ঘণ্টায় ৪৪ লাখ কাপ চায়ে চুমুক 

সকালের নাশতার পর এক কাপ চা দিয়ে দিন শুরু করেন অনেকেই। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চায়ের তৃষ্ণাও যেন বাড়তে থাকে। অফিসের ব্যস্ততা, বিরতিতে, কাজের ফাঁকে টংদোকানে, ক্লান্তি কাটাতে কিংবা আড্ডা–আতিথেয়তায় নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে চা। সরকারি ও বেসরকারি হিসাব বলছে, বাংলাদেশে প্রতি ঘণ্টায় অন্তত ৪৪ লাখ কাপ চায়ে চুমুক পড়ে।

চা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মূলত দুই ধরনের চা বেশি জনপ্রিয়। লিকার চা ও দুধ–চিনি মিশিয়ে তৈরি দুধ–চা। চা পানের অভ্যাসে খুব বড় পরিবর্তন না এলেও বদল এসেছে ধরনে। স্বাস্থ্যসচেতনতার কারণে লিকার চায়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। পাশাপাশি গ্রিন টি, মসলা চা–সহ নানা ধরনের বৈচিত্র্যময় চায়ের ব্যবহারও বাড়ছে। এতে চা–পাতার ব্যবহার খুব বেশি না বাড়লেও কাপে কাপে চায়ের সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড ও চা ব্যবসায়ীদের সংগঠন টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টিটিএবি) হিসাব অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে গড়ে প্রতিবছর ৯ কোটি ৫৭ লাখ কেজি চা ব্যবহৃত হয়েছে। উৎপাদন ও আমদানির সঙ্গে রপ্তানি সমন্বয় করে এই হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই চা পানীয় হিসেবে কত কাপে পরিণত হয়, তা নির্ভর করে ব্যবহৃত চা–পাতার পরিমাণের ওপর। সাধারণত লিকার চায়ে সর্বোচ্চ দুই গ্রাম চা–পাতা ব্যবহৃত হয়। বাজারে বিক্রি হওয়া একটি টি ব্যাগেও প্রায় দুই গ্রাম চা থাকে। তবে দুধ–চিনি মিশিয়ে গাঢ় চা তৈরি করতে তুলনামূলক বেশি চা–পাতা লাগে।

চা ব্যবসায়ীদের সংগঠন টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহ মঈনুদ্দীন হাসান প্রথম আলোকে বলেন, লিকার চায়ের জন্য দুই গ্রাম চা–পাতাই আদর্শ। তবে যাঁরা দুধ–চিনি মিশিয়ে চা পান করতে অভ্যস্ত, তাঁদের জন্য তিন গ্রামের বেশি চা–পাতা দরকার হয়। 

চা ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কাপে গড়ে আড়াই গ্রাম চা–পাতা ব্যবহার করা হয়। এই হিসাবে গত বছর দেশে প্রায় ৩ হাজার ৮২৭ কোটি কাপ চা পান করা হয়েছে; যা ঘণ্টায় দাঁড়ায় ৪৪ লাখ কাপ চা।

চা পানের এই সংস্কৃতি এখন বিশাল অর্থনীতিও তৈরি করেছে। যেমন গত ২৫–২৬ মৌসুমে (এপ্রিল–মার্চ) নিলামে বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ২২৫ কোটি টাকার চা। এ থেকে সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে ৩৮৯ কোটি টাকা। এই চা–পাতা খুচরায় যখন বিক্রি হচ্ছে, তখন বাজারের আকার আরও বেড়ে চার হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াচ্ছে। পানীয় হিসেবে বিক্রির পর্যায়ে এই বাজারের আকার কয়েক গুণ বেড়ে যায়। 

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, প্রতি কাপ চায়ের গড় দাম যদি ১০ টাকা হয়, তাহলে ৩ হাজার ৮২৭ কোটি কাপ চায়ের বাজারের আকার দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থনীতির বড় অংশ গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র টংদোকান ও খুচরা চা বিক্রেতাদের ঘিরে।

চায়ের এই অর্থনীতি শুরু হয় বাগানমালিকদের হাত ধরে। চা–পাতা উৎপাদন করে নিলামে বিক্রি করেন তাঁরা। নিলাম থেকে সেই চা–পাতা কিনে বাজারজাত করেন চা ব্যবসায়ীরা। বাজারজাতের আগেই ঘটে নানা কৌশলের কাজ। বাজারে শীর্ষে থাকা ইস্পাহানি, আবুল খায়ের বা এমজিআইয়ের মতো গ্রুপগুলোর টি টেস্টাররা বিভিন্ন বাগানের চা মিশিয়ে আলাদা স্বাদ তৈরি করেন। অনেক ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি চা মিশিয়েও নতুন স্বাদের চা তৈরি করা হয়। স্বাদের ধারাবাহিকতা ভোক্তাকে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের প্রতি ঝোঁক বাড়ায়। 

চায়ের অর্থনীতিতে যুক্ত হতে বসে নেই অন্যরাও। প্রচলিত কালো চা বা সবুজ চায়ের বাইরে ছোট্ট হলেও বিস্তৃত হচ্ছে হোয়াইট টি, ওলোং টি, সাত রং চা, মসলা চা, তুলসী চা—হরেক রকম নামে। স্বাদের পাশাপাশি গুণগত মানেও রয়েছে পার্থক্য।

লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল টি কমিটি (আইটিসি) প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক বুলেটিনে তথ্য দিয়েছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু চা–পাতার ব্যবহার ৫৩০ গ্রাম। তাতে একজন মানুষ বছরে ২১২ কাপ চা পান করেন। ২০২৩ সালের এ তথ্য এখনো হালনাগাদ করেনি সংস্থাটি। হালনাগাদ তথ্যে মাথাপিছু চা পানের হার বাড়তে পারে। চা বোর্ডের হিসাবে, দেশে প্রতিবছর গড়ে চায়ের চাহিদা বাড়ছে সোয়া ৫ শতাংশ হারে।

চা পানের হার দ্রুত বাড়লেও মাথাপিছু চা পানের হারে এখনো শীর্ষ দেশগুলোর অনেক পেছনে বাংলাদেশ। তালিকায় কততম? তার আগে শীর্ষ দেশগুলোর কথা জানা যাক। মাথাপিছু চা পানের হারে শীর্ষ দেশটি তুরস্ক। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে যথাক্রমে লিবিয়া ও হংকং। আইটিসির তথ্য অনুযায়ী, এ তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম।

চা পানে পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ কিন্তু এগোচ্ছে। এক দশক আগের তথ্য দেখা যাক। সে সময় চা পানে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৮তম। এক দশকে বিশ্বে তিন ধাপ এগিয়েছে। শুধু চা ঘিরেই বৈশ্বিক ক্রমতালিকায় বেশ কয়েকটিতে শীর্ষ দশ–বিশের তালিকায় এনেছে বাংলাদেশকে। যেমন আইটিসির তথ্যে চা উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে অষ্টম। মোট চা ব্যবহারের পরিমাণেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের বড় দেশগুলোর একটি।

একসময় ব্রিটিশদের অভিজাত পানীয় হিসেবে পরিচিত চা এখন বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। টংদোকান থেকে করপোরেট অফিস—দিনে দিনে বাড়ছে চায়ের কাপে চুমুক। সেই সঙ্গে বিস্তৃত হচ্ছে চায়ের অর্থনীতিও।