
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তিকে ‘হুকুমনামা’ আখ্যা দিয়েছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এই চুক্তিকে বাণিজ্যচুক্তি বলা যায় না। এটি মূলত মার্কিন প্রশাসনের একটি হুকুমনামা, যাতে বাংলাদেশ কী কী করতে বাধ্য থাকবে, তা একতরফাভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
আজ বুধবার সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি: হুমকিতে দেশের অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। বৈঠকের আয়োজক বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ‘সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট’।
আনু মুহাম্মদ বলেন, বাজার অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে একটি দেশ সেখান থেকেই পণ্য আমদানি করে, যেখানে কম দামে ও ভালো মানের পণ্য পাওয়া যায়। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম আমদানি করে, কারণ সেখানকার পণ্য তুলনামূলক ব্যয়বহুল এবং প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ এই চুক্তিতে ঘাটতি বাণিজ্যের যুক্তি দেখিয়ে বাংলাদেশকে বেশি দামে মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে, যা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিকভাবে অযৌক্তিক।
চুক্তিতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বীকৃত নীতিমালার প্রতিফলন নেই বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
চুক্তি স্বাক্ষরের সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলে আনু মুহাম্মদ বলেন, নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেদের গরজে, আগ্রহে এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অথচ বিষয়টি নির্বাচিত সরকারের জন্য অপেক্ষা করানো যেত। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ বেশির ভাগ দেশ যখন চুক্তি এড়িয়ে গেছে বা আলোচনার স্তরে আছে, তখন বাংলাদেশ স্বেচ্ছায় এগিয়ে গিয়ে স্বাক্ষর করেছে।
চুক্তির সম্ভাব্য প্রভাব প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গম, তুলা, মাছ বা মাংস আমদানি করতে হলে একদিকে রাজস্ব কমবে, অন্যদিকে ভর্তুকি বাড়বে। সেই বোঝা শেষ পর্যন্ত জনগণের ঘাড়েই পড়বে। ওষুধশিল্প, ডেইরি শিল্প, আইটি ও ই-কমার্স খাত এবং গ্যাস–সম্পদ—সবকিছুই এই চুক্তির আওতায় ঝুঁকিতে পড়বে।
‘চুক্তি একপক্ষীয় এবং অসম’
চুক্তির মূল ভিত্তিই এখন প্রশ্নবিদ্ধ উল্লেখ করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিল, তা পরবর্তী সময়ে মার্কিন আদালত বাতিল করে দেয়।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষর হয়, আর ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন আদালত ওই অতিরিক্ত শুল্ক বাতিল করে দেয়। অল্প কদিন অপেক্ষা করলে এই চুক্তির প্রয়োজনই পড়ত না।
চুক্তিটিকে ‘একপক্ষীয় এবং অসম’ উল্লেখ করে তা বাতিলের আহ্বান জানান অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে মার্কিন শুল্ক ১৬ শতাংশ। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এর সঙ্গে আরও ১৯ শতাংশ এবং নতুন ‘জোরজবরদস্তিমূলক শ্রম’ শুল্ক হিসাবে ১০ শতাংশ যোগ হতে পারে। এতে মোট ৪৫ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়বে বাংলাদেশের রপ্তানি। অথচ যেসব দেশ চুক্তি করেনি, তাদের ওপর এই বাড়তি শুল্ক প্রযোজ্য হবে না।
চুক্তির শর্তের অসামঞ্জস্য নিয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশকে মার্কিন পণ্যে শূন্য শুল্ক দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কোন পণ্যে কখন শুল্ক ছাড়তে হবে, ৫ বছরে না ১০ বছরে, সব লেখা আছে। কিন্তু বাংলাদেশ বিনিময়ে কী পাবে, সে বিষয়ে কেবল বলা হয়েছে ‘পরবর্তী সময়ে একটি ফর্মুলা বের করা হবে’।
সিপিডির এই সম্মাননীয় ফেলো আরও বলেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির স্বাধীনতাও সংকুচিত হবে। চীনসহ যেকোনো দেশের সঙ্গে নতুন বাণিজ্যচুক্তি করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি, মার্কিন পণ্যে শূন্য শুল্কের সুবিধা দেখে অন্যান্য দেশও একই দাবি তুললে বাংলাদেশ বিপাকে পড়তে পারে।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ। আলোচক হিসেবে আরও ছিলেন সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, বিসিকের সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান, বিজিএমইএর সহসভাপতি ইনামুল হক খান প্রমুখ।