বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, এবারের ঈদযাত্রায় মৃত্যু হয়েছে ১৭০ জন মানুষের। ১৬ থেকে ২৬ মার্চ, অর্থাৎ ১১ দিনের এই হিসাব তুলে ধরে গতকাল রোববার সড়ক, নৌ ও রেল—এই তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, ‘আমরা মনে করছি, যেকোনো সময়ের চেয়ে দেড় কোটি মানুষ নিরাপদে, স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছে।’
যদিও বিআরটিএ দুর্ঘটনায় মৃত্যুর যে হিসাব দিয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংগঠন রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ১৭ থেকে ২৭ মার্চ ভোর (১১ দিন) পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে ২৭৪ জনের। এর বাইরে রেলে ৫ জন ও নৌপথে ১ জন মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে প্রাণহানি ২৮০ জনের।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতিও মৃত্যুর হিসাব রাখে। তাদের হিসাবে, এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৩ জন মারা গেছেন (১৪ থেকে ২৭ মার্চ)।
আমরা মনে করছি, যেকোনো সময়ের চেয়ে দেড় কোটি মানুষ নিরাপদে, স্বস্তিতে বাড়ি ফিরতে সক্ষম হয়েছেসড়ক, নৌ ও রেলমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ ও সড়কে নিরাপত্তা জোরদারসহ ৭ দফা কার্যপত্র নিয়ে গতকাল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে মন্ত্রণালয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের কাছে ঈদযাত্রায় এবার ৩০০ মৃত্যুর খবর সঠিক নয় বলে দাবি করেন মন্ত্রী রবিউল আলম। এবার সব মিলিয়ে ঈদযাত্রায় ১৭০ জনের প্রাণহানি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে ৪৭ জন, নৌপথে ২৮ জন আর ১৭ জন সম্ভবত রেলপথে। বাকিগুলো এলজিআরডি সড়ক বা অন্যান্য দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন।’
কোনো মৃত্যুই কাম্য নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি—এ কথা বলা ঠিক হবে না, নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, আগের চেয়ে কম হয়েছে, আগামী দিনে আমরা আরও কম করব।’
অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে দেড় মাসের কম সময় আগে। এ সময়ে সড়কে বিশৃঙ্খলা দূর করা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নিশ্চিত করা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কাজ এখনো জোরালোভাবে শুরু হয়নি।
হিসাবে তারতম্য কেন, তা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল বিআরটিএ ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনকে। বিআরটিএ বলছে, তারা নিজেদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও গণমাধ্যম থেকে তথ্য নেওয়া হয়। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নানাভাবে সংগৃহীত তথ্য পুলিশ, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
বিআরটিএর সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মৃত্যুর তথ্যের গরমিল অতীতেও ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা ওবায়দুল কাদের একাধিকবার তাঁর আমলের ঈদযাত্রাকে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে স্বস্তির বলে দাবি করেছিলেন। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া প্রাণহানির হিসাব সঠিক নয় বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।
হিসাবে তারতম্য কেন, তা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল বিআরটিএ ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনকে। বিআরটিএ বলছে, তারা নিজেদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও গণমাধ্যম থেকে তথ্য নেওয়া হয়। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নানাভাবে সংগৃহীত তথ্য পুলিশ, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের তথ্য ঠিক আছে। বেসরকারি সংস্থার তথ্য সঠিক কি না, সেটা দেখার ব্যাপার আছে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় হতাহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেন তাঁরা। এ জন্য ভালোভাবে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
হিসাবে তারতম্য কেন, তা নিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল বিআরটিএ ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনকে। বিআরটিএ বলছে, তারা নিজেদের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও গণমাধ্যম থেকে তথ্য নেওয়া হয়। কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। নানাভাবে সংগৃহীত তথ্য পুলিশ, হাসপাতাল ও গণমাধ্যমের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
অবশ্য গত অক্টোবরে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন বলছে, ব্যবস্থা চালুর পর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশের পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ ব্যক্তি। অথচ ক্ষতিপূরণের তহবিলে আড়াই শ কোটি টাকার বেশি জমা আছে। মানুষ জানে না বলেই আবেদন কম আসে।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, তারা ২৫টির বেশি জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের তথ্য সংকলন করে প্রতিবেদন তৈরি করে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিআরটিএ তাদের তথ্য আমাদের দিক। আমরা আমাদের তথ্য তাদের দিই। মিলিয়ে দেখি, কমবেশি হলো কেন?’ তিনি বলেন, বাসের ফিটনেস নেই, চালকের লাইসেন্স নেই—এসব তো কাঠামোগত হত্যা। এর জন্য অনেকাংশে দায়ী বিআরটিএ। কিন্তু বিআরটিএর কারও কোনো শাস্তি হয়েছে?
২০২৪ সালের এপ্রিলে একটি বাস মোটরসাইকেলে ধাক্কা দিলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। সেই বাস ছিল ৪৩ বছরের পুরোনো এবং ফিটনেস সনদ ছিল না। সেই ঘটনা উল্লেখ করে সাইদুর রহমান বলেন, এত পুরোনো বাস কীভাবে রাস্তায় নামল। বিআরটিএর কারও কোনো শাস্তি হয়েছে?
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে সড়কমন্ত্রী রবিউল আলম জানান, তাঁদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যাত্রীবাহী যেকোনো বাস শতভাগ যাত্রী নামিয়ে তবেই ফেরিতে উঠবে। তিনি আরও বলেন, ‘ওখানে একটা ব্যারিয়ারের (প্রতিবন্ধক) কথা বলা হয়েছে, ব্যারিয়ার থাকবে। যদিও একটু কৌশলগত সমস্যা আছে, তারপরও আমরা ব্যারিয়ার রাখব।’
ভবিষ্যতে সব গণপরিবহনে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হবে বলে জানান রবিউল আলম। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে যানবাহনের গতিনিয়ন্ত্রণ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল সহজে শনাক্ত করা যাবে। ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সড়ক ও রেল মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, সড়কসচিব মো. জিয়াউল হক, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।