
দাবদাহ ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা বিবেচনায় বাংলাদেশকে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানিতে নয়; বরং সামনের দিনগুলোয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি ও দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জোর পরামর্শ দিয়েছেন জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন–বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি প্রথম আলো ডটকম আয়োজিত ‘বিদ্যুৎ-সংকট ও দাবদাহ: দীর্ঘ মেয়াদে করণীয়’ শিরোনামে অনলাইন আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেনের সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
আলোচনার শুরুতেই শওকত হোসেন বলেন, ‘যাঁরা ঘরে থাকেন, তাঁরা নিশ্চয়ই বিদ্যুৎ-সংকট কী রকম, সেটা টের পেয়েছেন। হয়তো সংকট কিছুটা কেটেছে কিন্তু পুরোপুরি দূর হয়নি। আর যাঁরা কাজের জন্য ঘরের বাইরে যাচ্ছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই সূর্যের কিরণটাও টের পাচ্ছেন, যেটাকে আমরা দাবদাহ বলছি।’
এরপর দাবদাহ ও বিদ্যুৎ-সংকটের যে একটা সংযোগ রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপট নিয়েই আলোচনা এগিয়ে নেন শওকত হোসেন। অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলামের কাছে তিনি জানতে চান, এত গরমের কারণ কী? আর এ থেকে পরিত্রাণেরই–বা উপায় কী?
উত্তরে এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা প্রচণ্ড গরম আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। এখন কিন্তু আষাঢ় মাস চলছে, তবে এখনো বৃষ্টি সেভাবে হচ্ছে না এবং প্রচণ্ড তাপদাহ এখনো দেশের কিছু জায়গায় রয়েছে। এর সঙ্গে ভ্যাপসা গরম এই সময়ের অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি এই তাপদাহের সময় আমরা এনার্জি ক্রাইসিস দেখেছি কিন্তু এর সঙ্গে অন্যান্য সংকটও ছিল।’
এই তাপদাহের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম আরও বলেন, ‘আইপিসিসি ক্লাইমেট রিপোর্টে জলবায়ুবিজ্ঞানীরা বলেছেন, বাতাসে যখন গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বেশি থাকে, তখন কিন্তু সেটা “হিট ট্র্যাপ” করে বা আটকে দেয়। আর আটকে পড়া হিটই কিন্তু পৃথিবীর উষ্ণতা বাড়াচ্ছে, যাকে আমরা এখন গ্লোবাল ওয়ার্মিং বলেই জানি।’
সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া বিদ্যুৎ-সংকটসহ সার্বিক পরিস্থিতি প্রতিকূল উল্লেখ করে শওকত হোসেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের কাছে বিদ্যুৎ-সংকটের কারণ ও দাবদাহের সঙ্গে এই বিদ্যুৎ-সংকটের সংযোগস্থল কোথায়, সেটা জানতে চান।
উত্তরে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘দাবদাহের সঙ্গে এই বিদ্যুৎ-সংকটের বিষয়টি মেলাতে গেলে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কথা চলে আসে। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে জ্বালানিগুলো ব্যবহার করছি, বাতাসে গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়িয়ে পড়ার জন্য এই জ্বালানিগুলোর উৎসই দায়ী। এই গ্রিনহাউস গ্যাসের বড় উৎসগুলো হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কয়লা, তেল ও এলএনজির ব্যবহার।’
তাপমাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে বৈশ্বিক উদ্যোগের ঘাটতির কথা উল্লেখ করে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশের কথা বিবেচনা করলে আপাতদৃষ্টে মনে হবে, বাংলাদেশ তো খুব কম গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে, গ্লোবালি সেটার অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। কিন্তু এই বৈশ্বিক উষ্ণতায় আমাদেরও ভূমিকা রয়েছে। আবার একই সঙ্গে এই প্রচণ্ড তাপদাহেও আমাদের ২৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার পরেও বিদ্যুৎ ঠিকমতো আমরা দিতে পারছি না। যদিও বিদ্যুৎ-সংকট কিছুটা এখন কমেছে কিন্তু পরিত্রাণ হচ্ছে না।’
বক্তব্যের শেষে বিদ্যুৎ-সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের উৎসের পরিবর্তনের বিষয়ে জোর দেন। ডলার–সংকটে আবার জ্বালানি আমদানি করতে না পারা, ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও আমদানির বিকল্প হিসেবে দেশীয় গ্যাসের ব্যবহারের কথা বলেন।
‘আমরা যেখানে এসব জ্বীবাশ্ম জ্বালানির ওপরে নির্ভরতা কমাতে চাচ্ছি এবং আইপিসিসি জলবায়ু নিয়ে যেসব সতর্কতা জারি করেছে বা বলছে, আমরা কি আদৌ সেদিকে যাচ্ছি? আসলে আমাদের কী করা দরকার?’
সঞ্চালকের এই প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে, আগামী দুই দশকের মধ্যে আমরা আসলে দেড় ডিগ্রি গ্লোবাল ওয়ার্মিং এক্সিট করছি। এর ফলে আমাদের পারমানেন্ট লস হয়ে যাবে। আমাদের যে টার্গেট ছিল, দেড় ডিগ্রি বা দুই ডিগ্রির মধ্যে রাখা—সেটা কিন্তু হচ্ছে না।’
এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের করণীয় সম্পর্কে জানতে চান শওকত হোসেন। উত্তরে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের নবায়নযোগ্য শক্তিতে যেতে হবে। এর অনেকগুলো কারণ আছে। একটা হচ্ছে বাতাসকে ক্লিন রাখা, আর অন্যটা হলো বর্তমানে ব্যবহৃত জীবাশ্ম জ্বালানি কিন্তু সারা জীবন থাকবে না, অর্থাৎ এটা নবায়নযোগ্য নয়। তাই সোলারের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প সফল করতে পারলে লোডশেডিংয়ের সময় সোলার বিদ্যুৎ আমাদের সাপ্লিমেন্টারি হিসেবে কাজে লাগত। তাই নবায়নযোগ্য বিদ্যুতে আমাদের যেতেই হবে। কারণ, এটাই ভবিষ্যৎ।’
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার প্রসঙ্গ ধরে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত বেসরকারি খাতনির্ভর এবং এর মধ্যে বেশির ভাগ বিদ্যুৎ প্রকল্পই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ফলে সরকারের নীতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানির প্রভাব তুলনামূলক বেশি।’
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবসায়িক সম্ভাবনার কথাও যোগ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ এখন লাভজনক। সরকারের বর্তমান পরিকল্পনানুযায়ী জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভুর্তকি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট আস্তে আস্তে উঠিয়ে নিলে জীবাশ্ম জ্বালানি তখন লাভজনক না হয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিই লাভজনক হবে, এমনকি কয়লার তুলনায়!’
সার্বিক সংকট বিবেচনায় আমাদের কোন দিকে যাওয়া উচিত এবং বর্তমান সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনা কি না—অনুষ্ঠানের শেষে সঞ্চালক শওকত হোসেনের এ প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের জন্য এই সংকট চোখ খুলে দিয়েছে। আমাদের আসলে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যেতে হবে। পাশাপাশি নগরের উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে।’