বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত সব ধরনের টিকা কেনায় বিলম্ব ঘটিয়েছে। সম্প্রতি হাম-রুবেলার টিকা পেয়েছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। ইপিআই কর্মকর্তারা বলেছেন, হাম-রুবেলার জাতীয় ক্যাম্পেইনের টিকা হাতে এসেছে, সিরিঞ্জ আসেনি। দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন শুরু করতে দেড়-দুই মাস সময় লেগে যাবে।
শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া নিশ্চিত না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দাতা সংস্থা সময় ব্যয় করেছে টিকা কেনার প্রক্রিয়া কী হবে, তা ঠিক করতে, সরকার সরাসরি টিকা কিনবে নাকি ইউনিসেফের সহায়তা নেবে, আর্থিক লাভ–লোকসান কী হবে—এসব নিয়ে। এতে টিকার মজুত ফুরিয়েছে। জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় পেছাতে হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা কিনতে এটা আসলে গাফিলতি।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ—এই ছয় জেলায় হাম বেশি ছড়িয়েছে। ইতিমধ্যে সাত শর বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে পঞ্চাশের বেশি। অন্যদিকে ইপিআই কার্যালয় থেকে জানা গেছে, হামের পাশাপাশি অন্তত ২১ জন রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা ঝুঁকির কথা আগেই বলে আসছিলেন। কর্তৃপক্ষ কথা কানে নেয়নি, গাফিলতি দেখিয়েছে।মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন বিলম্ব না করে সরকারের ত্বরিত কর্মসূচি হাতে নেওয়া উচিত। গুরুত্ব না দিলে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। একজন রোগী ১৬ থেকে ১৮ জনের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে।
দেশে হামের টিকা শিশুদের সাধারণত দুইভাবে দেওয়া হয়। দেশের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে নিয়মিত এই টিকা দেওয়া হয়। গ্রামাঞ্চলে সরকারের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা এই টিকা দেন। সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য শহর এলাকায় এই টিকা দেন সিটি করপোরেশনের টিকা কর্মীরা (ভ্যাকসিনেটর) এবং এনজিও কর্মীরা।
এর বাইরে কয়েক বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশব্যাপী কয়েক দিনের মধ্যে সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। নিয়মিত কর্মসূচিতে ৯ মাস বয়সী শিশুকে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সী শিশুকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস বয়স থেকে শুরু করে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। দেশে সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে।
টিকার সার্বিক বিষয় জানার জন্য এই প্রতিবেদক গতকাল মঙ্গলবার বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান, সাবেক স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর, ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদসহ আরও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘের একাধিক অঙ্গসংস্থার কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেন। কেউ কেউ কথা বলেননি। কেউ কেউ নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
কেন টিকা কেনায় বিলম্ব
দেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় কর্মসূচি ছিল স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি)। দাতা সংস্থার সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। এটি ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে বেশি পরিচিত। এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো অপারেশন প্ল্যান বা ওপির মাধ্যমে। চতুর্থ কর্মসূচি (২০১৭-২২) শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। পরে সেই কর্মসূচি টেনে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনা হয়। এই উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব খাতের কর্মকাণ্ডও ছিল।
সেক্টর প্রোগ্রামের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য অপারেশন প্ল্যানের আওতায় ইপিআই পরিচালিত হতো। গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনত ইপিআই। কোভিডের সময়ও তাই হয়েছে। টিকা কেনায় সময় ও জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
২০১৭ সালের দিকে চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার আগেই একটি আলোচনা ছিল, বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে, দাতানির্ভরতা কমছে। তাই সেক্টর প্রোগ্রামের আর দরকার নেই। ধীরে ধীরে বের হয়ে আসতে হবে। সবকিছু রাজস্ব খাতে চলে আসবে। যদিও সেই আলোচনা এগোয়নি। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রামের বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যান তৈরির কাজ শুরু হয়।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কয়েকটি সভা শেষে ২০২৫ সালের ৬ মার্চ অনুষ্ঠিত সভায় সেক্টর প্রোগ্রাম চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়। ওপির মাধ্যমে টিকা কেনার ব্যবস্থা বাতিল হয়। মন্ত্রণালয় একবার সিদ্ধান্ত নেয় ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে টিকা কিনবে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয় নানা প্রশ্ন তোলে। মন্ত্রণালয় আবার টিকা কেনায় ইউনিসেফকে যুক্ত করে। এসব করতে গিয়ে কয়েক মাস সময় চলে যায়।
একজন কর্মকর্তা বলেছেন, একবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে জানানো হয় ইউনিসেফকে সাড়ে ১৭ শতাংশ (১২ শতাংশ পরিবহন ও সাড়ে ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ) চার্জ দিয়ে টিকা কিনতে হয়। মন্ত্রণালয় নিজে কিনলে অর্থের সাশ্রয় হবে। মন্ত্রণালয় কেনার উদ্যোগ নিলে অর্থ মন্ত্রণালয় আপত্তি দিয়ে বলে, এ বিষয়ে অনুমোদন লাগবে। এই অনুমোদন চূড়ান্ত হওয়ার আগেই মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় জানায়, ২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরের কিছু আর্থিক বিষয়ের নিষ্পত্তি হয়নি। এরপর আবার সিদ্ধান্ত হয় ইউনিসেফের মাধ্যমেই টিকা কেনা হবে। এ ধরনের জটিলতা চলেছে অনেক দিন ধরে।
এখন আবার দেখা যাচ্ছে, প্রস্তুতিরও ঘাটতি আছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, জাতীয় ক্যাম্পেইন হবে এপ্রিল মাসে। এখন সেটি পেছাচ্ছে।
এসব বিষয়ে জানতে গতকাল সকালে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি কোনো মতামত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ‘গণমাধ্যমগুলো সঠিক তথ্য তুলে ধরছে না। আমার বা বিশেষ সহকারীর সঙ্গে কথা বলে রিপোর্ট করা উচিত ছিল।’
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান কোনো কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। ওই সময় দায়িত্বে থাকা সাবেক স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমরা টিকার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছি। সময় নষ্টের কোনো কারণ নেই।’
টিকা আছে, সিরিঞ্জ নেই
কোন টিকা আছে, কোন টিকা নেই, তা নিয়ে কিছু অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। গত রোববার ইপিআই থেকে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, হামসহ শিশুদের ১০টি রোগ প্রতিরোধ করে, এমন টিকার মজুত ইপিআইয়ের কাছে নেই। এই টিকাগুলো হচ্ছে—বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি।
গতকাল ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ প্রথম আলোকে বলেন, ক্যাম্পেইনে দেওয়ার মতো হামের টিকা আছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু করতে বিলম্ব হলেও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা দেশে আসছে। ক্যাম্পেইন করার করার মতো দুই কোটি টিকা দেশে আছে।
গত পরশু টিকাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) সভা হয়েছে। নাইট্যাগের একজন সদস্য প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, জুনের মধ্যে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৫৮ জেলায় ৬ মাস বয়স থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে এবং বাকি ৬টি জেলায় ৬ মাস বয়স থেকে ১০ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এই ছয় জেলায় টিকাদান হার কম। জেলাগুলো হলো—ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, পটুয়াখালী ও বাগেরহাট।
হাতে টিকা থাকলে ক্যাম্পেইন শুরু করতে এত বিলম্ব হবে কেন—এই প্রশ্নের উত্তরে ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, টিকার সিরিঞ্জ ও লজিস্টিকের আর্থিক সহায়তা দেয় গ্যাভি। সেই টাকা এখনো পাওয়া যায়নি। মে মাসে ৭২ লাখ সিরিঞ্জ, জুন মাসে ৮০ লাখ সিরিঞ্জ ও জুলাই মাসে ৫৬ লাখ সিরিঞ্জ কেনা হবে। তবে দ্রুত সিরিঞ্জ কেনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সহায়তা চেয়ে গ্যাভিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এই সরকারি কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় ক্যাম্পেইনের আগে আন্তমন্ত্রণালয় সভা, প্রচার-প্রচারণাসহ বেশ কিছু কাজ আছে। এ ছাড়া এসএসসি পরীক্ষাও সামনে। সব দিক বিবেচনা করে চূড়ান্ত তারিখ ঠিক করা হবে।
ঝুঁকি বাড়ছে
গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মার্চ মাসে সারা দেশে হামে ৫৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কারণ বা কেন হাম ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশে হামের টিকার বাইরে থাকা শিশুর সংখ্যা অনেক।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, জনস্বাস্থ্যবিদেরা ঝুঁকির কথা আগেই বলে আসছিলেন। কর্তৃপক্ষ কথা কানে নেয়নি, গাফিলতি দেখিয়েছে। তিনি আরও বলেন, যারা আক্রান্ত হয়েছে, যাদের অবস্থা জটিল, তাদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। এবং কনটাক্ট ট্রেসিং করতে হবে, নতুন রোগী খুঁজে বের করতে হবে, পাশাপাশি যারা আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাঁদের আলাদা করার ব্যবস্থা করতে হবে, চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সংক্রমণ বাড়তে পারে।