
ঢাকার মোহাম্মদপুরে তিন মেয়েকে নিয়ে আমার ছোট্ট সংসার। স্বামীর উপার্জনে বেশ সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটছিল আমাদের জীবন। শখের বসে মাঝে মাঝে ঘরে তৈরি খাবার বানাতাম—নিজের জন্য, শিশুসন্তানদের জন্য, কখনো কাছের মানুষদের জন্য।
২০২০ সালের করোনা মহামারি যেন আমাদের জীবনের সব হিসাব পাল্টে দিল। হঠাৎ করেই আমার স্বামী ‘জিহ্বার ক্যানসারে’ আক্রান্ত হন।
চিকিৎসকেরা জানান, স্বামীর জিহ্বা তিন ভাগের এক ভাগ কেটে ফেলতে হবে। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। এত টাকা কোথায় পাব—এ প্রশ্নটাই শুধু মাথায় ঘুরছিল।
আত্মীয়স্বজন, পরিচিত-অপরিচিত সবার কাছে সাহায্য চেয়ে আমরা চিকিৎসা শুরু করি। আমার ছোট দুই মেয়ে তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে, আর বড় মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একদিকে স্বামীর চিকিৎসা, অন্যদিকে তিন সন্তানের ভবিষ্যৎ—আমি যেন বুঝতেই পারছিলাম না কী করব।
করোনার সময় আমার তিন সন্তানকে বোনের বাসায় রেখে স্বামীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছিল। টাকা বাঁচানোর জন্য পুরুষের ওয়ার্ডেই আমাকেও থাকতে হয়েছে। কেবিন ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না। একটি বেডে স্বামীর পায়ের কাছে শুয়ে থাকতাম। চারপাশে অপরিচিত মানুষ, অচেনা পরিবেশ—রাতের পর রাত ঘুমাতে পারতাম না। হাসপাতাল থেকে যে খাবার দেওয়া হতো, আমরা দুজন মিলে ভাগ করে খেতাম।
এভাবেই ধীরে ধীরে টাকা জোগাড় করে চিকিৎসা চালিয়ে গেছি। নিজের যা ছিল সব বিক্রি করেছি, অফিস থেকে কিছু টাকা নিয়েছি, সবার সাহায্যে অবশেষে স্বামীর চিকিৎসা শেষ করেছি।
কিন্তু বাসায় ফিরে দেখি আমাদের সব নিঃশেষ। স্বামীর জিহ্বার তিন ভাগের এক ভাগ কেটে ফেলার কারণে তিনি ঠিকমতো কথা বলতে পারতেন না। তিন সন্তানকে নিয়ে পাঁচজনের সংসার কীভাবে চলবে—সেই প্রশ্ন আবার সামনে এসে দাঁড়াল।
তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, অনলাইনে খাবার বিক্রির কাজটা সিরিয়াসভাবে শুরু করব। কোনো দিন অর্ডার আসত, কোনো দিন আসত না। তবু চেষ্টা থামাইনি। এরই মধ্যে আমাদের বড় মেয়ে হোম ইকোনমিকস কলেজে ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন বিভাগে পড়াশোনা শুরু করে। ছোট দুই মেয়ের বয়সের পার্থক্য মাত্র এক বছর—ওরাও এখন এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আমার বড় মেয়ে টিউশনি শুরু করে। আমি বিভিন্ন মেলায় অংশ নিতে শুরু করি। তাতেও খুব বেশি লাভ হচ্ছিল না। অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে জীবনে একটি বড় সুযোগ আসে। তানজিনা নাহিদ, নাসরিন সিকদার হেনা ও আইরিন—আমার এ তিনজন শুভাকাঙ্ক্ষী আমাকে একটি ক্যাফে খোলার সুযোগ করে দেন।
ধানমন্ডি ৩২–এ তাঁদের একটি আউটলেটের মধ্যে একটি রুম, ওয়াশরুম ও কিচেন ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেন তাঁরা তিনজন। আমার হাতে তখন কোনো টাকা ছিল না। ক্যাফে খোলার সাহসও ছিল না। কিন্তু তাঁরা আমাকে বিশ্বাস করেছেন। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করে দিয়েছেন, প্রচার করেছেন, পরামর্শ দিয়েছেন। আমার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটা সহজ করে দিয়েছেন।
আজ আমি ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি। এখন নিজের হাতে রান্না করে বিভিন্ন ধরনের খাবার সরবরাহ করি। সেই আয় দিয়ে সংসার চালাই, সন্তানদের পড়াশোনার খরচ দিই। অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে এটাই বলতে পারি—হাল না ছাড়লে, একদিন না একদিন পথ খুলবেই।