জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা
জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা

জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস

লিগ্যাল এইডে দ্রুত মীমাংসা, কমছে মামলার চাপ 

  • লিগ্যাল এইডে দ্রুত নিষ্পত্তিতে সময় কম লাগছে, খরচ কমছে।

  • সারা দেশে ‘চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার’ নিয়োগের চিন্তা।

ময়মনসিংহে এক বাবা মারা যাওয়ার আগে পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন ছেলেকে কিছু সম্পত্তি হেবা করে দেন। সেখানে মেয়েদের কোনো অংশ ছিল না। জীবদ্দশায় তিনি আরও দুটি জমি বিনিময়ের (এওয়াজনামা) দলিল করে গিয়েছিলেন। ওই বাবার মৃত্যুর পর নিঃসন্তান এক ছেলে আবার তাঁর অংশের চেয়ে বেশি সম্পত্তি স্ত্রীকে হেবা করে দেন।

এ নিয়ে পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে বিরোধ চলছিল। আদালতেও গিয়েছিলেন তাঁরা। এসব মামলা নিষ্পত্তি করতে কখনো কখনো ৫–১০ বছরও সময় লেগে যায়। হয় অর্থের অপচয়। তবে ময়মনসিংহের লিগ্যাল এইড অফিসের মধ্যস্থতায় সব পক্ষ আপসবণ্টনে সম্মত হওয়ায় অল্প সময়ে কোনো খরচ ছাড়া বিরোধের নিষ্পত্তি সম্ভব হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের আইনগত সহায়তা কর্মসূচির অধীনে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি জনপ্রিয় হচ্ছে। এতে আদালতে করা কিছু বিরোধসংক্রান্ত মামলা প্রায় অর্ধেক কমেছে। স্বল্প সময়ে সমাধান পাচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। এ পটভূমিতে আজ ২৮ এপ্রিল পালিত হচ্ছে জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস-২০২৬। এবারে দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ’।

বাধ্যতামূলক বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টার বিধান চালু হওয়া ১২ জেলায় সাত ধরনের মামলা কমেছে ৪৯ শতাংশ।

মামলা কমেছে ৪৮.৯ শতাংশ

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ সংশোধন করে চিফ লিগ্যাল এইড অফিসারের পদ সৃষ্টি করা হয়। আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০২৬–এর অধীনে তারা মূলত তফসিলে থাকা ৯ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তিতে কাজ করছেন। এসব বিরোধ আদালতে নেওয়ার আগে লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার মাধ্যমে আপসের উদ্যোগ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে দ্রুত ও কম খরচে বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।

বিরোধের বিষয়গুলো পারিবারিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। যেমন দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং শিশুদের অভিভাবকত্ব ও তত্ত্বাবধান। রয়েছে বাড়িভাড়াসংক্রান্ত বিরোধ এবং সিভিল জজ আদালতের বণ্টনসংক্রান্ত বিরোধ। পিতামাতার ভরণপোষণ–সংক্রান্ত বিরোধ, তিন লাখ টাকা পর্যন্ত চেক ডিজঅনারের অভিযোগ এবং যৌতুকের জন্য নারী নির্যাতন–সংক্রান্ত অভিযোগও এ তালিকায় রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ২০ জেলায় লিগ্যাল এইড ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে। তবে ৮টি জেলায় এখনো চিফ লিগ্যাল এইড অফিসার পদায়ন করা হয়নি। ১২ জেলায় এ পদে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তারা কাজ করছেন। জেলাগুলো হলো ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, রংপুর, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রাঙামাটি, সিলেট, মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই কার্যক্রম চালুর চিন্তা রয়েছে সরকারের।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সংশোধনী অনুযায়ী বিরোধ মীমাংসার জন্য মাঠপর্যায়ে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সাবেক বিচারক ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে মধ্যস্থতাকারী নেটওয়ার্ক। তাঁরা আদালতে যাওয়ার আগেই বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করছেন। আবার বিরোধ নিষ্পত্তির চুক্তিনামাও আদালতের রায় অথবা ডিক্রির মতোই কাজ করবে। এ জন্য মানুষও এ ব্যবস্থায় আগ্রহী হচ্ছেন।

আইনগত সহায়তা প্রদানের আইনে সংশোধনী আসার পর যে ১২ জেলায় চিফ লিগ্যাল এইড অফিসাররা কাজ করছেন, সেখানে গত বছরের মাঝামাঝি থেকে তফসিলভুক্ত ৯ ধরনের বিরোধের মামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আইন মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ১২ জেলায় গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছর মার্চ পর্যন্ত সাত মাসে আগের সাত মাসের তুলনায় বাধ্যতামূলক বিরোধ নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত বিষয়ে আদালতে দায়ের হওয়া সাত ধরনের মামলা ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আপস-মীমাংসার দুটি বড় সুফল রয়েছে। প্রথমত, সমঝোতার ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় পক্ষগুলোর পারস্পরিক বৈরিতা দীর্ঘায়িত হয় না। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মামলায় পরাজিত পক্ষ প্রায়ই আপিল বা রিভিশনে যায়; কিন্তু লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আপস হলে এ সুযোগ না থাকায় এ-সংক্রান্ত মামলাও কমে আসে।

সহায়তা সারা দেশে বিস্তৃত করতে হবে

আইন ও বিচার বিভাগের তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে গত মার্চ পর্যন্ত ৬৪টি জেলায় ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬২৯ জনকে সরকারিভাবে আইনগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২ লাখ ২৪ হাজার ৮৫৫ জন নারী এবং ২ হাজার ২২৫ শিশু রয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও এ সুবিধা নিতে শুরু করেন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আগে মামলা করার আগে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। আইনগত সহায়তার আইনে সংশোধনী আনার পর লিগ্যাল এইডের কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। তবে সারা দেশে এই কার্যক্রম চালু হওয়া প্রয়োজন।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক প্রথম আলোকে বলেন, দেওয়ানি ধরনের বিরোধ আদালতের বাইরে মীমাংসা হওয়াটা বিচারব্যবস্থার জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন। এতে মামলা কমে, মানুষের সময় ও খরচ বাঁচে, আর আদালতের ওপর চাপও কমে। তবে এই প্রক্রিয়া যেন সাধারণ মানুষের জন্য সহজ, স্বচ্ছ ও সবার জন্য সমানভাবে প্রবেশযোগ্য থাকে—সেটা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।