
হাওরে বন্যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেছেন, যেসব কৃষক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের সহায়তা করতে হবে এবং তাঁদের সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এসব বিষয় সুশাসন, পরিবেশ এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বদিউল আলম মজুমদার। ‘হাওর রক্ষায় টেকসই ব্যবস্থাপনা ও সুনামগঞ্জের উন্নয়ন’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজনের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের দেশটি ছোট দেশ। আমাদের কৃষিজমি ক্রমাগত কমে যাচ্ছে। বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ। সুনামগঞ্জের হাওর ঐতিহাসিকভাবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন যদি আমরা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করে কিছু সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে পারি, তাহলে তা শুধু সুনামগঞ্জবাসীর জন্য নয়, পুরো জাতির জন্য খাদ্যনিরাপত্তাসহ বহু কল্যাণ বয়ে আনবে।’
সুনামগঞ্জের সমস্যাগুলো শুধু সুনামগঞ্জের সমস্যা নয়, এগুলো জাতীয় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান করা গেলে দেশে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা পাবে। একই সঙ্গে সরকারও সফল হবে। কারণ, হাওরের বন্যায় যে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তা দেশের খাদ্যশক্তির ক্ষতি। এই ঘাটতি পূরণ করতে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হয়, যার জন্য মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সুজনের সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাতটি জেলায় বিস্তৃত হাওর অঞ্চল দেশের খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, শুধু সুনামগঞ্জ জেলার ১৩৯টি হাওরে চলতি মৌসুমে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। সেখান থেকে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। তবে যথাযথ তদারকি ও টেকসই পরিকল্পনার অভাবে এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নানা ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
সংবাদ সম্মেলনে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। বক্তারা বলেন, প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও কৃষকের দুর্ভোগ কমছে না। তাঁদের মতে, নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারি বা মার্চে কাজ শুরু হয়। ফলে আগাম পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়।
এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠনে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের কারণে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের ফলে হাওরের স্বাভাবিক পানিনিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, একসময় হাওরে ১৪০ থেকে ১৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা কমে ৬০ থেকে ৭০ প্রজাতিতে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বিলীন হয়ে যাচ্ছে হিজল-করচবাগান ও চারণভূমি।
হাওর অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে হাওরের কৃষি, পানি, মৎস্য ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ ‘হাওরবিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন।
এ ছাড়া প্রতিবছর অস্থায়ী মাটির বাঁধ নির্মাণের পরিবর্তে নদী, খাল ও বিল খননের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা; বৈজ্ঞানিক হাইড্রোলজিক্যাল ম্যাপিং প্রণয়ন; পিআইসি ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা; ডিজিটাল মনিটরিং ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবিও জানানো হয়।
সুজন সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি নুরুল হক আফিন্দী বলেন, মৎস্য, পাথর ও ধান—এই তিনটিই সুনামগঞ্জের প্রাণ। জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও এগুলো গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কিন্তু এখনো প্রত্যাশিত উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে না।
নুরুল হক আফিন্দীর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ সরকার, যুগ্ম সমন্বয়কারী নেছার আমিন ও জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক কাজী নুরুল আজিজ চৌধুরী।