হাত-পা বাঁধা, মাথায় যমটুপি পরানো বিকৃত এক লাশ—সংবাদপত্রে এমন একটি ছবি দেখে মো. নজরুল ইসলামের লাশ শনাক্ত করেছিল তাঁর পরিবার। স্বামীর লাশ শনাক্ত করা সেই ছবি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে কাঁদলেন মুন্নী আক্তার।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ বুধবার জবানবন্দি দেন মুন্নী আক্তার। তিনি বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড সচক্ষে দেখার কারণে তাঁর স্বামীকে গুম করে হত্যা করা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন মুন্নী আক্তার। তিনি বলেন, র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান জিয়াউল আহসান তাঁর স্বামীকে গুম করে হত্যা করেছে বলে পরে জানতে পারেন।
গুমের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। আজ তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ—বিজিবি) সদর দপ্তরে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন হত্যার শিকার হন।
ঝালকাঠির নলছিটির বাসিন্দা মুন্নী আক্তার এখন বাসায় বাসায় ছাত্র পড়িয়ে সংসার চালান। তিনি তাঁর স্বামীকে গুম ও হত্যার বিচার চান।
জবানবন্দিতে মুন্নী আক্তার বলেন, তাঁর স্বামী নজরুল ইসলাম পিলখানায় বিডিআর হাসপাতালে মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করতেন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় হত্যাকাণ্ড দেখে প্রাণভয়ে তিনি দেয়াল টপকে বের হয়ে যান। এরপর তিনি কেরানীগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় যান। সেখান থেকে ফোনে তাঁর (স্ত্রী) সঙ্গে যোগাযোগ হয়। তখন তাঁরা পিলখানা ১ নম্বর গেটের সামনে একটি বাসায় থাকতেন। সেখান থেকে তিনি তাঁর কাকির বাসা পোস্তগোলায় চলে যান। সেখান থেকে তাঁর মেয়েকে নিয়ে কেরানীগঞ্জে স্বামীর কাছে যান। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর মেয়েকে নিয়ে ঝালকাঠি বাবার বাড়িতে চলে যান।
মুন্নী আক্তার আরও বলেন, ২০১০ সালে তাঁর স্বামী গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মধুমতি ক্লিনিকে চাকরি নেন। সেখানে স্টাফ কোয়ার্টারে একটি বাসা ভাড়া নেন। এরপর মেয়েকে নিয়ে তাঁরা সেখানে থাকতে শুরু করেন। সেখানে যাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন, তাঁর স্বামীর আসল নাম গোপন করে নুরুল আমীন মুন্সী নাম ধারণ করে মধুমতি ক্লিনিকে চাকরি করছেন। তাঁর স্বামী প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতেন। ২০১০ সালের ১৫ মার্চ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আর ফেরত আসেননি।
পরদিন মধুমতি ক্লিনিকে যান উল্লেখ করে জবানবন্দিতে মুন্নী আক্তার বলেন, জনৈক রুহুল আমীন শেখ তাঁর স্বামীর সঙ্গে কাজ করতেন। রুহুল আমীন বলেন, ২০১০ সালের ১৫ মার্চ কোটালীপাড়া বামতার মোড় এলাকায় সাদাপোশাকে ৫-৬ জন লোক তাঁর স্বামীকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় এবং তাঁকে (রুহুল) মারধর করে সেখানে ফেলে রেখে চলে যায়। একদিন ঝালকাঠি থেকে ডিএসবির লোক এসে তাঁর শ্বশুরকে বলেন, তাঁর স্বামী নজরুল ইসলামের লাশ বাগেরহাটের শরণখোলার বলেশ্বর নদ থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে।
সংবাদপত্রে নজরুল ইসলামের লাশের ছবি দেখে তাঁকে তাঁর ভাই জাহিদুল ইসলাম শনাক্ত করেন উল্লেখ করে মুন্নী আক্তার জবানবন্দিতে আরও বলেন, আত্মীয়স্বজনসহ শরণখোলা থানায় গিয়ে তিনি স্বামীর পরিধেয় পোশাক শনাক্ত করেন। লাশ ফেরত চাইলে পুলিশ জানায়, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে তাঁর স্বামীর লাশ দাফন করা হয়েছে। পরে জেলা প্রশাসকের সহায়তায় ডিএনএ পরীক্ষার পর তাঁর স্বামীর লাশ কবর থেকে তুলে বাড়িতে এনে আবার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।