ই–সিগারেটের নিষেধাজ্ঞামুক্তি বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

‘সিগারেটের কটু গন্ধটা নেই। শুনেছি নিকোটিনও কম। তাই ভেপটাকে সেফই মনে হয়’—মুখ থেকে সাদা রঙের বাষ্প ছাড়তে ছাড়তে কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রায়হান (ছদ্মনাম)। তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। পাশেই আড্ডায় মেতে ছিলেন আরও কয়েকজন তরুণ–তরুণী। কারও হাতে প্রচলিত সিগারেট, আবার কারও হাতে ভ্যাপ ডিভাইস, যেটিকে ই–সিগারেটও (ইলেকট্রনিক সিগারেট) বলা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে তরুণদের মধ্যে ই–সিগারেটের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। প্রচলিত সিগারেটের বিকল্প হিসেবেই শুধু নয়, অনেকের কাছেই ‘ভেপিং’ করা এখন ‘ট্রেন্ড’। অনলাইন মার্কেটপ্লেস ও ই–কমার্স প্ল্যাটফর্মে এই পণ্যের সহজলভ্যতা এবং আকর্ষণীয় বিপণন কৌশল এই প্রবণতাকে আরও বাড়াচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কিছুদিন আগেও দেশে ই–সিগারেট আমদানি ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ ছিল। অবশ্য তখনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে এই পণ্য বিক্রি হয়েছে। সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে সরকার।

ই-সিগারেট মূলত একটি ব্যাটারিচালিত যন্ত্র। এতে থাকা তরলকে তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা ব্যবহারকারী নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন। একেই বলা হয় ‘ভ্যাপিং’। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এই তরলে সাধারণত নিকোটিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকে।

জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, সরকারের এমন সিদ্ধান্ত তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে।উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফও। গত ৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে দেওয়া এক চিঠিতে ই-সিগারেটের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থা দুটি।

ওই চিঠিতে বলা হয়, ই-সিগারেট তরুণ প্রজন্মকে নিকোটিনে আসক্ত করে তুলছে, যা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশে ক্ষতিকর ও দীর্ঘমেয়াদী মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। নতুন নিকোটিন পণ্যের প্রচলন বা এর সহজলভ্যতা তামাকজনিত কারণে মৃত্যু ও অর্থনৈতিক বোঝাকে আরও বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি তৈরি করবে।

আইনে যে পরিবর্তন

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দাবির মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ই–সিগারেট বা ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল। একই বছরের ২৩ ডিসেম্বর জারি করা এক অধ্যাদেশে এসব পণ্যের উৎপাদন, আমদানি, বিপণন ও পরিবহন নিষিদ্ধ করার বিধানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ওই অধ্যাদেশের ৬(গ) ধারায় এ নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছিল। ওই অধ্যাদেশের ৬(গ) ধারায় বলা হয়েছিল, ই-সিগারেট, ভ্যাপ, ভ্যাপিং ডিভাইস, ই-লিকুইড বা হিটেড টোব্যাকো পণ্যের উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি, মজুত, বিজ্ঞাপন, বিপণন ও পরিবহন নিষিদ্ধ। এর ব্যত্যয় ঘটলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়।

তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির সুপারিশে ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ থেকে ই–সিগারেটের অংশটি বাদ দেয়। সংসদে পাসের পর ১০ এপ্রিল সংশোধিত আইনের গেজেট প্রকাশ করা হয়।

ক্ষতি কতটা

ই-সিগারেট মূলত একটি ব্যাটারিচালিত যন্ত্র। এতে থাকা তরলকে তাপ দিয়ে বাষ্প তৈরি করা হয়, যা ব্যবহারকারী নিশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন। একেই বলা হয় ‘ভ্যাপিং’। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এই তরলে সাধারণত নিকোটিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকে।

ই–সিগারেট ব্যবসায়ীদের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে প্রথম ই–সিগারেট আমদানি হয়েছিল ২০১২ সালে। পরবর্তী কয়েক বছরে এই সিগারেট ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। তার বড় কারণ, ই-সিগারেট থেকে নির্গত ধোঁয়া দৃশ্যত নিরীহ প্রকৃতির এবং এর মিষ্টি সুবাস। তার পাশাপাশি ই-সিগারেট আমদানিকারক ও বিক্রেতারা দাবি করেন, এটি প্রচলিত সিগারেটের তুলনায় বেশি নিরাপদ।

তবে জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞেরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা বলছেন, বাস্তবে অধিকাংশ ই-সিগারেটেই নিকোটিন থাকে এবং এটি ব্যবহারকারীর আসক্তি তৈরির প্রধান কারণ।

ই-সিগারেট

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ই-সিগারেট ব্যবহারে নিকোটিন গ্রহণের মাত্রা প্রচলিত সিগারেটের চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ, এটি বারবার ও দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা হয়। ফলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে আসক্তির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি থাকে।

অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী মনে করেন, আইন থেকে ই–সিগারেটের আমদানি বিপণন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় দেশে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো না থাকবে না। তিনি বলেন, এই ধরনের নিয়ন্ত্রণহীনতা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরেরা সহজেই এই পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হবে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনগুলোতে এর ক্ষতিকর প্রভাব আরও ব্যাপকভাবে দেখা দিতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

ই–সিগারটের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব এখনো অজানা, তবে বিগত কয়েক বছরের বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এই পণ্য নিরাপদ নয়।

বাংলাদেশে প্রথম ই–সিগারেট আমদানি হয়েছিল ২০১২ সালে। পরবর্তী কয়েক বছরে এই সিগারেট ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে পড়ে। গত বছরের জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ই–সিগারেট বা ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্ব তামাক মহামারি প্রতিবেদন ২০২১–এ বলা হয়েছে, এতে নিকোটিন থাকে, যেটি অত্যন্ত আসক্তিকর। এটি শিশু–কিশোরদের মস্তিষ্কের বিকাশে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যারা ই-সিগারেট ব্যবহার করে, তাদের ভবিষ্যতে সাধারণ সিগারেটে আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যায়।

সিগারেট সেবন কমছে না

দেশে তামাক ও তামাকজাত পণ্য নিয়ন্ত্রণে ২০০৫ সালে প্রথম আইন (ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন করে বিএনপি সরকার। ওই আইনের মধ্য দিয়ে তামাকজাত পণ্যের যত্রতত্র বিজ্ঞাপন সীমিত হয় এবং ধূমপানের ক্ষতিকর দিকগুলো প্রথমবারের মত আইনে স্বীকৃতি পায়।

পরবর্তীকালে ২০১৩ সালে আইনে সংশোধন আনা হয় এবং সিগারেটের প্যাকেটের ৫০ শতাংশ জায়গাজুড়ে সতর্কবার্তা প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তামাক নিয়ন্ত্রণ–সম্পর্কিত নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন তামাকজাত পণ্যের বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ এবং তামাক ব্যবহার কমানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। ই-সিগারেটকে বৈধতা দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ সেই নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
সৈয়দ মাহবুবুল আলম, আইনজীবী ও তামাকবিরোধী আন্দোলনকর্মী

তবে আইনে কড়াকড়ি করেও বন্ধ করা যায়নি সিগারেট সেবন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট বিভাগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য বলছে, সিগারেট ফুঁকে বছরে প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর দেন ধূমপায়ীরা।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে পাঠানো ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফের ওই চিঠিতেও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তামাকজনিত বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে রয়েছে। প্রতি বছর ১ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয় তামাকজনিত কারণে; যা জাতীয় মৃত্যুহারের প্রায় পাঁচভাগের একভাগ।

সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভারত, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অন্তত ৩৭টি দেশ জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির কথা বিবেচনা করে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করেছে।

বিশ্বজুড়ে তামাকের ব্যবহার কমাতে ডব্লিউএইচওর উদ্যোগ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)। বিশ্বের অন্যতম প্রথম দেশ হিসেবে ২০০৩ সালে এফসিটিসি-তে স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। এর ৫.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকের ব্যবহার হ্রাস, নিকোটিন আসক্তি প্রতিরোধ এবং তামাকের ধোঁয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জনগণকে রক্ষা করতে কার্যকর আইনগত, নির্বাহী ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ হবে।

সম্প্রতি সংসদে গৃহীত আইন এই চুক্তির লঙ্ঘন বলে মনে করছেন তামাকবিরোধী আন্দোলনকর্মীরা। এমন সিদ্ধান্ত বিএনপির দলীয় ইশতেহারের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন তাঁরা।

জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আইনজীবী ও তামাকবিরোধী আন্দোলনকর্মী সৈয়দ মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন তামাকজাত পণ্যের বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ এবং তামাক ব্যবহার কমানোর বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। তাঁর মতে, ই-সিগারেটকে বৈধতা দেওয়ার যেকোনো উদ্যোগ সেই নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ই–সিগারেটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ই-সিগারেট নিয়ন্ত্রণে আলাদা ও কঠোর আইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। যাতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়।