
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জুলাইয়ের চেতনার প্রতি সম্মান দেখালেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তার (সরকার) জড়তা, সংশয়, ক্ষেত্রবিশেষে অবজ্ঞা দেখছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সুজন বলছে, সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (পিআর) ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন বা জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ (এনসিসি) গঠনের মতো বিষয়ে সরকার বেদনাদায়কভাবে নীরব। সরকারের এই অবস্থানকে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ইতিবাচক লক্ষণ বলা যায় না।
আজ রোববার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বর্তমান সরকারের চার মাস: প্রত্যাশা, অর্জন ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে সুজনের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত প্রবন্ধে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজক সুজন। বৈঠক সঞ্চালনা করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
সমাপনী বক্তব্যে সুজন সম্পাদক বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুসরণ করলে জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত ২০২৯ সালে। গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনেক বিষয় কার্যত পরিবর্তিত হয়ে গেছে।
গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, সেই সময় একটি স্বৈরাচারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে জনগণের ভোটাধিকার ও বাক্স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। তখন ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ হয়।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই গণ–অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। জনগণ একটি পরিবর্তিত ব্যবস্থা চেয়েছিল, যা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো, পুরোনো পথে আর না হাঁটা—এমন মন্তব্য করেন বদিউল আলম মজুমদার। তিনি উপমা দিয়ে বলেন, কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলে সঠিক পথে যাত্রা করতে হয়। পুরোনো পথে হাঁটলে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়; বরং পুরোনো গন্তব্যেই ফিরে যেতে হয়।
বৈঠকে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। প্রবন্ধে বলা হয়, সরকারের ‘পারফরম্যান্স’ বিচার করতে হবে তিনটি প্রশ্নে। প্রথমত, সরকার কি জুলাই সনদের রাজনৈতিক ও নৈতিক তাৎপর্য স্বীকার করেছে? দ্বিতীয়ত, সনদ বাস্তবায়নের জন্য কোনো সময়সীমা, অগ্রাধিকার তালিকা বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া তৈরি করেছে কি? তৃতীয়ত, সরকারের কর্মকাণ্ড কি সনদের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাকি ক্ষমতা গ্রহণের পর পুরোনো রাজনৈতিক আচরণের পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে?
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিতে এখনো সরকারকে দেখা যায়নি। জুলাই সনদ বা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন কেবল আনুষ্ঠানিক ভাষণ বা রাজনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ আছে। এটি উদ্বেগের।
বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী, বেসরকারি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিম, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর প্রমুখ।