সাংবাদিক মার্ক টালি
সাংবাদিক মার্ক টালি

মার্ক টালির সাক্ষাৎকার (পুনঃ প্রকাশ)

বিলেতি সাংবাদিকের উপমহাদেশীয় কণ্ঠ

উপমহাদেশের রেডিও-শ্রোতাদের কাছে একসময় বিবিসি আর মার্ক টালির নাম ছিল একাকার। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে সংবাদকর্মী হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন এক বিশ্বস্ত কণ্ঠ। মার্ক টালি এ অঞ্চলের সাম্প্রতিক ইতিহাসের নিবিড় পর্যবেক্ষক ও ভাষ্যকার। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আমন্ত্রণে তিনি বাংলাদেশে এলে তাঁর এ সাক্ষাত্কার নেন সাজ্জাদ শরিফ। ২০০৭ সালের ১৩ জুলাই প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল। রোববার নয়াদিল্লির একটি হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে মারা গেছেন বাংলাদেশের একাত্তরের বন্ধু মার্ক টালি। তাঁর মৃত্যুতে সাক্ষাৎকারটি পুনরায় প্রকাশ করা হলো।

প্রশ্ন

আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা ব্যক্তি মার্ক টালিকে দিয়ে শুরু করি। শুনেছি, আপনাদের পরিবারের পাঁচ প্রজন্মের ভাগ্য কোনো না কোনোভাবে এই বৃহত্তর ভারতবর্ষের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল। কাকতালীয়র পক্ষেও কি এটি বড় বেশি বাড়াবাড়ি নয়?

মার্ক টালি: মানুষ আজকাল ভাবতে ভালোবাসে যে তাদের যা কিছু অর্জন তার পেছনে আছে শুধু তাদের নিজেদেরই উদ্যম। আমার বিশ্বাস, আমাদের জীবনের বড় একটা অংশই তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। আমি যে কলকাতায় জন্মেছি, এর এক গভীর তাত্পর্য আছে। অতীতে যে আমার দাদা, তাঁর বাবা, এমনকি তাঁরও বাবা পৃথিবীর এ অংশের সঙ্গে নিজেদের জীবন জড়িয়েছিলেন, এরও একটি তাত্পর্য আছে। সত্যিই আমার আগের পাঁচ প্রজন্ম এই ভূখণ্ডে জীবন যাপন করেছেন। আমি মনে করি, এটি নেহাত কোনো কাকতাল নয়। আপনি ঠিকই বলেছেন, এ ঘটনা কাকতালের চেয়েও অনেক বেশি বড়। একে আমি বলতে চাই প্রাকৃতিক।

প্রশ্ন

আপনার প্রথম প্রজন্ম ভারতবর্ষে এসেছিলেন কীভাবে?

টালি: একেবারে প্রথমজনের কথা আমি খুব ভালো বলতে পারব না। তবে আমার দাদার বাবা এখানে এসেছিলেন একজন আফিম প্রতিনিধি হিসেবে। এ অঞ্চলের সঙ্গে সেকালে বিপুল আফিম-বাণিজ্যের যোগ ছিল। এখানকার লোকেরা যাতে ঠিকঠাকমতো পপি বা আফিম চাষ করে, আমার দাদার বাবার দায়িত্ব ছিল সেটি তদারক করা। সে পপি যাতে গাজীপুরের আফিম কারখানায় যথাযথভাবে পৌঁছায়, সেটাও তিনি দেখতেন। তাঁর মেয়ে-জামাই বাণিজ্য করতেন উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে, পরে চলে আসেন কলকাতায়। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর তিনি প্রশাসক হিসেবে কাজ শুরু করেন। আমার নানা ছিলেন এ অঞ্চলে পাটের ব্যবসায়ী। সে কারণে আমার মায়ের জন্ম হয় আখাউড়ায়। আমার বাবা সে অর্থে কখনো ঠিক ভারতবর্ষে ছিলেন না, তবে তিনিও ব্যবসায়ী ছিলেন। আমার ছেলেও ব্যবসা করে। আমিই যে কেন সাংবাদিকতায় চলে এলাম, সে রহস্য আমার কাছেও অজানা।

প্রশ্ন

আপনার নানার ব্যবসা ছিল পূর্ববঙ্গে, মা জন্মেছিলেন আখাউড়ায়। তাঁরা এমন একটা সময় এখানে বসবাস করেছেন, যা এখন ইতিহাসের বিষয়। তাঁদের কাছে শোনা এ অঞ্চলের কোনো স্মৃতি কি আপনার মনে আছে?

মার্ক টালি

টালি: আমার নানা যখন মারা যান, আমি তখন খুব ছোট। আমার মা অত্যন্ত অল্প বয়সে পড়াশোনার জন্য লন্ডন চলে যান। তাই বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর তেমন কোনো স্মৃতি নেই। তিনি বরং আমার কাছে অনেক সময় জানতে চাইতেন, আখাউড়া জায়গাটা কেমন। তাঁকে সে অঞ্চলের বিশদ বিবরণ দেওয়ার জন্য আমি একবার আখাউড়া ঘুরেও এসেছিলাম। তবে কলকাতায় বিবাহিত জীবনের অজস্র স্মৃতি তাঁর মনে আছে। এখানে একটা মজার কথা বলা দরকার। কলকাতায় কিন্তু আমরা একেবারে সাহেবি কায়দায় জীবন যাপন করতাম।

প্রশ্ন

চাকরি সূত্রে আপনার বাবার সঙ্গে রেলওয়ের একটি সম্পর্ক ছিল। আমরা এ–ও জানি, ট্রেনভ্রমণ আপনার খুবই প্রিয়। এটা কি আপনার বাবার স্মৃতির একধরনের উদ্‌যাপন?

টালি: আমার বাবা যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, সেটি কাজ করত আরও অজস্র কোম্পানির ব্যবস্থাপনা প্রতিনিধি হিসেবে। একপর্যায়ে আমার বাবা সেখানকার হিসাব বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা পদের দায়িত্ব পান। তাঁকে এ–জাতীয় ৬০টি কোম্পানির তদারক করতে হতো। এর মধ্যে ছিল আবাসন, কয়লাখনি, ব্যাংক, বিমা ইত্যাদি বিচিত্র প্রতিষ্ঠান। সেগুলোর একটি ছিল দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে। ট্রেনভ্রমণ আমার কাছে প্রিয় হয়ে ওঠার একটা কারণ অবশ্যই আমার শৈশব স্মৃতি। আরেকটি কারণ হয়তো এই যে আমি এখনো মনে করি, বাষ্পীয় ইঞ্জিন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর যন্ত্র। আমি তো মনে করি, ভ্রমণের জন্য ট্রেনের চেয়ে সুসভ্য যান আর হতেই পারে না। ট্রেন খুব দ্রুত নয়, আবার বেশি মন্থরও নয়। পরিবেশের ওপর এর কোনো বিরূপ প্রভাব নেই। আরেকটি অপূর্ব ব্যাপার হলো, বাংলার তালগাছঘেরা প্রকৃতি উত্তর প্রদেশে যেতে যেতে কীভাবে অন্য এক নিসর্গরূপে পাল্টে যায়—ট্রেনভ্রমণেই কেবল তার স্বাদ নেওয়া সম্ভব। এর তুলনায় উড়োজাহাজ-ভ্রমণ তো একেবারে অভব্য, নীরস আর একঘেয়ে।

প্রশ্ন

আপনার জন্ম কলকাতায় হলেও পড়াশোনার জন্য আপনি যুক্তরাজ্যে চলে যান। প্রথম প্রথম নাকি ওখানে আপনার অসহনীয় লেগেছিল?

টালি: ভারতের সূর্যকরোজ্জ্বল আবহাওয়ায় আমি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি যে বোর্ডিং স্কুলে পড়তাম, তার পরিবেশ ছিল খুবই উদার ও খোলামেলা। আমার জীবন বেশ উন্মুক্ত ছিল। আমি যখন বিলেতে যাই, বসন্ত তখন ফুরিয়ে আসছে। সবকিছু অন্ধকার-অন্ধকার, সূর্যের দেখা মেলে কদাচিৎ। আমাকে সেখানে একটা বোর্ডিং স্কুলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। স্বাধীনতার কোনো বালাই ওখানে ছিল না। খাওয়া ছিল জঘন্য। পুরো অবস্থাটাই ছিল অসহ্য। তবু ওটা তো আমারই দেশ। আমি সব সময় বিশ্বাস করে এসেছি, কোনো মানুষই তার নিজের মূল সংস্কৃতিকে চাপা দিয়ে রাখতে পারে না। আমি বলতে পারি, যেকোনো ভারতীয়র চেয়ে আমি বেশি ভারতীয় কিংবা আমি যতটা না ব্রিটিশ তার চেয়ে বেশি ভারতীয়—তবে সেটা কিন্তু আমার সংস্কৃতিকে খারিজ করে দিয়ে নয়। ব্রিটেন আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।

প্রশ্ন

বিবিসিতে যোগ দিতে আপনি যখন আবার আপনার শৈশবের দেশ ভারতে ফিরে এলেন, তখন আপনার অনুভূতি কেমন হলো? টানা দুই দশক যুক্তরাজ্যে কাটিয়ে এসে ভারতও কি আপনার কাছে একই রকম অসহ্য ঠেকেছিল?

টালি: না, না। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি। আমি হোটেলে উঠে সোজা একেবারে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। বুকভরে নিশ্বাস নেওয়ার সময় কোথাও থেকে একটা রান্নার গন্ধ আমার নাকে এসে ঢোকে। রান্নাটা হচ্ছিল গোবর শুকিয়ে তৈরি করা ঘুঁটে দিয়ে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ঘুঁটে পোড়ার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। ওই গন্ধটা কীভাবে যেন এক ঝটকায় নিমেষের মধ্যে আমার মাথায় শৈশবস্মৃতি ফিরিয়ে নিয়ে এল। সেই মুহূর্তেই আমি উপলব্ধি করলাম, আমার জীবনে ভারতের একটি বিশেষ স্থান আছে। এখানে স্বচ্ছন্দ হয়ে ওঠার জন্য আরও কতগুলো ব্যাপারও অবশ্য ছিল। মানুষের আচরণ ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ। আকাশবাণীর কর্মীরা দ্রুত আমার বন্ধু হয়ে উঠল। আমাকে এখানে ঠিক ঠাঁই গাড়তে হয়নি, আমি এ অঞ্চলের মধ্যে স্রেফ ঢুকে পড়েছিলাম।

প্রশ্ন

কেমব্রিজ শেষ করার পর আপনি পাদরি হতে চেয়েছিলেন। পাছে আপনার জৈবিক তাড়না পাদরিজীবনের শুচিতা নষ্ট করে দেয়, এই শঙ্কায় আপনি সে পথে আর যাননি। আপনার ব্যক্তিজীবনে কি আপনি সব সময় এই টানাপোড়েন অনুভব করেছেন? এখনো তো আপনার ধর্মবিশ্বাস খুব গভীর।

টালি: আমি আগে ভাবতাম খ্রিষ্টধর্মই ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র পথ। অ্যাংলিকান চার্চের প্রতি আমার টান এখনো সুগভীর। তবে ভারতবর্ষে আসার পর ধর্মের বহুত্বে আমার আস্থা আরও প্রগাঢ় হয়েছে। পাদরি হতে না পারার একটা মনোবেদনা এক অর্থে আমার মধ্যে এখনো রয়ে গেছে। পাদরি হতে পারলে আমি খুবই মহৎ একটি দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেতাম।

প্রশ্ন

পাদরি না হয়ে আপনি সাংবাদিকতার পথে চলে এলেন কী করে?

টালি: একেবারেই দুর্ঘটনাক্রমে। প্রথমে আমি যোগ দিয়েছিলাম একটি বেসরকারি সংস্থায়। কিন্তু সেখানে এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যায়, যার প্রতিবাদে আমি চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। এরপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সূত্রে আমি যোগ দিই বিবিসির মানবসম্পদ বিভাগে। বিবিসি দপ্তরের চারপাশে তাকাতে তাকাতে একসময় আমার মনে হতে শুরু করে, আমি তো মানবসম্পদ বিভাগে থাকার লোক নই, আমাকে সাংবাদিক হতে হবে। ভারত আমাকে সাংবাদিক হওয়ার সে সুযোগ এনে দেয়।

প্রশ্ন

আমাদের ইতিহাসের মহত্তম ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আপনি সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিজয় তো তখন প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্ন। আপনার কি মনে হয়েছিল, এ দেশ সত্যিই স্বাধীন হতে যাচ্ছে? আপনার নিজের মনে তখন কী ভাবনা চলছিল?

টালি: ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে আমার বাংলাদেশে ঢোকার সুযোগ ঘটে। আমি দেখলাম, সত্যিই সে এক অসম্ভব পরিস্থিতি। এখন হোক আর ১০ বছর পরে হোক—এ দেশের পক্ষে স্বাধীন না হয়ে আর কোনো উপায়ই নেই। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বন্ধন টিকে থাকার কোনো অবস্থাই অবশিষ্ট নেই। বাঙালি জনগোষ্ঠীর ঐক্য আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। এরপর লড়াই যখন চলতে থাকল এবং ভারত যখন অবশেষে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল, তখন স্পষ্ট হয়ে উঠল যে যুদ্ধ এবার শেষ হতে চলেছে। তবে এ কথাও সত্য, মাত্র দেড় সপ্তাহের সর্বাত্মক যুদ্ধের মাথায় যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী একেবারে ভেঙে পড়ল, তখন আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন

মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেবে বলে তখন আপনার মনে হয়েছিল?

টালি: সেই মুহূর্তেই এই কঠিন বাস্তব চিন্তা আমার মাথায় ভর করেছিল যে ভারতের মতো বিশাল এবং বাংলাদেশের মতো ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্রের সম্পর্ক বড় জটিল হবে। অনেকেরই হয়তো মনে পড়বে, স্বাধীনতার পরপরই ভারতীয় বণিকেরা বাংলাদেশে হুড়মুড় করে ঢুকতে শুরু করে। সেটাই ছিল সংকটের সূচনামুহূর্ত। তবে দুই দেশের সম্পর্ক যত ভালো হওয়ার অবকাশ ছিল, ততটা যে হতে পারল না, এ বড় দুর্ভাগ্যজনক। উভয় পক্ষ সুবিবেচনার পরিচয় দিলে এ সম্পর্ক অনেক উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে তো তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া সম্ভব নয়। কোনো দেশ বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপও নয়। বাংলাদেশের ভারতবিরোধী রাজনীতির কোনো ভবিষ্যৎ আমি দেখি না। ছোট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি ভারতের রাজনৈতিক সহৃদয়তার যে অভাব, আমি বিশ্বাস করি না যে তারও কোনো কণামাত্র ভবিষ্যৎ আছে। এর কারণে উপমহাদেশের উন্নয়ন বিঘ্নিত হবে। এ অঞ্চলের প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক বিনিময়ও সংকুচিত হয়ে আসবে। কাজেই মিলেমিশে এগিয়ে যাওয়ার মতো একটি পরিবেশ চাইলে সবাইকে মিলেই সেটি তৈরি করতে হবে।

প্রশ্ন

আপনার কথায় মনে পড়ছে, সম্প্রতি এক বক্তৃতায় আপনি বলেছেন যে এ উপমহাদেশের আন্তরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক সংকট হচ্ছে দেশভাগের ঐতিহাসিক নিয়তি। কথাটা একটু পরিষ্কার করবেন?

টালি: নিজস্ব পর্যবেক্ষণ থেকে আমি সত্যি সত্যিই মনে করি যে ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও অস্থিরতা, তার বেশির ভাগ বীজই রোপিত হয়েছিল দেশভাগের মধ্য দিয়ে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাংলার এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পাঞ্জাবের সত্তা দেশভাগের ফলে দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। দেশভাগের দীর্ঘ পটভূমিতে আরও পরে পাকিস্তান ভেঙেছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে এই ভূখণ্ডে বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর মেরুকরণে বিচিত্রধর্মী নানা রূপান্তর ঘটেছে। এর ফলে নানা উত্থান-পতন ঘটেছে এ দেশগুলোয়। একটু ধৈর্য ধরে দেখলে উপমহাদেশের অমীমাংসিত রাজনৈতিক সংকটগুলোর মধ্যে দেশভাগের ক্ষতের যন্ত্রণা স্পষ্ট উপলব্ধি করা যায়। এ উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলোর আন্তসম্পর্কের দিকনির্দেশনামূলক নীতির ভিত্তি এখন পারস্পরিক অপার সন্দেহ।

প্রশ্ন

আপনার সঙ্গে তো শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ হয়েছিল। কেমন ছিল সে অভিজ্ঞতা?

টালি: শেখ সাহেবের সঙ্গে আমার অনেকবারই দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। তাঁর সঙ্গে যখন আমার প্রথম মুখোমুখি দেখা, সে মুহূর্তটি আমার মনে এখনো একেবারে উজ্জ্বল। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাঁকে আপনি পছন্দ না করে পারবেন না। আমার এক অপূর্ব অনুভূতি হয়েছিল। যে ধ্বংসযজ্ঞ এ দেশে ঘটে গেছে এবং যে বিপুল সমস্যা তাঁর সামনে অপেক্ষা করছে, প্রথম সাক্ষাতেই আমার মনে হয়েছিল তিনি সে সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন। পরে যে সমস্যায় তিনি পড়লেন এবং তাঁর যে পরিণতি ঘটল, তাতে আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি। রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় জেনারেল জিয়ার সঙ্গেও আমার বহুবার দেখা হয়েছে। তাঁদের দুজনকেই আমার ভালো লেগেছে। তবে দুজনের সঙ্গে আমি একটা দূরত্বও রক্ষা করে চলেছি।

প্রশ্ন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আপনার সম্পর্কটিকে চমকপ্রদই বলতে হবে। জরুরি অবস্থা জারি করার পর তিনি আপনাকে ভারত থেকে বের করে দিয়েছিলেন। পরে কি তাঁর সঙ্গে আপনার আর দেখা হয়েছিল?

টালি: অনেক অনেকবার।

প্রশ্ন

কেমন ছিল সেসব সাক্ষাৎ?

টালি: তাঁর আচরণ সময়ে সময়ে বেশ বদলে যেত, বেশ ওঠানামা করত। কখনো তাঁর ব্যবহার থাকত খুবই উষ্ণ, কখনো আবার একেবারে নির্বিকার। শেষ যেবার তাঁর সঙ্গে আমি মুখোমুখি হই, সেটা তাঁর হত্যাকাণ্ডের আগের বছরের কথা। সৌভাগ্যক্রমে সেবার তাঁর আচরণ বেশ অন্তরঙ্গ ও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। সাক্ষাত্কার শেষে টেপরেকর্ডার বন্ধ করার পরও তিনি অনেকটা সময় ধরে আলাপ করলেন। তাঁর কথাবার্তার অধিকাংশই ছিল দেশের সে সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে।

প্রশ্ন

এ উপমহাদেশ আপনার জীবনকে রূপ দিয়েছে। আপনার জীবন ও সৃষ্টিশীলতার বড় অংশ আপনিও এই উপমহাদেশকে দিয়েছেন। এখানে বাকি জীবন নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

টালি: বাকি জীবনের বড় একটা অংশ আমি গ্রামাঞ্চলে থাকার কথা ভাবছি। আমি সামাজিক ধরনের কিছু কাজকর্ম করতে চাই। গ্রামাঞ্চল আমি অসম্ভব ভালোও বাসি। সততার সঙ্গে বলতে হলে এ কথা আমাকে মানতে হবে যে সাংবাদিক হিসেবে আমি নানা মানুষকে নিয়ে বহু কিছু লিখেছি। আমি ইন্দিরা গান্ধীর সমালোচনা করেছি, শেখ সাহেবের সমালোচনা করেছি, ভুট্টোর সমালোচনা করেছি। আমি শুধু লিখেই গেছি, কখনো হাতে ধরে কিছু করিনি। এই উপমহাদেশকে আমি এবার কিছু প্রতিদান দিতে চাই। একদিন হয়তো কোনো এক গ্রামে আমি ছোট একটা বাড়ি করব। আমি নিজে কোনো এনজিও প্রতিষ্ঠা করতে চাই না। তবে হয়তো কোনো বেসরকারি সংস্থায় আমি কিছু করতে চাইব। আমি চাই একেবারে মাঠে গিয়ে সত্যিকারের কিছু কাজ করতে।