
সন্তান ধারণে দেরি হচ্ছে, এর কারণ কি শুধুই শারীরিক সমস্যা? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তরটি এত সহজ নয়। প্রতিদিনের অনিয়মিত ঘুম, বাড়তে থাকা ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ কিংবা শরীরচর্চার অভাব নীরবে প্রভাব ফেলতে পারে নারী ও পুরুষ—উভয়ের প্রজননস্বাস্থ্যে। তবে একই অভ্যাস সবার শরীরে একইভাবে কাজ করে না। তাই সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তথ্য নিয়ে ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঠিক পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জুন মাস বন্ধ্যত্ব বা ইনফার্টিলিটি বিষয়ে সচেতনতার মাস। এ উপলক্ষে প্রথম আলো ডটকমের বিশেষ আয়োজন ‘সুস্থ নারী, সমৃদ্ধ আগামী’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনায় উঠে আসে জীবনযাপন, মানসিক চাপ ও প্রজননক্ষমতার নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক। আলোচনার বিষয় ছিল ‘লাইফস্টাইল, স্ট্রেস ও ফার্টিলিটি: আসল প্রভাব কতটুকু?’।
তাসনুভা মোহনার সঞ্চালনায় এতে অংশ নেন ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার লিমিটেডের চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম ও সংগীতশিল্পী সাজিয়া সুলতানা পুতুল। অনুষ্ঠানটি গত শুক্রবার রাত আটটায় সরাসরি সম্প্রচার হয় প্রথম আলো ও এসকেএফের ফেসবুক পেজে।
পিসিওএসে জীবনযাপনের ভূমিকা
সন্তান ধারণের সক্ষমতা শুধু শারীরিক কোনো একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে না। খাদ্যাভ্যাস, শরীরের ওজন, ঘুম, ব্যায়াম, মানসিক চাপ ও হরমোনের ভারসাম্যের মতো বিষয়ও প্রজননস্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।
বিশেষ করে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের অনেকের অতিরিক্ত ওজন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও ডিম্বস্ফুটনের সমস্যা থাকতে পারে। তাঁদের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাবার ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।
পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের কী ধরনের রুটিন মেনে চলতে হবে? সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে অধ্যাপক ডা. রাশিদা বেগম বলেন, ‘পিসিওএসে আক্রান্ত নারীদের জন্য জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা একটি বড় বিষয়। নিয়মিত ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ ও শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে পারলে হরমোন ও বিপাকীয় অবস্থার উন্নতি হতে পারে। কারও কারও স্বাভাবিকভাবে ডিম্বস্ফুটনও শুরু হতে পারে।’
অতিরিক্ত ওজনের পাশাপাশি অত্যন্ত কম ওজনও কোনো কোনো নারীর মাসিক চক্র ও প্রজননক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিষয়টি উল্লেখ করে ডা. রাশিদা বেগম বলেন, ‘অন্য কারও খাদ্যতালিকা অনুসরণ না করে নিজ নিজ বয়স, উচ্চতা ও শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা প্রয়োজন।’
নিয়ম মেনে জীবনযাপনের চেষ্টা
কর্মজীবন ও পারিবারিক ব্যস্ততার মধ্যেও খাবার, ঘুম ও বিশ্রামের একটি নিয়ম বজায় রাখার চেষ্টা করেন সংগীতশিল্পী সাজিয়া সুলতানা পুতুল। তাঁর মতে, শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, দীর্ঘ সময় সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্যও নিয়মিত জীবনযাপন জরুরি।
সঞ্চালকের এক প্রশ্নের উত্তরে পুতুল বলেন, ‘আমি বাইরের খাবার যতটা সম্ভব কম খাই এবং ঘুমের বিষয়ে সচেতন থাকার চেষ্টা করি। সকালের খাবার দুপুরে, দুপুরের খাবার সন্ধ্যায় বা রাতের খাবার গভীর রাতে খাই না। সময় মেনে চললে শরীরও অনেক দিন আমাদের সঙ্গ দেয়।’
নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, হালকা শরীরচর্চা ও বিশ্রাম শুধু প্রজননস্বাস্থ্যের জন্য নয়, হৃদ্যন্ত্র, যকৃৎ, কিডনিসহ পুরো শরীর সুস্থ রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মতামত ব্যক্ত করেন সাজিয়া সুলতানা পুতুল।
সামাজিক চাপ বাড়ায় মানসিক কষ্ট
চাকরি, পরিবার, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা ব্যক্তিগত সমস্যা থেকে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে যখন সন্তান না হওয়ার উদ্বেগ যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
অনেক দম্পতিকে আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের অপ্রয়োজনীয় প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। কখন সন্তান হবে, সমস্যা কার কিংবা চিকিৎসা চলছে কি না, এ ধরনের প্রশ্ন তাঁদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে।
এ বিষয়ে ডা. রাশিদা বেগম বলেন, ‘সন্তান না হলে শুধু নারীকে কাউন্সেলিং করলেই যথেষ্ট নয়। তাঁর স্বামী, পরিবার ও আশপাশের মানুষকেও সচেতন করতে হবে। কোনো দম্পতির সন্তান হচ্ছে কি না, কেন হচ্ছে না, এটি তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়। এ নিয়ে খোঁচাখুঁচি বা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা উচিত নয়।’
সন্তান ধারণে সমস্যা শুধু নারীর কারণে হয়, এ ধারণাও সঠিক নয় বলে উল্লেখ করেন ডা. রাশিদা বেগম। তিনি বলেন, নারী ও পুরুষ—উভয়েরই স্বাস্থ্যগত সমস্যা থাকতে পারে। তাই কাউকে এককভাবে দায়ী না করে দম্পতির যৌথ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
মাতৃত্বে সঙ্গীর পাশে থাকা জরুরি
সন্তান জন্মের পর একজন মায়ের শরীর ও মনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। নতুন শিশুর যত্ন, ঘুমের ঘাটতি ও নিজের আগের জীবন ও পরিচয়ে ফিরে যাওয়া নিয়ে অনেক মা উদ্বেগ অনুভব করতে পারেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে পুতুল জানান, সন্তান জন্মের পর পরিবারের সবাই পাশে থাকা সত্ত্বেও তাঁর একসময় নিজেকে একা মনে হয়েছিল। পরে স্বামী যখন সক্রিয়ভাবে শিশুর যত্নে অংশ নেন, তখন সেই অনুভূতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।
সাজিয়া সুলতানা পুতুল বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর এক রাতে আমার খুব একা লাগছিল। সবাই পাশে থাকলেও মনে হচ্ছিল, কেউ নেই। পরে সন্তানের বাবা যখন রাতে জেগে শিশুর যত্ন নিতে শুরু করল, তখন বুঝতে পারলাম আমি একা নই। ধীরে ধীরে আমার বিষাদও কাটতে শুরু করে।’
নতুন মায়ের মানসিক সুস্থতার জন্য শুধু পরামর্শ নয়, পরিবারের বাস্তব সহযোগিতাও প্রয়োজন। শিশুকে কিছু সময় দেখাশোনা করা, মাকে ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া এবং তাঁর অনুভূতি মন দিয়ে শোনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন পুতুল।
বিজ্ঞাপন দেখে সাপ্লিমেন্ট নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফার্টিলিটি বাড়ানোর দাবি করে বিভিন্ন ওষুধ, ডায়েট ও সাপ্লিমেন্টের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। চটকদার প্রচারণায় প্রভাবিত হয়ে অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই এসব গ্রহণ করেন।
কিন্তু সব সাপ্লিমেন্ট সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। কোনো নির্দিষ্ট ভিটামিন বা পুষ্টি উপাদান কার জন্য প্রয়োজন, কত দিন নিতে হবে এবং কোন মাত্রায় গ্রহণ করতে হবে, তা রোগীর স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে।
ডা. রাশিদা বেগম বলেন, বাজারে প্রচলিত সব সাপ্লিমেন্ট কার্যকর নয় এবং সবার জন্য সবকিছু প্রয়োজনও হয় না। কিছু সাপ্লিমেন্ট নির্দিষ্ট রোগীর ডিম্বাণু বা শুক্রাণুর স্বাস্থ্যে সহায়ক হতে পারে। তবে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কারও দেওয়া ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।
তাজা, সুষম ও নিরাপদ খাবার থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি গ্রহণ করাই সবচেয়ে ভালো। তবে কোনো পুষ্টির ঘাটতি বা নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন থাকলে চিকিৎসক সাপ্লিমেন্ট দিতে পারেন বলে পরামর্শ দেন ডা. রাশিদা বেগম।
মাতৃত্বে নিজের জন্যও সময় প্রয়োজন
মাতৃত্ব কার্যত সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। বিশেষ করে নবজাতকের যত্ন নিতে গিয়ে অনেক মায়ের পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম হয় না। দীর্ঘদিন এমন চললে তাঁদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সাজিয়া সুলতানা পুতুল বলেন, ‘মাতৃত্ব ২৪ ঘণ্টার একটি দায়িত্ব। তাই যখনই একটু সময় পাওয়া যায়, তখনই কিছুটা বিশ্রাম নেওয়া ভালো। আধা ঘণ্টা ঘুম, কিংবা ১০ থেকে ১৫ মিনিট নিজের মতো করে থাকা বা মেডিটেশন করলেও শরীর ও মন কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।’
থাইরয়েড, ডায়াবেটিস ও হরমোন পরীক্ষা
নারীর ডিম্বস্ফুটন একটি জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। থাইরয়েড হরমোন, প্রোল্যাকটিন, ইনসুলিনসহ শরীরের বিভিন্ন হরমোন এতে ভূমিকা রাখে। এসব হরমোনের মাত্রায় অস্বাভাবিকতা থাকলে মাসিক ও ডিম্বস্ফুটনে সমস্যা দেখা দিতে পারে বলে জানান ডা. রাশিদা বেগম।
সন্তান ধারণে সমস্যা নিয়ে কোনো নারী চিকিৎসকের কাছে গেলে তাঁর প্রয়োজন অনুযায়ী থাইরয়েড, প্রোল্যাকটিন ও রক্তে শর্করার পরীক্ষা করা হতে পারে। অতিরিক্ত ওজন বা পিসিওএস থাকলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের বিষয়টিও মূল্যায়ন করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. রাশিদা বেগম বলেন, ‘প্রথমে আমরা রোগীর হরমোন ও বিপাকীয় অবস্থাগুলো দেখি। থাইরয়েড, প্রোল্যাকটিন, রক্তে শর্করা বা ইনসুলিনের সমস্যা থাকলে আগে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা প্রয়োজন। এরপর কারও স্বাভাবিকভাবে ডিম্বস্ফুটন হতে পারে, আবার কারও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।’
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে, তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়। মাসিক দীর্ঘদিন অনিয়মিত থাকা, হরমোনজনিত লক্ষণ বা সন্তান ধারণে সমস্যা দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন ডা. রাশিদা বেগম।
ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করতে হবে
মানসিকভাবে ভালো থাকার দায়িত্ব শুধু একজন নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। পরিবার, জীবনসঙ্গী, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের আচরণ তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।
সাজিয়া সুলতানা পুতুল বলেন, ‘ইতিবাচক থাকা জীবনের সব ক্ষেত্রেই কাজে দেয়। তবে একজন নারী বা মায়ের মানসিকভাবে ভালো থাকার জন্য সামাজিক সহযোগিতাও প্রয়োজন। পরিবার ও আশপাশের মানুষ পাশে না থাকলে শুধু তাঁর একার পক্ষে সব চাপ সামলানো কঠিন।’