্রকিশোর। ‘মহাভারত’ আমার একদম কণ্ঠস্থ ছিল। যুধিষ্ঠির কেন স্বর্গ পেল না, পঞ্চপাণ্ডবের যুদ্ধ।
জয়নুল আবেদিন আপনাদের কী কী বলতেন, কী খেতেন, এগুলো আপনার যত দূর মনে আছে বলুন।
তাহমিনা সালেহ: আমাদের ১২টা-১টা পর্যন্ত বসায় রাখতেন। ছোট ছোট মানুষ আমরা, অনেক হাই থট মানে উচ্চমার্গীয় চিন্তার কথা এসব। আমরাও শুনতাম, শুনেই মনটা বোধ হয়, মনে হয় আরেকটু বেশি শিক্ষিত হয়েছিল, সেটা বলতে চাই আর কি। এই যে শিক্ষার একটা ভাব যে ওনারও অনেক প্রভাব আছে।
উনি যে সোনারগাঁ জাদুঘর করেছেন, এসব বিষয়ে তো আপনাদের সঙ্গে গল্প করতেন...
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, মরার আগে আমি যখন গেলাম, মৃত্যুর আগে বলছে, মিনা, আমি তো ওইটা করে যেতে পারলাম না। আমি ওইটা করে যেতে চেয়েছিলাম, আর কি এটা-সেটা তারপর বললেন। আর খালি বলতেন, আমার একটা মেয়ে নাই। ওনার পাঁচটাই ছেলে হয়েছে। তখন উনি বলতেন, ইশ্, মেয়ে ছাড়া কি কিছু হয়? কে দেখবে আমার সব, ওইটা খুব বারবার বলত।
আপনি বলছিলেন যে আপনার বিয়ে কামরুল হাসান অ্যারেঞ্জ করেছেন, কামরুল হাসানের স্মৃতি আপনার কী মনে পড়ে বলেন।
তাহমিনা সালেহ: ওনাকে দেখতাম ওই উনি খুবই (বডিবিল্ডিং) করতেন...তো ওই সব করতেন।
বডিবিল্ডিং।
তাহমিনা সালেহ: বডিবিল্ডিং, হ্যাঁ, তো আমার ভাশুরের উনি খুব বন্ধু ছিলেন। প্রতিদিন যেতেন, রথখোলায় থাকতেন আমার ভাশুর। আর কলিম শরাফী। ওরাই বোধ হয় বলছিল...তো আমি একটা চিঠি, আমি পরে দেখি, আমার ভাশুর আমার হাজব্যান্ডকে লিখছে, তুমি চিন্তা করিও না। মেয়ে খুব সুন্দরী, খুব ভালো। টাকার জন্য চিন্তা করিও না। আমরা তো আব্বার পয়সায় বিয়ে করছি, মানে তোমার টাকা লাগবে না। আমার হাজব্যান্ড তো বলছিল, আমার টাকা নাই। টাকা নাই সত্যি, টাকা ছিল না, বিয়ের পর দেখি ৫০০ টাকা ওনার হাতে। সেটাই আর কি, তুমি চিন্তা করিও না। তো চিন্তা করে নাই, হুট করে বিয়ে করে ফেলেছে, ব্যস হয়ে গেছে।
কাপ্তাই থেকে আপনারা কবে এলেন ঢাকায়?
তাহমিনা সালেহ: ’৭৬-এ। ওই যে মেয়েটা ম্যাট্রিক পাস করে ফেলল, তখন তো আর থাকা যায় না।
লোপা আপা তাহলে পড়েছিলেন কোথায়?
তাহমিনা সালেহ: পড়েইনি। একটা স্কুল ছিল ওয়াপদা। নামটা ছিল...ওই স্কুলে যায়ইনি। ওই নিজেই পড়ত।
তারপরে ’৭১ সালে আমি যখন ঢাকায় এসে আমার আব্বার বাড়িতে, কী করবে মেয়েটা? এত ভিড় বাড়ির মধ্যে। একটা টিচারকে রেখে দিল, বুয়েটেরই ছেলে। আমাকে তখন ওই ছেলেটা বলে, খালাম্মা, আপনার এই মেয়েটা না খুব ভালো করবে বড় হলে। আমি যত পড়া দেই সব পড়াই করে রাখে। অনেক গোলমাল বাড়িতে, ও কোনার মধ্যে বসে বসে পড়েই চলেছে। এত লক্ষ্মী মেয়েটা ছিল।
উনি পরে বুয়েট থেকে পড়ে আমেরিকায় গিয়ে আরও উচ্চশিক্ষা...
তাহমিনা সালেহ: আইবিএম-এ চাকরি করেছে ১০ বছর। এখন ফেডারেল চাকরি করে পোস্টাল সার্ভিসে বোধ হয়। খুব ট্যুর করে দেখি।
আর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের বা আর কী কী স্মৃতি আপনি যতটুকু পারেন একটু বিস্তারিত বলেন, যেমন লিখেছেন...
তাহমিনা সালেহ: সারাক্ষণ ভয়ে থাকতে থাকতে আমার ২০ পাউন্ড ওজন কমে গেছিল এই সাত মাসে-আট মাসে। মানে আমার গলা দিয়ে ভাত নামে না আরকি। দুইটা কাপড় নিয়ে তো এসেছিলাম ওখান থেকে। হায় হায়, ওকে কেউ মেরে ফেললে আমি কই যাব? কে আমাকে দেখবে?
২৫ মার্চের পরে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত কাপ্তাই তো স্বাধীনই ছিল।
তাহমিনা সালেহ: বাংলাদেশের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন...ওইটাতে ফোন আসছে, ওই পাকিস্তানি আর্মিরা ছিল কিন্তু তখন। ফোন আসছে...এই ২৫ মার্চের খবর নিয়ে...ওটা ধরছিলেন ক্যাপ্টেন হারুন গিয়ে। উনি জেনে ফেলে পাকিস্তানিদের ঘরের মধ্যে বন্দী করে ফেললেন।
তারপরে যে ১৫ এপ্রিল পাকিস্তানি সৈন্যরা এসে আপনার হাজব্যান্ডকে ধরে নিয়ে গেল, শামসুদ্দীন সাহেবকে...
তাহমিনা সালেহ: প্রথমে এসে বলছেন, একজন বড় অফিসার এসেছেন, বলছেন তোমরা ভালো থাকবে, তোমাদের কিচ্ছু হবে না, তোমরা শান্তিমতো থাকো। তার একটু পরেই দেখি যে আবার আরেক দল লোক আসছে।
এসে ওই শামসুদ্দীন সাহেবকে...
তাহমিনা সালেহ: ওরাও এক...আমরা এক বাড়িতেই ছিলাম তখন। বসেছিলেন এই যে এ রকম। আমি দেখছি, আমি ঘরে এসে দেখি হাত তুলল। আচ্ছা, হাত তুলল কেন? এটা তো কোনো ভালো লক্ষণ নয়। আমি ওনার ওয়াইফকে গিয়ে বলছি, এই এসে তোমার হাজব্যান্ডকে দেখে যাও, দেখো নিয়ে যাচ্ছে কিন্তু। উনি তখন পাকিস্তানি ফ্ল্যাগ সেলাই করতেছেন।
শামসুদ্দীন সাহেব?
তাহমিনা সালেহ: ওনার ওয়াইফ। মেমসাহেব।
তারপর শামসুদ্দীন সাহেবকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলল নাকি সামনেই মারল?
তাহমিনা সালেহ: না, দুজনকে মাঠে নিয়ে কোথায় যেন নিয়ে দাঁড় করাল, তখন শামসুদ্দীন সাহেবকে আগে দাঁড় করাল। তো আমার হাজব্যান্ড বলে, উনি কিচ্ছু বলেনি, কোনো মার্সি চায়নি যে মাফ করো আমি কিছু করিনি। চুপচাপ গিয়ে নাকি উনি দাঁড়াইছে।
তারপরে গুলি করে মেরে ফেলল?
তাহমিনা সালেহ: ব্যস, গুলি করে আমার হাজব্যান্ডের সামনে পড়ে গেল, মরে গেল। আমার হাজব্যান্ডকে বলল, এবার তুমি গিয়ে দাঁড়াও। ওনার সামনে। তো আমার হাজব্যান্ড গিয়ে দাঁড়াল।
আপনার হাজব্যান্ড হাত তুলে বলে কী?
তাহমিনা সালেহ: শুনছি মরার আগে সবাই কলেমা পড়ে, তো আমিও পড়ি আরকি।… জোরে জোরে কলেমা পড়ছিলেন। তারপর আবার নাকি পিঠে হাত বুলাইছে যে গুলি লাগে না কেন। তারপরে তাকিয়ে দেখে যে মেজর ইফতেখার নাম ছিল ওনার। ওনাকে হাত দিয়ে ইশারা করে বলতেছেন, তুমি চলে যাও। ওই কানতে কানতে চলে এল।
সম্ভবত কলেমা শুনে তারা ভাবল যে...
তাহমিনা সালেহ: হতে পারে যে এ রকম মুসলমান বেটা। ও যখন কানতে কানতে ফেরত আসে, আমি বলছি, তুমি আসছ উনি কোথায়? বলে ওনাকে তো মেরে ফেলছে। ওনাকে তো গোসল-টোসল ছাড়াই, জানাজা ছাড়াই তো উনাকে ওইখানেই কবর দেওয়া হইছে কাপ্তাইয়ে। কেউ তো ছিল না।
উনি কি ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন?
তাহমিনা সালেহ: একদম পুরোপুরি ইঞ্জিনিয়ার, খুব ভালো ইঞ্জিনিয়ার। আমি আপনাকে বলতে পারব না, মানুষ যে কত ভালো হয়, শামসুদ্দীন সাহেব সেটা ছিলেন। উনার জন্য দুঃখে আমার পরান যায়, এখনো যায়। উনার ফ্যামিলিটা কী ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল।
আর আপনি আপনার হাজবেন্ডকে ধরে নিয়ে গেছেন, এই সময়ে আপনার বয়স ৩২-৩৩। ওই সময়ে আপনি অন্য ফ্যামিলিগুলোকে বলছেন যে ‘সরে যাও সরে যাও’, এই ফারুক আজিজ খান, ওয়ালিউল ইসলাম সবাইকে বলছেন।
তাহমিনা সালেহ: ফারুক আজিজকে কিন্তু ধরতে বারবার যেত, উনাকে টার্গেট করা ছিল কাপ্তাই বেতারকেন্দ্র ওই চিটাগাং বেতার এদেরই তো করা। ওরা কদিন পরপর যেত ওটা ঠিক করতে, দেখতাম আমি। বলত, ওই ফারুক আজিজকে যেখানে ধরতে চায়, তো ওরা ওইখানকার লোক বলে উনি তো কালকেই এখানে ছিলেন। উনি ওই বর্ডার দিয়ে পালিয়ে গিয়ে ওদিকে চলে গেছিলেন ত্রিপুরা না কই। উনি গিয়ে খবর দিছিলেন যে শামসুদ্দীন সাহেবকে মেরে ফেলছে। ইন্ডিয়া গিয়ে।
ফারুক আজিজ খানের একটা সুন্দর বই আছে, ‘স্প্রিং ১৯৭১’। প্রথমা থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, ‘বসন্ত ১৯৭১’।
তাহমিনা সালেহ: ওটা বাংলায় অনুবাদ হয়েছে নাকি, আমাকে ও ইংলিশটা দিয়েছে।
ওই বইয়েও আপনার কথা আছে।
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, আমার জায়গাটুকু আমি পড়েছি।
তারপর ওখান থেকে ১৯৭১ সালেই আপনারা চলে এলেন ঢাকায়?
তাহমিনা সালেহ: না, ১৯৭১ সালেই চলে আসছি। ওরাই আমাদের টিকিট কেটে দিছিল—পাকিস্তানিরাই। আর একবারে এসেছি ’৭৬ সালে।
তারপর এসে আপনারা ঢাকায় কোথায় থাকলেন ১৯৭১ সালে, পুরান ঢাকায়?
তাহমিনা সালেহ: আমার আব্বার বাসায়, ওখানে ছিলাম। আরও লোকজন ওখানে থাকত। আরে, ভর্তি ১০টি রুম, একদম ঠাসা। দোতলা বাড়ি, একতলা বাড়ি।
১৬ ডিসেম্বরের কথা মনে আছে আপনার?
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, খুব মনে আছে। আমরা গ্রামে চলে গেছিলাম। বিক্রমপুরের ওই দিকে। হেঁটে হেঁটে। আমার এই ছোট ছেলেটা ইমনকে নিয়ে...ইমন তো তখন ছোট। ও তো কাঁদে না, কিছুই করে না, কাঁদতেও চায় না। তো গ্রামের লোকজন খুব সাহায্য করে—আসেন আসেন, বসেন বসেন। তারপর দেখি, শরবত বানিয়ে দেয়—গামছা দিয়ে ছেঁকে, ওদের গামছা দিয়ে ছেঁকে। তারপর আমরা একটা পরিচিত লোকের বাসায় গিয়ে উঠলাম, ওরা আমাদের একটা ঘর দিল, থাকা-খাওয়ার জায়গা দিল। ওখানে আমরা বেশ কয়েকজন ছিলাম আরকি।
তারপর আমরা ১৬ হলে ১৭ ডিসেম্বর চলে আসছি...১৬ ডিসেম্বরের পরে ওই যে হাতিয়ার ডাল দো ডাল দো বলছে বারবার। তুমিও তো ছোট।
আমি ছোট—পাঁচ-ছয় বছর।
তাহমিনা সালেহ: ওই টিভি-রেডিওতে বলছে, হাতিয়ার ডাল দো মানিক শাহ বলতেছে। তারপর আমরা নৌকা করে ফিরছি ওই খালি, এত বড় নদী, একদম একটা নৌকাও নাই। আমরা চকবাজারে এসে নামলাম। নামতে না নামতে বাসায় এসে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে শুনি যে সবাইকে মেরে ফেলছে। ওই শুনে আমার কোনো মুক্তির আনন্দ ছিল না।
ওই যে বুদ্ধিজীবীদের মেরে ফেলেছে ওইটা...
তাহমিনা সালেহ: আমার কোনো মুক্তির আনন্দ ছিল না। রাব্বীর শ্বশুরবাড়ি তো আমাদের...।
ডাক্তার ফজলে রাব্বী।
তাহমিনা সালেহ: ডাক্তার ফজলে রাব্বী। ডাক্তার রাজ্জাকের উনি জামাই ছিলেন।
সেই সব কথা আপনি আপনার বইয়ে লিখেছেন।
তাহমিনা সালেহ: তারপর ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে আমরা আবার কাপ্তাই চলে এলাম।
’৭৬ সাল পর্যন্ত থাকলেন, তারপর আবার চলে আসছেন ঢাকায়।
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, ছাড়তে ইচ্ছা হয়নি কাপ্তাই; কিন্তু আসতেই হবে মেয়ের জন্য। মেয়ে কোথায় পড়বে। মেয়েকে আমি একা ছাড়ব না।
তারপর আমাদের ইঞ্জিনিয়ার সালেহ সাহেবের পোস্টিং কোথায় হলো—চাকরি করতেন—পরে এখানে এসে কী করলেন?
তাহমিনা সালেহ: ওই চাকরি ছেড়ে দিলেন।
চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন?
তাহমিনা সালেহ: হুম, আমার ভাইয়ের সঙ্গে বিজনেসে নামলেন। আমরা একটু পয়সার মুখ দেখলাম।
কী বিজনেস ছিল উনার?
তাহমিনা সালেহ: উনার কনস্ট্রাকশন আর্মিতেই, ক্যান্টনমেন্টে ছিল, তখনই আমি বাড়িটা করতে পারলাম আরকি।
আপনারা বাড়ি করলেন এই রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের পাশে।
তাহমিনা সালেহ: একদম পাশে। ওই লাইনেই মোহম্মদপুর।
ওইটা হচ্ছে গণভবনের উল্টো দিকে।
তাহমিনা সালেহ: একদম সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের উল্টো দিকে। উনি তখন থাকতেন না। এদিক-ওদিক, বগুড়া-চিটাগাংয়ে কাজ করতেন। আমি যদিও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার না, বাড়িটা কিন্তু আমি একলাই করে ফেলছি। চিন্তা করতে পারো, এই তিন বাচ্চা পেলেপুলে...আমি একলা বাড়ি করি।
তারপর উনার, ইমনদের আব্বার ক্যানসার ধরা পড়ল কত সালে?
তাহমিনা সালেহ: ওই নব্বই-একানব্বই সালে। উনার হয়েছে, উনি বলেন না শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে, বলো না কেন। তারপর কলকাতায় গেলাম আমরা বেড়াতে। গেলাম ওই এইচ মাহমুদের সঙ্গে। ওখানে গিয়ে উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তারপর ডাক্তার নেওয়া হলো, খুব বড় ডাক্তারের সঙ্গে আমার ভাশুরের পরিচয় ছিল। তো উডল্যান্ড নার্সিং হোমে দিল। উনার অপারেশনটা তখন হলেই ভালো ছিল। উনি দেরিটেরি করে ফেললেন। উনার কেমন রাপচার-টাপচার কী কী হয়ে গেল। আমরা দুই মাস প্রায় উডল্যান্ডে ছিলাম। তারপর ওখান থেকে উনার ছয়টা সিট ভাড়া করে আমরা ঢাকায় চলে এলাম। ওখানকার ডাক্তার বললেন, বাসায় নিয়ে যান। খাবেদাবে ভালো। ভালো হয়ে যাবে। তারপর সেখান থেকে লাস্ট ট্রিটমেন্টটা আমরা বামরুনগ্রাদে করলাম। সেখানে গিয়ে উনি একদম ভালো। জীবনে আমি দেখিনি যে কোনো ক্যানসারের রোগী একটা ওষুধও খায়নি, লাগেইনি উনার। কোনো ওষুধ না, কোনো ক্যানসারের ওষুধ না, উনি দিব্যি ভালো হয়ে গেলেন। তারপর ১২ বছর বেঁচে ছিলেন। ২০০৩ সালে উনি মারা গেলেন, সেটা হেপাটাইটিস সি-তে। আমার এখনো মনে আছে, তখন কোনায় ডাক্তার দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘ইউ হ্যাভ নো হোপ মিস্টার সালেহ।’ আমরা ছয় মাস পরপর ব্যাংককে যেতাম, ফর চেকআপ। তখন বলত, ‘খুব ভালো আছ তুমি। যাও, এবার বেড়াও থাইল্যান্ডে।’ এ রকম করে আমাদের বলত। শেষবার বলল, ‘ইউ হ্যাভ নো হোপ।’
সেটা শুনে আপনি কী করলেন আর উনি কী বললেন?
তাহমিনা সালেহ: আমি তাকায়ে রইলাম আর উনার মুখটা একদম ছোট হয়ে গেল। উনি মৃত্যুকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন। মানে, চলে যেতে হবে তো, বাচ্চাদের নিয়ে থাকলেন।
তখন উনার বয়স কত? আপনার বয়স ৬৫ বছর।
তাহমিনা সালেহ: আমার বয়স ৬৫ বছর। উনার বোধ হয় ৭০। তবে এটা ঠিক যে উনার মতো বাবা যে কত ভালো হতে পারে, আমি উনাকে দেখেই বুঝছি। ওদের বাপের মতো নাকি কেউ হয় না। বাপ যে কত ভালো হতে পারে, আমি উনাকে দেখে দেখে বুঝছি। বাপ যে কত সুপারবাপ হতে পারে। এটা ঠিক।
আপনি তো ব্রিটিশ আমলের ঢাকা দেখলেন, আস্তে আস্তে পাকিস্তান...
তাহমিনা সালেহ: আমার দুর্ভিক্ষটা একটু মনে আছে, ’৪৩-এর দুর্ভিক্ষ। আমার আব্বা অনেক চাল কিনে রাখছিলেন। সে চালে পোকাও ধরে গেছিল। বলতেন যে কিছু না পাক, ভাত তো খাবে। এটুকু মনে আছে, দু-একটা মনে আছে—হাড্ডি জিজ্জি—ওই সব।
ওই ছবি কি জয়নুল আবেদিন কলকাতার দুর্ভিক্ষ আঁকলেন?
তাহমিনা সালেহ: ওইগুলোর ছবি।
সাতচল্লিশের দেশভাগ নিয়েও তো আপনাকে এই বইয়ে দেখলাম, আপনি একটু বেদনার্তই।
তাহমিনা সালেহ: আমি বেদনার্ত, এটা ঠিক।
আপনাদের ভাইবোনেরা কেউ কেউ তখন কলকাতায় বা অন্য জায়গায় ছিলেন?
তাহমিনা সালেহ: ছিল তো। জয়নুল আবেদিনই ছিল। আমার এক বোন ছিল দার্জিলিংয়ে, আরেক বোন এলাহাবাদে। সবাই চলে এল ঢাকায়। সবাই অপশন দিল, পাকিস্তানে আসবে। সবাই এসে পড়ল।
তখনকার ঢাকা আর এখনকার ঢাকা আপনাকে কোন পার্থক্য লাগে? পরিবর্তনটা তো ধীরে ধীরে হয় বলে একসময় বোঝা যায় না। কিন্তু ওই সব দিনের কথা মনে পড়ে, ঢাকাটা কত সুন্দর ছিল?
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ। ওই যে নিউমার্কেট হতে দেখলাম, গুলিস্তান হতে দেখলাম। গুলিস্তান যে হয়, চোখের সামনে দেখলাম। আগের ঢাকাটা সদরঘাট থেকে মোটামুটি গুলিস্তান পর্যন্ত ছিল, নবাবপুর রোড পর্যন্ত ছিল। ওই রেললাইনটা পর্যন্ত ছিল। ওই রেললাইন তো ওখানেই ছিল। নবাবপুরে ভিড় ছিল না, ওটা দেখতাম। এই সব দেখতাম। তারপর চোখের সামনে আস্তে আস্তে এই ঢাকা স্টুডিও, গুলিস্তান, নাজ—যেগুলো হলো না? ব্রিটানিয়া সিনেমা হল ছিল। এই পুলিশ হাসপাতাল ছিল। সবই দেখলাম। আরেকটা ভালো লাগে যে তখন কোনো ছেলেধরা ছিল না...আমরা ছোটবেলায় রাস্তায় বেরোলে বাপ-মা চিন্তা করত না—এই বাচ্চাটা আমার হারায় যাবে কি না। এখন তো দোতলা থেকে নিচেও নামতে দেয় না।
আপনি লিখেছেন যে ঢাকাটা নতুন ছিল। সুন্দর করে সাজানো যেত, সেটা সাজানো হয়নি।
তাহমিনা সালেহ: এটা ঠিক। এটা দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছিল। ইসলামাবাদ ওয়ান অব দ্য বেস্ট ক্যাপিটালস নাকি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে। ওরা তো নতুন। তো আমরা কেন পারলাম না? আমরা আসলাম। তুমি যা-ই বলো না বলো...বলতে চাই না, তবু বলি যে...আমরা একটু কী রকম একটা বাজে জাতি হয়ে গেছি না? খালি টাকা টাকা করি সবাই। দেশের কথা ভাবি না কেউ। নিবেদিতপ্রাণ দেখি না কাউকে। আমরা একটা লিখলাম যে সৎ মানুষের খোঁজে। আমি চিরজীবন চেয়ে রইলাম, দেখতে চাই।
সৎ মানুষের খোঁজের মধ্যে আপনি বলছেন, একজনকে পেয়েছেন। ফজলে হাসান আবেদ। উনার সঙ্গে আপনার প্রত্যক্ষ কথাবার্তা হয়েছিল?
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ। এসব নিয়ে না। তো উনাকে দেখে আমি একটা জিনিস বুঝতাম যে তুমি আমার পাশে বসে আছ, উনি কথা কম বলবেন, কিন্তু আমার সব কথা বের করে নেবেন। এই বের করার কথাটি উনি জানেন। উনি মূলে নিয়ে যান। মূলটা কোথায়? রুট কোথায় আমার? কীভাবে করলে বাকিরা উঠবে? মেয়েদের ওঠাতে হবে। সুজনের ড্রাইভারও তো মেয়ে ছিল—রাজিয়া। ভালো লাগে, ভালো লাগে। এই যে উঠানটা, এটা ভালো লাগে আমার। এই যে নিবেদিতপ্রাণ। উনারও তো বিপর্যয় কম যায়নি। বউটা মারা গেছেন, বাচ্চা একটা কয়েক ঘণ্টার রেখে। সেই বাচ্চা তো একাকীই বড় করছেন। বেশ ভালো মানুষ হয়েছে ওরা। ভদ্রলোক বাপের মতোনই। ভালো হয়েছে। ভালোই লোক। তা মারা যাওয়ার আগে কোথায় কলাম্বিয়া পড়াইছে তো ভালোই তো পড়াইছে। মানে, করতে যে পারলেন আরকি, এটা তো সোজা কাজ নয়। তারা বলে যে ‘আব্বা এসেই আমাদের বলতেন, “তোমার বই আনো।”’
আপনার এই বইয়ে আপনি লিখেছেন যে ছাত্ররা যখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলন করল, ওরা নিজেরাই ট্রাফিক কন্ট্রোলিং করল, ওটার আপনি খুব প্রশংসা করেছেন।
তাহমিনা সালেহ: আমি...আমার খুব ভালো লাগছে। কী সুন্দর বেস্ট স্টাইল যে ব্যাকপ্যাকিং...ওরা যেটা সুন্দরভাবে চালাতে পারে, আমরা পারি না কেন? আমি রাজনীতি নিয়ে আগে খুবই আগ্রহী ছিলাম। এখনো আগ্রহী। তো ওরা কেউ শোনে না। আমি ৫০ সাল থেকে নিয়মিত কাগজ পড়ি। কোরিয়ার যুদ্ধ লাগল। তারপর করোনার সময় আমি কাগজ বাদ দিলাম।
প্রথম আলোটা পড়তে পারেন।
তাহমিনা সালেহ: তাই, না?
ভালোই কাগজ করি আমরা।
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ, না, এটাই তো বেস্ট। এটাই বেস্ট। বেস্ট অ্যান্ড মোস্ট পপুলার। মোস্ট পপুলার। বহু বড় বড় বিজ্ঞাপন দেন।
আমরা বিজ্ঞাপন দিই, কারণ টাকা লাগে।
তাহমিনা সালেহ: টাকা লাগে।
আপনিও লিখেছেন, অর্থই অনর্থের মূল নয়।
তাহমিনা সালেহ: অর্থই অনর্থের মূল নয়। এটা আমি এখনো বলি। অর্থের দরকার আছে। ওই তখনো আমার ছেলেমেয়েরা বলে, ‘আম্মা, তুমি টাকা-টাকা করো কেন? আম্মা, তুমি খালি টাকা চেনো?’ এটা বেশি বলে ইমন। আমি বলছি না যে আমি করি না। তোমরা তো দেখোনি, বৃদ্ধকালে বা প্রবীণ বয়সে টাকার দরকার আছে।
আপনি বলেছেন?
তাহমিনা সালেহ: সত্যি। সত্যি।
আপনার যে বয়স, তাতে তো অনেকের মৃত্যু আপনাকে দেখতে হয়েছে।
তাহমিনা সালেহ: আমার সবার মৃত্যু আমি দেখে ফেললাম, আর এত ভালো লাগে না।
আপনার আট ভাইবোনের মধ্যে সাতজনই মারা গেছেন না? আপনি একা আছেন।
তাহমিনা সালেহ: আমি একা।
আবার আপনার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও নিশ্চয়ই অনেকে?
তাহমিনা সালেহ: সব দিগন্ত বন্ধ। কোনো বন্ধু নেই।
তবু বলেছেন আপনি, জীবনটা আপনার সুন্দর।
তাহমিনা সালেহ: আমার জীবন সুন্দর। এটা আমি বলব। কারণ, সন্তানেরা কোনো ঝামেলা করে না। আমার স্বামী খুব ভালো ছিল। জীবনেও বলেনি যে তুমি বেশি খরচ করো কেন? কী টাকার হিসাব? দাও তো। না, না, না, নেভার। অতি ভদ্রলোক।
৬৫ বছর বয়সে আপনি আপনার স্বামীকে হারিয়েছেন। এখন ৮৮, মানে আরও ২৩ বছর পার হয়ে গেল। কেমন লাগে একা থাকতে?
তাহমিনা সালেহ: ভালো লাগে না। খারাপ লাগে। যখন একা ভাত খাই, তখন আমার খারাপ লাগে। আমার স্বামী বলত, ‘এটা রান্না করো, ওটা রান্না করো।’ খাদ্যরসিক ছিলেন।
তবে আপনার এই নিজের যে রাজত্ব, এটাই আপনার ভালো লাগে।
তাহমিনা সালেহ: আমার ভালো লাগে। আমি স্বাধীনতা চাই।
না হলে আপনি তো আমেরিকায় গিয়েও থাকতে পারেন, আমেরিকান পাসপোর্ট আছে।
তাহমিনা সালেহ: আমি ছেলের বাসায় গিয়েও থাকতে পারি। আমি থাকব না। ছেলে বলে, ‘আম্মা, তুমি থাকবে।’ আমি বলেছি, না।
ঢাকায় আসিফ সালেহর বাসায়ও থাকতে পারেন। ঘরের কাছে তো।
তাহমিনা সালেহ: না, আমি থাকব না। একসময় আমাকে যেতে হবে। একটা বয়স আছে, যখন সত্যিই পারব না। সেই দিন আমার আসছে সামনে। কিন্তু এখন আমি যেতে চাই না। এখন আমি পারছি।
আপনি যে এখনো সুন্দর আছেন, শারীরিকভাবেও সুন্দর আছেন, এটার রহস্যটা কী?
তাহমিনা সালেহ: আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করে। আমি খুব নিয়ম মেনে চলি। খুব নিয়ম মানি, এটা ঠিক। ভোর সাড়ে পাঁচটা-ছয়টায় আমি উঠে পড়বই পড়ব। সাড়ে সাতটার মধ্যে নাশতা খেয়ে ফেলব। কোনো বার্গার আমি জীবনে খাই না। পিৎজাও খাই না আমি। ফুচকা তো মুখে দিয়েও দেখিনি, এটা কী জিনিস। পোলাও-টোলাও আমি খাই না। আমি ভাত, মাছ, অতি সাধারণ একটা তরকারি…ব্যস দুপুর সাড়ে ১২টায় খেয়ে ফেলব। খুব নিয়ম মানি।
খালাম্মা, বাংলাদেশ নিয়ে কি আপনি আশাবাদী? আশা করেন? আমার তো ভয়ও লাগে।
তাহমিনা সালেহ: এটা আমারও লাগে। তবু আবার আশাবাদীও। কেন জানো? ওই যে বাচ্চা ছেলেরা এই করছে, ওই করছে, ওরা দেশ চালাবে কী? ওদের তো অভিজ্ঞতা নেই। আমি বলছি, করতে করতেই হবে। একসময় না একসময় তো যেতে হবে। আমি বলছি, দেখবে ওদের মধ্যেই কেউ বেরিয়ে গেছে। ওরাই আমাদের দেশ চালাচ্ছে। ওদের হাতেই আমাদের ক্ষমতা দিতে হবে। এটা আমি বলি।
আপনি ব্রিটিশ আমল দেখলেন, পাকিস্তান আমল দেখলেন, বাংলাদেশের ৫৫ বছর দেখলেন। দেশটা কি ক্রমাগত এগোচ্ছে, নাকি পেছাচ্ছে?
তাহমিনা সালেহ: এটা বলা মুশকিল। সেদিন আমাকে ওরা নিয়ে গেছিল শেরাটনে। এত বৈষম্য কেন? দেশে। কোথায় গেছিলেন? শেরাটনে। শেরাটনে গেছিলেন যে দেশে কেন এত বৈষম্য? আমি খাব আর ওরা খাবে না। ওরা এখন এটা বুঝে গেছে যে তোমার থাকবে আমার থাকবে না, এ হবে না। মানুষ এ ব্যাপারে সচেতন হয়েছে। একদম। ওদের আগে এক আমি দেখছি ওদের খালি পায়ে, জামা নাই। সেই মানুষের বাড়িতে এখন চার-পাঁচজন রোজগার করে। ওদের তো পয়সা হবেই। বলে, পেট মোটা টিভি না, দেয়ালে লাগাইন্না টিভি কিন্না দেন। ফ্রিজ আছে সবার বাসায়। টিভি আছে সবার বাসায়। ও ব্লেন্ডার, সে তো আছেই। স্মার্টফোন আছে। এটা তো আছেই। ওই ছোট ফোন দিলে চলবে না, ওই স্মার্টফোন দেন। তার মানে তো ঠিক আছে, তাহলে তারা উন্নতি করছে।
কাজেই আপনি বলছেন বৈষম্য কমাতে হবে?
তাহমিনা সালেহ: বৈষম্য না কমালে উপায় নেই। এই ছেলেরাই হাতে তুলে নেবে।
আর আপনি খুব নারীদের অগ্রযাত্রায় বিশ্বাস করেন। ক্ষমতায়নে বিশ্বাস করেন।
তাহমিনা সালেহ: করি করি। সবচেয়ে প্রথম নারীবাদী দেখছি আমার মেয়েটাকে, ছোটবেলা থেকে। বলত, আমি পুতুল খেলি না। কেন পুতুল খেলব? রান্না? ওই যার বুদ্ধি আছে, সে সবই পারে। কথা তো সত্যি। ছেলেদের সঙ্গে খেলতে চলে যেত। হ্যাঁ, আরও কি, রান্না একটা ব্যাপার নাকি? ও তো আমি ইচ্ছা করলেই পারি। যার পেটে বুদ্ধি আছে, সে সব পারে।
আপনার অবসর কাটে বই পড়ে, গান শুনে?
তাহমিনা সালেহ: ভীষণ গান শুনি। গান খুব পছন্দ করি। হ্যাঁ, অবসর কাটে। বই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ভালোবাসি। স্টিল আমার খুব ইচ্ছে করে যে বইপত্র নিয়ে খুব নাড়াচাড়া করি।
কবিতাও পড়েন তো?
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ। ‘সঞ্চয়িতা’ কাছে রাখছি। ‘সঞ্চয়িতা’র কবিতা।
রবীন্দ্রসংগীত শোনেন?
তাহমিনা সালেহ: ভীষণ।
কার কার গান ভালো লাগে?
তাহমিনা সালেহ: বন্যা ভালোই গায়। বন্যা ভালোই গায়।
অনেকগুলো গান ও কবিতার লাইন ব্যবহার করেছেন আপনি। ‘ঝরা পাতা গো, আমি তোমারই জালে...’ মৃত্যু নিয়েও তো আপনি সুন্দর সুন্দর কথা লিখেছেন। এই মুহূর্তে আপনার মৃত্যুকে নিয়ে ভাবনা কী?
তাহমিনা সালেহ: আমার ভাবনা যে মৃত্যু আমার খুব কাছে চলে এসেছে এখন। কিছুদিন আগেও ভাবতাম না সেটা। চলাফেরা ছিল। এখন ভাবি, আর দিল্লি দূরস্থ নয়, দিল্লি খুব কাছে।
তা না-ও হতে পারে। সুস্থতা...
তাহমিনা সালেহ: না, খুব বেশি হলে ৮৮-৯০তেই গেলাম নাহয়।
নাহ, ১০০ বছরও তো মানুষ বাঁচে।
তাহমিনা সালেহ: না, ওটা চাই না। ওই কী রকম, ওই বাঁচা বাঁচা নয়। এখন ভাবছি, দিল্লি হনুজ দূরস্থ না। দিল্লি কাছে আমার এখন। এটা ভাবি। ঘরের দিকে তাকাই, কে কোনটা নিয়ে যাবে, সব নিয়ে যাও। অর্ধেকই তো চিনি, মানুষকে দিয়ে ফেলছি সব। আরও দিতে চাই। যার যেটা খুশি, যে যেমনে পারো। এটা দে, এটা নাই, ওটা নাই…আমি বলছি, হ্যাঁ, ওরা তো নেবেই। ওরা জানে যে আমি বুড়ো হয়ে গেছি। ওরা আমাকে ব্ল্যাকমেল করে। সবাই আমাকে ব্ল্যাকমেল করে।
আপনি সবই বোঝেন।
তাহমিনা সালেহ: আমি যতই বুঝি, ওরা বুঝছে আমি যতই বুঝি আমি এখন অবুঝ। আমাকে ব্ল্যাকমেল করা যায়, এই স্টেজে আমি এসে গেছি। কিন্তু আমি নারাজ, ওদের আমার সইতেই হয়।
আমাদের জন্য একটা পরামর্শ কিছু আছে?
তাহমিনা সালেহ: আমি বলব, সৎ মানুষের হাতে যেন দেশটা চলে যায়। তারা যেন আমাদের টেনে সামনে নিয়ে যায়। সৎ মানুষের নেতৃত্ব দরকার। নেতৃত্ব দরকার, এটা আমি চাই। সবাই মিলে যেন আমরা চলতে পারি। রাস্তায় বেরোতে যেন ভয় না লাগে আমার। আমি কেন এই বুড়ো বয়সে ভয় পাব? আমার ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই। আমি সব করব। আমি আরও সুযোগ-সুবিধা চাই। আমি আরও সুযোগ-সুবিধা পেলে ভালো হতো। না দাও, না দাও…অনেক গরিব লোক আছে। এটা আমি ভাবি। আমার নাহয় ভালো ভালো ছেলেমেয়ে আছে। সবার তো আর তা নাই। সবাই তো একা একাই থাকে, কষ্টেই থাকে।
ছোট ছেলে সুজনকে, আসিফ সালেহকে আপনি গান শিখিয়েছিলেন।
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ।
আপনি নিজে গান করেন না?
তাহমিনা সালেহ: না। করতে ইচ্ছে ছিল। কেন যে ভয় পেয়ে করলাম না, এটাই আমি ভাবি আবার। আমাকে নিশ্চয়ই মানা করত না। আমার বোনের মেয়ে তো গান শিখত বুলবুল একাডেমিতে। বাসায় মাস্টারটাস্টার! আমার মেয়ে তো তখন বুয়েটে ভর্তি হয়ে ভয়ংকর ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তো, ও বাদ দিল। ইমনকেও চেয়েছিলাম। বাপরে বাপ, তোমার গলা যে মোটা! তোমার দ্বারা গান হবে না। আচ্ছা! এখন ভাবি যে ওই মোটা গলায় একটু ভ্যা ভ্যা করত, তা-ও তো হতো।
আপনি এই বুড়ো বয়সে এসে আপনার ছেলের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এই বইটা লিখলেন। প্রতিদিন একটু একটু করে লিখেছেন। হাতে লিখেছেন।
তাহমিনা সালেহ: হাতেই লিখি। হাতেই লিখি। সেগুলি আমার ফেসবুকে উঠেছে। এই ফেসবুকে উঠেছে।
আপনার বইটা এত সুন্দর হয়েছে, এত ভালো হয়েছে, এ রকম বই তো আমরা আরও আশা করি। আরেকটা কিছু লিখতে শুরু করবেন এখন?
তাহমিনা সালেহ: হ্যাঁ। ওটা করে দিন কাটাব। আমি আশপাশে এ রকম যা দেখব, আমি তা-ই লিখব। আমার অত বেশি কিছু করার দরকার নাই। আমি আশপাশে এ রকম-এ রকম দেখব, আমি লিখব। লিখব। এ রকম ছোট ছোট লেখাই লিখব। লিখতে আমার ভালোই লাগে। মন্দ লাগে না।
খুব সুন্দর বই হয়েছে। খুব ভালো লেখা হয়েছে।
তাহমিনা সালেহ: সত্যি সত্যি বলছ তো? বিশ্বাস করছি না কিন্তু।
বিশ্বাস করেন, খুব ভালো বই হয়েছে। বইটা পড়েই তো আমি আপনার কাছে এলাম।
তাহমিনা সালেহ: খুশি হলাম।
ঠিক আছে, তাহলে আমরা শেষ করি।
দর্শকমণ্ডলী, ‘খেরোখাতা’র লেখক তাহমিনা সালেহর সঙ্গে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার কথা শুনলাম। খুব স্নিগ্ধ একটা অনুভূতি নিয়ে আমরা সবাই ফিরে যাচ্ছি। আমার তো খুবই ভালো লাগল। আশা করি, আপনাদেরও ভালো লাগবে এবং আপনারা আমার মতোই তাঁর এই আলোচনা থেকে ঋদ্ধ হবেন। সবাই ভালো থাকবেন। ধন্যবাদ।