
নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে তাদের প্রতি সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। নারীর জন্য উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিতে হবে। নারীকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তুলতে বাজেট বরাদ্দ ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নারী ও মেয়েদের ওপর বিনিয়োগ কখনো ব্যর্থ হয় না। আজ মঙ্গলবার বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ কথা বলেন বক্তারা।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ: নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অভিমুখী বাজেট’ শিরোনামে এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, পৃথিবীর যেকোনো কিছুর ওপর বিনিয়োগ করলে তাতে সফলতা ও ব্যর্থতা থাকে। একমাত্র নারী ও মেয়েদের ওপর বিনিয়োগ কখনো ব্যর্থ হয় না। নারী ও মেয়েদের প্রতি একটি বিনিয়োগ বহুমাত্রিক সুফল বয়ে আনে। বিষয়টি ভাবনায় রেখে নীতিনির্ধারকদের বাজেট বরাদ্দ করা দরকার। কর্মসংস্থানে নারীর প্রবেশাধিকার ও আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করার পর যদি সেই আয়ের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ না থাকে তাহলে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নও হবে না।
রাজনৈতিক আনুগত্য, মতভেদ যা–ই থাকুক না কেন নারীবিষয়ক বিল পাস ও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে নারী সংসদ সদস্যরা যেন শক্ত অবস্থান নেন, সেই আহ্বান জানান সেলিম জাহান। তিনি বলেন, এবার বাজেট অত্যন্ত চাপের মধ্যে হবে। সেই চাপের মধ্যে নারীর অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ক্ষমতায়নকে যেন বলি দেওয়া না হয়।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সাদিয়া শারমিন বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে সরকারের শতভাগ সততা রয়েছে। হয়তো কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, তা নির্ধারণে কিছু ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নারীকে আরও কী ধরনের সুবিধা দিলে ক্ষমতায়নের দিক দিয়ে অগ্রগতি হবে, তা নিয়ে গবেষকদের গবেষণা করার আহ্বান জানান তিনি।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম। তিনি বলেন, নারীর অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক—যেকোনো ক্ষমতায়নের জন্য নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসন জরুরি। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মাল্টি সেক্টরাল প্রোগ্রাম প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের আওতায় ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের (ওসিসি) কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানান তিনি। ওসিসির কার্যক্রম বন্ধ হলে নারীর প্রতি সহিংসতার দুর্বৃত্তায়ন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, নারীর সম্পত্তির মালিকানা, উত্তরাধিকার আইনের দিকনির্দেশনা বাজেটের মাধ্যমে আসতে হবে।
সূচনা বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ, নারীর আয় এখনো মূল আয় হিসেবে ধরা হয় না। ফলে নারী তার প্রাপ্য মর্যাদা পায় না। এখন পর্যন্ত নারীর প্রতি মজুরিবৈষম্য কমাতে প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ তৈরি করা যায়নি। এ পরিস্থিতিতে নারীর জন্য উৎপাদনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিতে হবে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত অর্থাৎ স্টেম শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত আলোচক হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন, নারীদের জন্য উৎপাদনমুখী শিক্ষা দরকার। কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা বাড়াতে হবে। নারীর শ্রম যেন অবৈতনিক না হয়। ৪৪টি মন্ত্রণালয় জেন্ডার বাজেট নিয়ে কী করছে, তার বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান যে বিষয়ে বিনিয়োগ করতে হতো, সে ক্ষেত্রে গত ৫০ বছরে সরকার অনীহা দেখিয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক অতনু রব্বানী। তিনি বলেন, জনগণকে শিক্ষিত ও স্বাস্থ্যবান করার ক্ষেত্রে সরকারের আগ্রহ রয়েছে কি না, সেটাও এখন ভাবনার বিষয়। মানব পুঁজিতে বিনিয়োগ করলে কারা বেশি উপকৃত হবে, দেখতে হবে। প্রারম্ভিক অবস্থায় বিনিয়োগ করলে রিটার্ন বা ফল বেশি পাওয়া যায়।
বিশ্বব্যাংকের সামাজিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ সাবিনা পারভীন বলেন, ৪৪টি মন্ত্রণালয় জেন্ডার বাজেট করে থাকে। তবে জেন্ডার বাজেট কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটার কোনো তদারকি নেই। একটি রাস্তা নির্মাণ হলে সেই রাস্তা নারীও ব্যবহার করে, সেটাকে জেন্ডার বাজেটের আওতায় ব্যয় বিবেচনা করা হয়। অথচ দেখা উচিত সেই রাস্তায় জেন্ডার–সম্পর্কিত কী কী সুবিধা রাখা হয়েছে এবং সেগুলো ঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে কি না।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিআইডিএসের জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো আজরীন করিম, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা সহযোগী প্রীতিলতা খন্দকার হক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) উপপরিচালক ইশরাত শারমিন। এ ছাড়া মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি শাহিদা পারভীন শিখা, শক্তি ফাউন্ডেশনের তাহমিনা ইয়াসমিন, একশনএইড বাংলাদেশের মরিয়ম নেছা, এডাবের সমাপিকা হালদার, দৈনিক ইত্তেফাকের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রাবেয়া বেবী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বহ্নিশিখা দাশ পুরকায়স্থ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন উপপরিষদ সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি।