
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। বনটি যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা, তেমনি ভয়ানকও বটে। চারপাশে ঘন গাছপালা, কাদামাটি আর অদ্ভুত নীরবতা। কোথাও বাঘের ভয়, কোথাও কুমিরের। পায়ের নিচে চোরাবালির ফাঁদ, মাথার ওপরে মৌমাছির ঝাঁক। তারপরও এখানে থেমে থাকে না জীবন। কারণ, এই বনেই লুকিয়ে আছে কিছু মানুষের জীবন ও জীবিকার গল্প। এই বনই তাঁদের বেঁচে থাকার ভরসা।
সুন্দরবনের মৌয়ালদের জীবন এমনই কঠিন বাস্তবতার গল্প বলে। প্রতিবার মধু সংগ্রহে গিয়ে টানা ১৪ দিন পর্যন্ত নৌকায় কাটাতে হয় তাঁদের। নদী-খাল পেরিয়ে গহিন বনে প্রবেশ করে খুঁজে বের করতে হয় মৌচাক। তারপর জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সংগ্রহ করতে হয় মধু। কিন্তু ভয়কে সঙ্গী করেই এসব মানুষ বারবার ফিরে যান সুন্দরবনের গভীরে, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।
এই সব সাহসী মানুষের জীবনসংগ্রাম, ভয়, ভালোবাসা আর টিকে থাকার গল্প নিয়েই বিকাশের উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র ‘সাহসেই বিকাশ’। এ বছর সুন্দরবন দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের এই প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে এমন এক জীবন, যাকে দূর থেকে যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন।
তবে একসময় মৌয়ালদের জীবন ছিল আরও কঠিন। দীর্ঘদিন সুন্দরবনে থাকলে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত তাঁদের। এক সপ্তাহ থেকে কখনো ১৫ দিন পর্যন্তও পরিবার থেকে দূরে থাকতে হতো তাঁদের। মনে কাজ করত অজানা দুশ্চিন্তা—বাড়িতে কী হচ্ছে, কোনো বিপদ হলো কি না, সন্তানেরা কেমন আছে।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন গভীর বনেও নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। সেই সুযোগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন মৌয়ালেরা। মৌয়াল সুজায়েত হোসেন মালিক বলেন, ‘এখন আমি যখন সুন্দরবনে যাই, তখন সঙ্গে মুঠোফোন থাকে। পরিবারের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ করতে পারি। একসময় তো এক সপ্তাহ থেকে ১৫ দিন পরিবারের কারও সঙ্গে কথা বলতে পারতাম না। প্রতিমুহূর্তে দুশ্চিন্তা কাজ করত। সব সময় দুশ্চিন্তা কাজ করত—বাড়িতে সব ঠিক আছে কি না, কোনো বিপদ–আপদ হলো কি না।’
সুজায়েত হোসেন মালিক আরও বলেন, ‘নির্দিষ্ট কিছু জায়গা আছে যেখানে মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়। তাই ভিডিও কলেও কথা বলতে পারি। আগে টাকাপয়সা সঙ্গে নিয়ে চলাফেরা করতে ভয় লাগত। পথে হারিয়ে যাওয়ার ভয় ছিল, ছিনতাইয়ের শঙ্কাও ছিল সব সময়। এখন সে ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে। মধু বিক্রির টাকা নিরাপদে বিকাশে রাখা যায়, প্রয়োজন হলে দেশের যেকোনো প্রান্তে পাঠানোও যায় সহজেই।’
এই ছোট্ট প্রযুক্তিগত সুবিধাই মৌয়ালদের জীবনে এনে দিয়েছে বড় এক স্বস্তি। কারণ, সুন্দরবনের মতো দুর্গম এলাকায় জীবন শুধু প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই নয়, প্রতিদিনের অনিশ্চয়তার সঙ্গেও যুদ্ধ। পরিবার থেকে দূরে থেকেও এখন তাঁরা যেকোনো প্রয়োজনে পাশে থাকতে পারছেন। কষ্ট করে উপার্জন করা অর্থও নিরাপদে সংরক্ষণ করতে পারছেন সহজেই।
প্রামাণ্যচিত্রটিতে শুধু মৌয়ালদের জীবনসংগ্রামই নয়, তাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক, পরিবারকে ঘিরে স্বপ্ন আর ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষাও উঠে এসেছে। ভয় আর ঝুঁকির মধ্যেও এসব মানুষের ভেতরে যে গভীর বন্ধন ও বেঁচে থাকার তাগিদ কাজ করে, সেটিই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন নির্মাতা।
প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা তানভীর আহসান বলেন, দূর থেকে মৌয়ালদের জীবন যতটা কঠিন দেখা যায়, বাস্তবে তা আরও অনেক কঠিন। তাই কোনো সাজানো দৃশ্য নয়, বরং তাঁদের বাস্তব জীবনকেই ক্যামেরাবন্দী করার চেষ্টা করা হয়েছে। মৌচাক খোঁজা, নদীপথে যাত্রা, নৌকায় কাটানো দীর্ঘ সময় কিংবা পরিবারের সঙ্গে কথা বলার ছোট ছোট মুহূর্তসহ সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে এতে।
প্রামাণ্যচিত্রটির পৃষ্ঠপোষক বিকাশের হেড অব ডিজিটাল অ্যাসেটস অ্যান্ড কমিউনিকেশন্স ইশতিয়াক শাহরিয়ার বলেন, ‘এই ফিল্মে আমরা মূলত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি সুন্দরবনের মৌয়ালদের কঠিন জীবনসংগ্রাম। প্রতিনিয়ত ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও তাঁরা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন, সে বাস্তবতাই ফুটে উঠেছে এ গল্পে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের কারণে আজ এসব মানুষ বন-জঙ্গলের দূরবর্তী এলাকায় থেকেও পরিবারের প্রয়োজনের মুহূর্তে পাশে থাকতে পারছেন। সহজ ও নিরাপদ লেনদেনের সুবিধা তাঁদের কঠিন জীবনে এনে দিয়েছে একধরনের স্বস্তি ও নির্ভরতা।’
ইশতিয়াক শাহরিয়ার আরও বলেন, ‘আমাদের উদ্দেশ্য ছিল মৌয়ালদের জীবন কতটা চ্যালেঞ্জিং ও অ্যাডভেঞ্চারপূর্ণ, তা দর্শকের সামনে তুলে ধরা। একই সঙ্গে দেখানো যে প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে তাঁরা নিরাপদে ও সহজভাবে আর্থিক লেনদেন করতে পারছেন। বিকাশ এই সুযোগ শুধু মৌয়ালদের জন্য নয়, দেশের সব মানুষের জন্যই নিশ্চিত করছে।’
মৌয়ালদের জীবনের গল্প নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রটি দেখা যাবে #আমার বিকাশ’ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম পেজ ও ইউটিউব লিংকে।