গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণে এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ
গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণে এক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ

জুলাই সনদে এমন কিছু বলা হয়নি, যেগুলো নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করবে: আলী রীয়াজ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদে এমন কিছু বলা হয়নি, যেগুলো বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকারকে কোনোভাবে সংকুচিত করবে। জুলাই জাতীয় সনদ কালো কালিতে ছাপা, কিন্তু এর প্রতিটি অক্ষর রক্ত দিয়ে লেখা। জুলাই জাতীয় সনদে আছে বাংলাদেশে এক ব্যক্তির শাসন ফিরে না আসার অঙ্গীকার।

গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে সরকারি–বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। আজ মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে এ সভা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে এ সভা আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে কোটা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু কোটাই একমাত্র সমস্যা ছিল না। আরেকটি সমস্যা ছিল পাবলিক সার্ভিস কমিশন যেভাবে গঠিত হয়েছে, তার কাঠামোগত সমস্যা এবং এটার রাজনীতিকরণ।...বিগত আমলে এইচ টি ইমাম সুস্পষ্ট করে বলেছিলেন যে তোমরা পরীক্ষা দাও, বাদবাকিটা আমরা দেখব ছাত্রলীগে ছেলেদেরকে। এমনকি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসের পরে কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, সরকারি কর্মচারী যারা পিএসসিতে আবেদন করেছিলেন, তাঁদের আবেদনপত্রে তাঁরা স্বেচ্ছায় নিজেরা লিখে দিয়েছেন তিনি ছাত্রলীগের কোন পদে ছিলেন।’

আলী রীয়াজ বলেন, রাষ্ট্রপতির হাতে দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা, ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা আছে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই আছে। কিন্তু আমাদের দেশে এটার ব্যাপক অপব্যবহার হয়েছে, রাষ্ট্রপতি এমন লোককে ক্ষমা প্রদর্শন করেছেন, যার বিরুদ্ধে শুধু অধস্তন আদালত থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত এবং দণ্ডিত হয়েছেন।

আলী রীয়াজ বলেন, এখন থেকে রাষ্ট্রপতি দণ্ড মওকুফ করতে হলে একটা কমিটির মধ্য দিয়ে যাবে, যেখানে কারা মহাপরিদর্শক থেকে শুরু করে সাইকিয়াট্রিস্ট পর্যন্ত থাকবেন। তাঁরা যদি মনে করেন যে এই ব্যক্তিটি মানবিক কারণে, বয়সের কারণে, ভূমিকার কারণে, যেকোনো বিবেচনার থেকে দণ্ড মওকুফ করা যেতে পারে, তাঁরা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবেন। পাশাপাশি ওই কমিটি ভিকটিমের পরিবারের সম্মতি নেবেন। দণ্ডিত ব্যক্তি যেন অজ্ঞাতে ছাড়া না পায়, সে জন্য তাদের হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হওয়া পরিবারের সম্মতি লাগবে। সব রাজনৈতিক দল এ বিষয়ে একমত হয়েছে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আর কোনো স্বৈরাচার যাতে জাতির ঘাড়ে চেপে বসতে না পারে, জনগণের অধিকার পদদলিত করতে না পারে, কাউকে গুম করতে না পারে, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য ‘জুলাই সনদের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করে আসন্ন গণভোটে হ্যাঁ-কে জয়যুক্ত করতে হবে।

সংবিধান সংশোধনীকে একটা ছেলেখেলায় পরিণত করা হয়েছে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, নিম্নকক্ষে অর্থাৎ বর্তমান জাতীয় সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য উপস্থিত থাকলেই এবং তাদের দল সিদ্ধান্ত নিলেই সংবিধান সংশোধন করা যায়। এ দেশে এমন সংবিধান, এমন সংশোধনীও করা হয়েছে, যার সুবিধাভোগী হয়েছেন একজন ব্যক্তি। সে জন্য জুলাই সনদে বলা হচ্ছে যে সংবিধান সংশোধন করতে হলে জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের পরে উচ্চকক্ষ থাকবে, সেই উচ্চকক্ষের অন্তত ৫১ জন, ১০০ সদস্য বিশিষ্ট উচ্চকক্ষের অন্তত ৫১ জনের সমর্থন লাগবে।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের রুটিন দায়িত্বে নিয়োজিত সহ–উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোট সম্পর্কে নাগরিকদের মধ্যে স্পষ্ট ও ইতিবাচক ধারণা তৈরি করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। তিনি জানান, ইউজিসি পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ক্লাস্টারভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করে সমন্বিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে।

সভাপতির বক্তব্যে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বলেন, জাতীয় প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সব সময় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে ইউজিসি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ।

এ ছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার ও ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খান। সভায় ১৭টি সরকারি ও ৬৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ–উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ডিন, রেজিস্ট্রার, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং জুলাই আন্দোলনে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।