সব শিশু প্রকৃতির প্রতি সমানভাবে আকর্ষণ বোধ করে না। আবার সব শিশু সাপ-পোকামাকড় দেখে সমানভাবে ভয় পায় না বা শিউরে ওঠে না
সব শিশু প্রকৃতির প্রতি সমানভাবে আকর্ষণ বোধ করে না। আবার সব শিশু সাপ-পোকামাকড় দেখে সমানভাবে ভয় পায় না বা শিউরে ওঠে না

সাপ-পোকামাকড়ের ভয় মানেই প্রকৃতির প্রতি অনাগ্রহ নয়

শিশুরা সাপ দেখলে ভয় পায়। আবার জঙ্গলে যেতে চায়, জঙ্গল ভালোবাসে। দুটোই প্রকৃতির অংশ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সাপ বা মাকড়সাকে ভয় পাওয়ার পরও শিশুরা কি প্রকৃতিকে ভালোবাসতে পারে? এর সহজ উত্তর নেই।

ঐতিহ্যগতভাবে দীর্ঘদিন ধরে ‘বায়োফিলিয়া হাইপোথিসিস’ বা জীবপ্রীতি তত্ত্ব অনুযায়ী ধারণা করা হতো যে প্রকৃতির প্রতি মানুষের সর্বজনীন ও সহজাত আকর্ষণ রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনিভার্সিটি ও নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রকৃতি বা জীবের প্রতি আকর্ষণ সর্বজনীন নয়। বরং এটি মানুষের মেজাজ বা স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যের কারণে ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। এ বিষয়ে একটি প্রবন্ধে ৩০ অক্টোবর ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণা কোথায়, কীভাবে হয়েছে?

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ডিউক ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক ভানেসা উডস, ব্রায়ান হেয়ার, গ্রেইন ফিটজসিমন্স ও উত্তর ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির মেলিন্ডা নাথ। গবেষক দলটি যুক্তরাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআরসি) ৩ থেকে ১৩ বছর বয়সী মোট ২৯৫ জন শিশুর ওপর এই গবেষণা চালায়।

গবেষণার যুক্তরাষ্ট্রের অংশ উত্তর ক্যারোলাইনা চিড়িয়াখানায় আগত ১২৪টি শিশু ও তাদের অভিভাবক বা পরিবারের সদস্যদের এই গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের কিনশাসার ‘লোলা ইয়া বোনোবো’ অভয়ারণ্যে শিক্ষামূলক সফরে আসা বিভিন্ন স্কুলের ১৭১ জন শিক্ষার্থী এই গবেষণায় অংশ নেয়।

গবেষকেরা শিশুদের প্রাণীর প্রতি ভয় বা ভীতি (বায়োফোবিয়া) পরিমাপের জন্য প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং জীববৈচিত্র্যের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ যাচাই করতে ছবিভিত্তিক বিশেষ তুলনামূলক পদ্ধতি ব্যবহার করেন। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে তিনটি বিষয় পরীক্ষা করা হয়: ব্যাকইয়ার্ড বায়োফিলিয়া (বাড়ির আঙিনার জীববৈচিত্র্যের প্রতি আগ্রহ), ওয়াইল্ডলাইফ টলারেন্স (বন্য প্রাণীর প্রতি সহনশীলতা বা ঘরের আশপাশে বন্য প্রাণী মেনে নেওয়ার মানসিকতা) এবং বায়োফিলিক ট্রাভেল (জীববৈচিত্র্যময় স্থানে ভ্রমণের ইচ্ছা)।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে

গবেষকেরা শিশুদের দৃষ্টিভঙ্গী বা মনোভাবে ব্যাপক পার্থক্য দেখেছেন। সব শিশু প্রকৃতির প্রতি সমানভাবে আকর্ষণ বোধ করে না। আবার সব শিশু সাপ-পোকামাকড় দেখে সমানভাবে ভয় পায় না বা শিউরে ওঠে না।

গবেষকেরা প্রীতি বা ভীতির ব্যাপারে মার্কিন শিশু ও কঙ্গোর শিশুদের মধ্যে পার্থক্য বেশ স্পষ্ট দেখেছেন। তাঁরা বলছেন, মার্কিন শিশুদের তুলনায় কঙ্গোর শিশুরা ঘরের আশপাশে বন্য প্রাণীর উপস্থিতি কম সহ্য করতে পারে। জীববৈচিত্র্যময় স্থানে ভ্রমণ করার ক্ষেত্রে মার্কিন শিশুদের তুলনায় কঙ্গোর শিশুদের আগ্রহ কিছুটা কম। গবেষকেরা বলছেন, এর কারণ হয়তো এই যে কিনশসার মতো দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটির শিশুরা অনেক সময় শহরের কৃত্রিম নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়।

গবেষণার সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক ফলাফল হলো প্রাণীর প্রতি ভয় (যেমন সাপ বা মাকড়সার ভয়) এবং প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ একে অপরের বিপরীত নয়। যে শিশুরা মাকড়সা বা সাপকে ভয় পেত, তারা সুযোগ পেলে ঠিকই জীববৈচিত্র্যময় পরিবেশ বা পরাগায়ন হয়—এমন বাগানের প্রতি সমানভাবে আগ্রহী হয়েছে। অর্থাৎ ভয় ও আকর্ষণ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে।

গবেষণার তাৎপর্য কী

এই গবেষণা থেকে পরিবেশবিষয়ক শিক্ষার একটি দিকের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে গবেষকেরা দাবি করছেন। এত দিন ধারণা করা হতো যে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করতে হলে সবার জন্য এক বা অভিন্ন উপায় কাজ করবে। কিন্তু এই গবেষণা প্রমাণ করে যে যেহেতু মানুষের বায়োফিলিক প্রবৃত্তি বা প্রকৃতিপ্রীতি একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম, তাই সংরক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলোতেও বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। ভীতি ও প্রীতি আলাদাভাবে কাজ করায়, কোনো প্রাণী বা বুনো পরিবেশ দেখে শিশুরা ভয় পেলেও তাদের মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণের আগ্রহ তৈরি করা সম্ভব।

কোনো শিশু যদি বনের কোনো নির্দিষ্ট প্রাণী বা পোকামাকড় দেখে ভয় পায়, তবে তার মানে এই নয় যে সে প্রকৃতিকে ভালোবাসে না বা তার মধ্যে প্রকৃতির প্রতি কোনো কৌতূহল নেই। ভয় ও প্রকৃতিপ্রেম সহাবস্থান করতে পারে। মা–বাবা বা শিক্ষকেরা বুঝতে পারবেন যে সব শিশুর প্রকৃতি বা জীববৈচিত্র্যের প্রতি আগ্রহ একরকম হবে না। কারও পছন্দ হতে পারে পরিপাটি বাগান, আবার কারও পছন্দ হতে পারে গভীর জঙ্গল। শিশুদের এই ব্যক্তিগত স্বকীয়তা ও স্বাচ্ছন্দ্যের স্তরকে সম্মান জানিয়ে পরিবেশের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটাতে হবে। স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবেশগত শিক্ষা দেওয়ার সময় শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক ভিন্নতা এবং তাদের নিজস্ব এলাকার বাস্তবতাকে মাথায় রেখে কর্মসূচি সাজানো উচিত, যাতে প্রতিটি শিশু নিজের মতো করে প্রকৃতির কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়।