বাদল ফরাজির মুক্তির দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন। আজ সোমবার দুপুরে
বাদল ফরাজির মুক্তির দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন। আজ সোমবার দুপুরে

বাদল ফরাজির মুক্তির সুস্পষ্ট নির্দেশনা চেয়ে সাত দিনের আলটিমেটাম

কারাভোগ শেষ হওয়ার চার বছর পার হলেও বাদল ফরাজিকে মুক্তি না দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর স্বজনেরা। একই সঙ্গে আগামী সাত দিনের মধ্যে তাঁর মুক্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না পেলে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।

আজ সোমবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন থেকে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। ‘ভুল বিচারে ১৮ বছর, ভারত থেকে বাংলাদেশ! বাদল ফরাজির মুক্তি কবে?’ স্লোগানে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

‘বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। বাদল ফরাজির বড় বোন আকলিমা আক্তার, প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা পাভেল বাবু, ‘বাদলের কারাবাস’ বইয়ের লেখক রাহিতুল ইসলামসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।

ভাইয়ের মুক্তি চেয়ে বাদল ফরাজির বড় বোন আকলিমা আক্তার বলেন, ‘বাদল ফরাজি নির্দোষ হওয়ার কারণেই ভারত তাঁকে বন্দিবিনিময় চুক্তিতে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার আজও তাঁকে মুক্তি দেয়নি। ভারতের আইন অনুযায়ী চার বছর আগে তাঁর সাজা শেষ হলেও মুক্তি মেলেনি। আমার ভাইটাকে অন্যায়ভাবে কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। এই অমানবিকতার শেষ কবে হবে?’

বর্তমান সরকারের উদ্দেশে আকলিমা আক্তার বলেন, ‘ছেলের মুক্তির আশায় থাকতে থাকতে আমার বাবা মারা গেছেন। মা শেফালি বেগমও মৃত্যুশয্যায় আছেন। তিনি ছেলেকে একনজর দেখার জন্য আকুতি জানান। কিন্তু শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় তিনি এখন আর কারাগারে যেতে পারেন না। আমার মা যেন মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে একবার দেখে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করুন। কে শুনবে আমাদের কথা, আর কার কাছে যাব? সরকার যেন আমার ভাইয়ের প্রতি সহানুভূতি দেখান। তাঁকে মুক্তি দেন। আমাদের আর কিছু চাওয়ার নেই।’

তাজমহল দেখতে ২০০৮ সালের ১৩ জুলাইয়ে ভারত গিয়েছিলেন বাদল ফরাজি। ওই বছরের ৬ মে দিল্লির অমর কলোনিতে এক বৃদ্ধা খুন হন। বিভিন্ন সময় ভারতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বলছে, বেনাপোল সীমান্ত পার হতেই বাদল ফরাজিকে বাদল সিং ভেবে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০০৮ সালের ২১ জুলাই তিনি আটক হন। ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট বাদল ফরাজিকে দিল্লির আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। রায়ের বিরুদ্ধে দিল্লির হাইকোর্টে আপিল করা হয়। সেখানেও নিম্ন আদালতের রায় বহাল থাকে। বাদলের জীবন কাটছিল দিল্লির তিহার কারাগারে। সেখানে তিনি মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পাস করেন।

একপর্যায়ে বন্দীদের কাউন্সেলিং করতে যাওয়া মানবাধিকারকর্মী রাহুল কাপুরের সঙ্গে কথা হয় বাদল ফরাজির। শুরু হয় ‘জাস্টিস ফর বাদল’ শীর্ষক একটি স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি। রাহুল ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে যোগাযোগ করেন। সরকারের চেষ্টার পর ২০১৮ সালের জুলাইয়ে ভারত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।

২০২২ সালের ২০ জুলাই বাদল ফরাজির ১৪ বছর সাজা পূর্ণ হয়েছে। ভারতের আদালতের দেওয়া আদেশ মেনে যাবজ্জীবন কারাভোগের পরই ২০ জুলাই তাঁর মুক্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু মুক্তির চার বছর পেরোলেও আইনি জটিলতায় তিনি এখনো কারাগারে রয়েছেন।

বাদলের এ ঘটনা নিয়ে ‘বাদলের কারাবাস’ নামে একটি বই লিখেছেন লেখক রাহিতুল ইসলাম। মানববন্ধনে তিনি বলেন, ‘শুধু নামের মিল থাকায় একজন মানুষ ১৮ বছর ধরে কারাগারে বন্দী রয়েছেন। এর চেয়ে বড় অমানবিকতা আর কিছু হতে পারে না। সরকারের কাছে জানতে চাই, বাদল ফরাজির মুক্তি কবে? আইনি জটিলতা থাকলে সেটা আগামী সাত দিনের মধ্যে দূর করুন। এ সময়ে সরকার মুক্তির সিদ্ধান্ত না নিলে আমরা আবার রাস্তায় নামব।’

প্রচেষ্টা ফাউন্ডেশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা পাভেল বাবু বলেন, ‘একটাই প্রশ্ন—বাদলের মুক্তি কবে? আমরা যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে তিনিই বাদল সিং। তারপরও তো তিনি সাজা শেষ করে ফেলেছেন। এখনো কেন তাঁকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। এটা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।’

সাত দিনের আলটিমেটাম দিয়ে পাভেল বাবু বলেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে সরকারকে মুক্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট করে জানাতে হবে। যদি এই বিষয়ে কোনো সুবিচার না পাই, তাহলে আবার রাস্তায় নামতে বাধ্য হব। কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করব।