বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক

মব সন্ত্রাসকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের আওতায় আনার দাবি শিক্ষক নেটওয়ার্কের

রাজধানীর শাহবাগ, রংপুর ও কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক মব সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক। আজ সোমবার বিকেলে সংগঠনটির বিবৃতিতে এসব ঘটনার নিন্দা জানিয়ে মব সন্ত্রাসকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য করে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে চারটি দাবি জানানো হয়। সেগুলো হলো শাহবাগ, রংপুর ও কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরে হামলাকারী ও হত্যাকারী মব সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের আওতায় আনা; অবিলম্বে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিকে বিনা শর্তে মুক্তি ও সাহারা চৌধুরী রেবিলের ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়া; সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া এবং সহিষ্ণু সমাজ নির্মাণে কাজ করা, অসহিষ্ণু শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্র করতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া।

বিবৃতিতে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘মব কালচার শেষ।’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বার্তা জনমনে স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে মব সহিংসতা দমনে বিএনপি সরকারও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, যা হতাশাজনক।

নির্বাচনের আগে বিএনপির বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্পিরিটকে ধারণ করার ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে বিবৃতিতে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘অথচ আমরা দেখলাম, এই সরকারের আমলে সবার আগে আক্রান্ত হলো স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অমূল্য ঐতিহ্য—৭ মার্চের বিখ্যাত ভাষণ। প্রকাশ্যে এই ভাষণ বাজানোয় মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মববাজদের আক্রমণের শিকার হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শামসুন্নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি এবং স্বৈরাচার বিরোধী গণ–অভ্যুত্থানের অন্যতম সম্মুখসংগ্রামী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি। তিনি শুধু আক্রান্তই হননি, উল্টো তাঁকে সেদিন সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সমাজের নানা প্রান্ত থেকে ইমির মুক্তির দাবি জানানো হলেও সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। শিকারি বহাল তবিয়তে বাইরে ঘুরছে আর শিকার বিনা অপরাধে বন্দী হয়ে আছে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে!’

বিএনপি সরকারও অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই মব-সন্ত্রাসীদের কাছে নতজানু থাকবে কি না, এমন প্রশ্ন তোলা হয়েছে বিবৃতিতে। ১০ এপ্রিল শাহবাগে আড্ডায় বসা একটি বন্ধুগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালানো হয় উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, এতে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ অন্তত আটজন অধিকারকর্মী আহত হন। ঘটনাস্থল শাহবাগ থানার সামনে হলেও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। হামলার শিকার ব্যক্তিরা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও এফআইআর করতে গেলে তা গ্রহণ করা হয়নি বলেও দাবি করা হয়।

একই দিনে রংপুরে মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্বের জেরে রাকিব হাসান নামের এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা। ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে পরদিন রাতে নগরের একটি এলাকায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও দোকানে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। হত্যা মামলায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে একটি দরগায় হামলা চালিয়ে আবদুর রহমান ওরফে শামীম নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুরোনো একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে এ হামলার পরিবেশ তৈরি করা হয়। হামলাকারীরা দরবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করে। ধর্মকে কৌশলে ব্যবহার করে কাউকে হত্যা করার এক ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত হয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ। আক্রান্ত হচ্ছে মাজার-দরগাহসহ বাউল-পীরদের আস্তানাগুলো।

শিক্ষক নেটওয়ার্কের দাবি, অতীতের মতো এসব ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন করে মব সহিংসতা উৎসাহিত হতে পারে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মব সহিংসতা দমনে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় বিবৃতিতে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে এসব ঘটনার উপস্থাপনায় দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়।