আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী

সাক্ষাৎকার: ফিরদৌসী কাদরী

গবেষণা শুধু ল্যাবের জন্য নয়, হওয়া চাই মানুষের জন্য

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত, র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক, আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী। ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলোর এবারের আয়োজনে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন কথাসহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক। দীর্ঘ এই সাক্ষাৎকারে নিজের গবেষক হয়ে ওঠার গল্পসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন ফিরদৌসী কাদরী।

প্রশ্ন

আমরা আজকে এসেছি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত, র‍্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত গবেষক ফিরদৌসী কাদরীর কাছে। আপা, আপনাকে প্রথম আলোর এই বিশেষ আয়োজন ‘অভিজ্ঞতার আলো’য় স্বাগত জানাই।

ফিরদৌসী কাদরী: আসসালামু আলাইকুম। অনেক ধন্যবাদ।

প্রশ্ন

ওয়ালাইকুম আসসালাম। এ অনুষ্ঠানে আমরা সাধারণত একদম অতীত থেকে অর্থাৎ শৈশব থেকে শুরু করি। আপনার জন্ম ১৯৫১ সালের ৩১ মার্চ, এটা ঠিক আছে?

 ফিরদৌসী কাদরী: ঠিক আছে।

প্রশ্ন

আর আপনার নামের বাংলা বানান ফেরদৌসী নয়, ফিরদৌসী। হ্রস্ব ই-কার দিয়ে। এটাও ঠিক আছে?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, আসলে আমার নামের বানানটার উচ্চারণও ফিরদৌসী।

প্রশ্ন

আপা, আপনার জন্ম তো ঢাকায়। ঢাকার কোথায়?

ফিরদৌসী কাদরী: পুরান ঢাকায়; তখন তো আর পুরান ঢাকা ছিল না। আগা সাদেক রোডে।

প্রশ্ন

তখন ওটাই ঢাকা ছিল, আগা সাদেক রোডে। আপনার জন্ম কি বাড়িতেই হয়েছিল, নাকি হাসপাতালে?

ফিরদৌসী কাদরী: না না, বাড়িতেই। তখন তো বেশির ভাগ শিশুর জন্ম বাড়িতেই হতো।

প্রশ্ন

আপনার আব্বা শামসুল হুদা চৌধুরী পরে স্পিকার হয়েছিলেন। ছোটবেলায় নিশ্চয়ই তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, হ্যাঁ, অবশ্যই দেখেছি।

প্রশ্ন

তখন তিনি কী করতেন? অ্যাডভোকেট ছিলেন?

ফিরদৌসী কাদরী: না, তিনি কখনো অ্যাডভোকেট ছিলেন না। তিনি রেডিও পাকিস্তানে চাকরি করতেন। এরপর সব সময়ই তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চাকরিজীবী ছিলেন। মূলত রেডিও পাকিস্তান থেকেই তিনি চাকরিজীবন শুরু করেন এবং সেখানেই কাজ করতেন।

প্রশ্ন

আর আপনার আম্মা? তাঁর নাম কী?

ফিরদৌসী কাদরী: আমার আম্মা নওশাবা খাতুন। আমার আম্মা ইউনিভার্সিটি ঢাকার ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চে প্রফেসর ছিলেন। তিনি এখনো বেঁচে আছেন।

 ওইখানেই তিনি সব সময় শিক্ষকতা করেছেন—প্রথমে স্কুলে পড়িয়েছেন, পরে এমএড করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন।

প্রশ্ন

যোগ্য মায়ের যোগ্য কন্যা। আপনার স্কুল–কলেজ কোনটা?

ফিরদৌসী কাদরী: আমি প্রথমে ভিকারুননিসায় ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছি। এরপর নানা কারণে সেখান থেকে মুভ করে বাওয়ানী একাডেমি থেকে ম্যাট্রিক পাস করি। তারপর হলি ক্রস কলেজে পড়েছি, পরে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে।

প্রশ্ন

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে?

ফিরদৌসী কাদরী: বায়োকেমিস্ট্রি মলিকুলার বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে। সেখান থেকে পড়াশোনা করে পিএইচডি করতে গিয়েছি লিভারপুলে।

প্রশ্ন

লিভারপুলের ওই প্রতিষ্ঠানটার নাম কী?

ফিরদৌসী কাদরী: ইউনিভার্সিটি অব লিভারপুল। সেখান থেকে তিন–চার বছরের মধ্যে ফেরত এসে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করেছি।

প্রশ্ন

পিএইচডি হয়ে গেল?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, পিএইচডি হয়ে যাওয়ার পর আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে যোগ দিয়েছি।

প্রশ্ন

এটা কত সালে?

ফিরদৌসী কাদরী: এটা ছিল ১৯৮১ সালে। পাঁচ–ছয় বছর আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ছিলাম। আসলে আরও বেশি সময় আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষক হিসেবে ছিলাম। কিন্তু আমি গবেষণায় খুবই ইন্টারেস্টেড ছিলাম। সেখানে আমি ল্যাবও সেটআপ করেছিলাম, গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছি। তবু সব সময় মনে হতো, যদি আরও ভালো গবেষণা করার সুযোগ পেতাম, তাহলে খুব ভালো হতো।

 তখন আইসিডিডিআরবিতে সুযোগ পেলাম। সেখানে দুই বছর পোস্টডক করলাম একজন বিদেশি সায়েন্টিস্টের সঙ্গে। পরে তিনি আমার কাজে খুবই ইমপ্রেসড হলেন এবং আমাকে চাকরিতে নিলেন। তারপর তিনি যখন চলে গেলেন, যাওয়ার সময় আমাকে তাঁর ল্যাবরেটরির প্রধান করে গেলেন—হেড অব ইমিউনোলজি।

 তখন আমাদের ল্যাবের নাম ছিল শুধু ইমিউনোলজি। এখন আমার ল্যাবের নাম মিউকোসাল ইমিউনোলজি অ্যান্ড ভ্যাকসিনোলজি ইউনিট। সেই সময় থেকেই আমি এখানে আছি।

প্রশ্ন

আপনি যখন ছোটবেলায় ভিকারুননিসা আর হলিক্রসে পড়তেন, তখন কি ভাবতেন যে বড় হয়ে গবেষক হবেন?

ফিরদৌসী কাদরী: আমি আসলে সব সময়ই খুব সিম্পল মানুষ। গানও পারি না, কোনো সাংস্কৃতিক গুণও নেই। পড়াশোনাটাই ভালো লাগত, আর সব সময় মনে হতো—কিছু একটা করব।

প্রশ্ন

ক্লাসে কি ফার্স্ট হতেন?

ফিরদৌসী কাদরী: হুম ফার্স্ট হতাম। এবং চেষ্টা করতাম পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে। আমাদের বাসায় পড়াশোনার খুব ভালো পরিবেশ ছিল।

প্রশ্ন

ভাইবোন কয়জন আপনাদের?

ফিরদৌসী কাদরী: আমরা আসলে তিন বোন। আর সবাই পড়াশোনা করত। আমার নানা শিক্ষক ছিলেন। আমরা নানার বাসাতেই, নানা–নানির কাছেই বড় হয়েছি এবং বাসায় পড়াশোনার খুব ভালো পরিবেশ ছিল।

 যেহেতু নানা গভর্নমেন্ট স্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন, আর মা–ও পড়াশোনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সব মিলিয়ে বাসায় পড়াশোনার পরিবেশটাই ছিল বেশি। আমাদের বলা হতো—সবকিছু করো, খেলাধুলা করো, কিন্তু বিকেলে সবাই পড়তে বসতে হবে। আমরা খেলতাম, তারপর বিকেলে এসে আবার পড়তে বসতাম।

 আর আমার নানির অনেক বড় ভূমিকা ছিল। তিনি কোনো স্কুল–কলেজে পড়েননি, কিন্তু শিক্ষার মূল্য যে কত, সেটা তিনি জানতেন। আমার মনে হয়, আমাদের তিন বোনের জীবনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল আমার নানির। তিনি শিখিয়েছেন—খেলার সময় খেলো, পড়ার সময় পড়ো। তিনি খুব ভালো রান্না করে খাওয়াতেন, যেন আমাদের নিউট্রিশন ভালো থাকে। নানা–নানি আমাদের খুব যত্ন করে বড় করেছেন।

প্রশ্ন

তারপর আপনি টিচিং প্রফেশনে প্রায় ছয় বছরের মতো ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ওইটা মিস করেন না?

ফিরদৌসী কাদরী: মিস করি না, কারণ ওদের সঙ্গে এখনো অনেকভাবে জড়িত আছি। আমাদের এখানে সব সময়ই স্টুডেন্টরা থাকে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার বাইরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়—এসব জায়গার ছাত্ররা আমাদের ল্যাবে আসে, গবেষণা করে, থিসিস করে।

 এ ছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গেও আমার অনেক যোগাযোগ থাকে—ঢাকা ইউনিভার্সিটি, রাজশাহী ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাকের শিক্ষকদের সঙ্গে। আইইউবির সঙ্গেও জড়িত ছিলাম, তারপর কিছুটা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সঙ্গেও।

সব মিলিয়ে একই জায়গাতেই আছি বলা যায়। তবে এখন গবেষণাটা আরও বেশি, আরও ভালোভাবে করতে পারছি।

প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত নারী দিবসের অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন ফেরদৌসী কাদরী
প্রশ্ন

আমরা একটু পুরনো গল্পটা শুনতে চাই। আপনি এখানে এসে যখন পোস্টডক করলেন তখনই তো ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করলেন। পরে আপনার সুপারভাইজার চলে গেলেন, আপনাকে এই ল্যাবরেটরির প্রধান বানিয়ে দিয়ে গেলেন তাইতো?

ফিরদৌসী কাদরী: প্রথমে আমি এখানে ল্যাবভিত্তিক গবেষণাই করতাম। এখন যেমন বহুমুখী গবেষণা করি, তখন সেভাবে করতাম না। আর যার সঙ্গে আমি কাজ করতাম—ড. ইভান সেসনার—তিনিও ল্যাবরেটরি সায়েন্টিস্ট ছিলেন, ইমিউনোলজিস্ট ছিলেন। আমরা মূলত ল্যাবরেটরির গবেষণাই করতাম।

বেশির ভাগ গবেষণা করতাম শিগেলা নিয়ে। শিগেলা নিয়ে অনেক বেশি কাজ করেছি—যে জীবাণু দিয়ে রক্ত আমাশয় হয়, সেটি নিয়ে গবেষণা করতাম। কারণ, তখন ওই সময়ে অনেকেরই, এমনকি আইসিডিডিআরবিতেও গবেষণার ক্ষেত্রে মনে হতো যে ওআরএস তো হয়ে গেছে, একটি ভ্যাকসিন ট্রায়ালও হয়েছে, তাই খুব বেশি কাজ বাকি নেই। সবকিছু মোটামুটি ঠিক হয়ে গেছে, এখন কলেরা নিয়ে এত চিন্তা করার দরকার নেই—কারণ ওআরএসের জায়গা ট্রিটমেন্টের জায়গা (এসে গেছে)।

প্রশ্ন

আপনি এখানে যোগ দেওয়ার আগেই ওআরএসের গবেষণাটা হয়ে গেছে। আপনি আসার পরে প্রচারটা এবং এটা বাস্তবায়নের কাজটা হয়েছে।

ফিরদৌসী কাদরী: প্রচারটা, ব্যবহারটা—ব্র্যাকের মাধ্যমে যে ব্যবহারটা হয়েছে এবং আইসিডিডিআরবির তরফ থেকে যে ব্যবহারটা হয়েছে, সেটা কিন্তু চলছিল। তখন হয়তো নিজেদের মধ্যে একটা তৃপ্তির ভাব এসে গিয়েছিল যে অনেক দ্রুতই কাজটা হয়ে গেছে। তখন কলেরা গবেষণার ওপর খুব বেশি ফান্ডিংও ছিল না।

 আর সবাই বলত, শিগেলা যেহেতু রক্ত আমাশয়ের জীবাণু এবং এর কোনো ভ্যাকসিন তেমন ছিল না, এখানে অনেক কাজ করা যায়—তাই রক্ত আমাশয় নিয়েই কাজ শুরু করলাম এবং বেশ কিছুদিন সেই কাজ করেছি।

 কিন্তু আমি সব সময় ঘুরেফিরে কলেরার দিকেই তাকাতাম। আমার মনে হতো, এখানে অনেক কিছু করার আছে—ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করার আছে, জীবাণুটাকে বোঝার জন্য অনেক কিছু করার আছে। কিন্তু এগুলো করতে ফান্ডিং লাগে। বুঝতেই পারছেন, আইসিডিডিআরবিতে আমরা যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারি না। বাইরে থেকে হয়তো মনে হয়, এখানে ইচ্ছামতো গবেষণা করা যায়। কিন্তু আসলে আমাদের সায়েন্টিস্টদের কিছু নির্দিষ্ট রিকোয়ারমেন্ট থাকে।

প্রশ্ন

এটা তো পৃথিবীর যেকোনো জায়গায়ই—গবেষণা করতে গেলে ফান্ডিং লাগে।

ফিরদৌসী কাদরী : হ্যাঁ, ফান্ডিং লাগে। নিজেকেই আনতে হয়—প্রপোজাল করতে হয়, ডোনারদের পটাতে হয়, তারপর ফান্ড আসে, তারপর গবেষণা হয়।

 তো একটা সুযোগ বা নির্দিষ্ট গবেষণার ক্ষেত্র না থাকলে খুব ভালো লাগে না। একসময় মনে হলো, আমি শিগেলা নিয়ে কাজ করছি—তখন সবাইই শিগেলা নিয়ে কাজ করছে, আমাদের ল্যাবেও, অন্য ল্যাবেও। তখন মনে হতে লাগল, একটু সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি। ভাবলাম, ইউনিভার্সিটিতে ফিরে যাই। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে তো সব সময়ই ডাক আসত, আর আমার হাজব্যান্ডও সেখানে বায়োকেমিস্ট্রিতে ছিলেন।

আমি একদিন আমার ডিরেক্টরকে বললাম—আমি জানুয়ারি থেকে আর থাকব না। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন,“কেন? তোমাকে কি আমি কিছু দিতে পারি? আরও ইকুইপমেন্ট বা কিছু দরকার?” আমি বললাম, “না, ইকুইপমেন্ট না—আমি এখানে গবেষণা করতে এসেছি, কিন্তু এমন কোনো বিষয় খুঁজে পাচ্ছি না, যেটা নিয়ে কাজ করলে আমার সত্যি ভালো লাগবে। সেটা না পেলে এখানে থেকে কী করব? আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ফিরে যাব।”

তখন তিনি বললেন, “আচ্ছা, চিন্তা করে দেখো। এখনো তো অনেক সময় আছে।”

 এরপর আমি আবার মন দিয়ে কাজ করতে থাকি। হঠাৎ করে এক নতুন ধরনের কলেরার জীবাণু আসে। আমরা সাধারণত Vibrio cholerae O1 (ভিব্রিও কলেরি ও১) নিয়ে কাজ করতাম। কিন্তু এবার কলেরা হলেও ল্যাবে বুঝতে পারছিলাম না—এটা কী ধরনের। পরে বোঝা গেল, এটা O1 না, সম্পূর্ণ নতুন ধরনের।

 সেই কাজটাতেই আমি চলে যাই। আর ওই কাজ থেকেই আমার গবেষণার পুরো দিকটাই চেঞ্জ হয়ে গেল। আমি এবং আমার সহকর্মীরা মিলে ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে খুব ভালো মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি তৈরি করি, যা এখনো আমরা কলেরা শনাক্ত করার জন্য ব্যবহার করি—বিশেষ করে O139-এর ক্ষেত্রে। এরপর ওই জীবাণুর ভ্যাকসিন নিয়েও কাজ করেছি—ভ্যাকসিন স্টাডি, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল—সবই করেছি।

 এইভাবে আবার O1-এও ফিরে আসি। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত আমি কলেরা নিয়েই কাজ করছি। এই কাজ করতে গিয়ে বুঝলাম—এখানে আরও অনেক কিছু করার আছে, বিশেষ করে বাংলাদেশে।

 তখন কলেরার একটি টিকা ছিল, কিন্তু সেটা খুবই দামি। আমাদের মতলবেই এর ট্রায়াল হয়েছিল, সুইডিশ গবেষক আর আইসিডিডিআরবির গবেষকেরা মিলে এটি তৈরি করেছিলেন। পরে সেটি WHO প্রিকোয়ালিফায়েড হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এটা ট্রাভেলার্স ভ্যাকসিন হিসেবে ব্যবহৃত হতে লাগল। বাইরে থেকে যারা বাংলাদেশে আসত, তারা এটা নিয়ে আসত। কারণ আমাদের দেশের মানুষ এত দামি টিকা নিতে পারত না।

 আরেকটি সমস্যা ছিল, এটি ব্যবহার করতে হলে একটি বাফারের সঙ্গে পানি জাতীয় জিনিসের সাথে মিশিয়ে খেতে হতো। ফলে এটি না ছিল সাশ্রয়ী, না ছিল সহজে ব্যবহারযোগ্য।

 এরপর অন্য গবেষকেরা আরও কাজ করে একটি নতুন, তুলনামূলক সহজ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন তৈরি করেন। সেটি নিয়ে এখন পর্যন্ত কাজ করছি।

 আমি তখন ভাবলাম—এত দিন ল্যাবে কাজ করলাম, কিন্তু রোগী তো কমছে না। বাংলাদেশে এখনো অনেক কলেরার রোগী, পৃথিবীতেও বাড়ছে। তাই যদি এই নতুন টিকাটি বাংলাদেশে এনে প্রমাণ করা যায় যে এটি দিয়ে কলেরা প্রতিরোধ করা সম্ভব, তাহলে এটি দেশে ব্যবহার করা যাবে।

 এই চিন্তা থেকে আমরা একটি বড় প্রপোজাল লিখলাম। গেটস ফাউন্ডেশনকে আমি একটি চিঠি লিখি। আমার ডিরেক্টর আমাকে অনুমতি দেন।  তো ওই চিঠিটা আসলে একটা চেঞ্জ আনল। আমি লিখলাম—বাংলাদেশে এত কলেরা, কিন্তু এই টিকার ফিজিবিলিটি, সেফটি এবং আমাদের ইপিআই সিস্টেমের সঙ্গে কতটা মানানসই—তা কখনো পরীক্ষা করা হয়নি।

 আর আমাদের ঢাকা শহরে অনেক কলেরা …। সে বলল যে ঠিক আছে আমরা ঢাকায় আসব। সব ধরনের লোকজনকে ইনভাইট করল তারা। মানে আমাদের বলে দিল যে কোম্পানি থেকে আরম্ভ করে গবেষক থেকে আরম্ভ করে কলেরার কোনো বাংলাদেশে ডিজি হেলথ থেকে আরম্ভ করে সবাই এল এই মিটিংয়ে। দুদিনের মিটিং হলো এবং ২০০৭–০৮ সালে বোধ হয় এবং ওই মিটিংয়ে ডিসকাস করা হলো যে কী ধরনের গবেষণা করা উচিত। সেখানেই আমরা ঠিক করলাম যে এ রকম একটা গবেষণা করা উচিত যেখানে আমরা টিকাটার মান দেখব এবং সবচেয়ে ভালো হচ্ছে যেখানে ঘনবসতি আছে, যেমন মিরপুরের থেকে আমাদের অনেক রোগী আসে আইসিডিডিআরবিতে। এখানে তো আমাদের কাছে তথ্য আছে। তো আমরা বললাম যে ঠিক আছে মিরপুরেই করব।  আমরা পরিকল্পনা করি—একদলকে কলেরার টিকা দেওয়া হবে, সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি যেমন হাত ধোয়া, পরিষ্কার থাকা, নিরাপদ পানি পান—এসব শেখানো হবে। আরেকটি দলকে কিছুই দেওয়া হবে না। এইভাবে আমরা টিকার কার্যকারিতা যাচাই করব।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষক ফিরদৌসী কাদরী
প্রশ্ন

শুধু টিকা।

ফিরদৌসী কাদরী: শুধু টিকা। টু হান্ড্রেড ফিফটি থাউজেন্ড। অনেক বড় স্টাডি। মিরপুরে সাতটা এলাকায় সাতটা ওয়ার্ডে করা হলো প্রথম গবেষণাটা এবং এটার ফলাফল হলো যে আমরা নতুন করে কিছু ইনভেন্ট করতে চাইনি। আমাদের ইচ্ছা ছিল যে এ রকম একটা কাজ করব, যেটা বাংলাদেশের ইপিআই সিস্টেমে চলে আসবে। মানে এ রকম না—আমরা অনেক সময় টিকার পরীক্ষার মতো যে কাজগুলো করি, কিছু নতুন জিনিস কিনে নিয়ে আসি, ওটা দিয়ে টিকা দিই—এগুলো কিছু নয়। আইসিডি, ডিজি হেলথ, সিডিসি, আইডিসিআর— সবার সঙ্গে গভর্নমেন্টের মিলিত কাজ... হলো একসঙ্গে । ইপিআইয়ের যে কোল্ড বক্স, তার যে স্টোরেজ, সবকিছু ওইভাবেই ব্যবহার করা হলো। এ–ই করে আমরা দেখালাম, দুই বছরের মধ্যে আমরা ৬০ পার্সেন্ট কলেরা নির্মূল করতে পারি এবং তিন–চার বছর পর্যন্ত এটার ভ্যালু থাকে। জানেন তো টিকা আবার দিতে হয়। আর ওই রকম, যে ধরনের ওয়াশ সিস্টেম আমরা তৈরি করেছিলাম—ক্লোরিনেটেড ওয়াটার খাওয়া এবং আমরা বাসায় বাসায় একটা কল দিয়ে দিয়েছিলাম, একটা প্লাস্টিকের বাটি, একটা প্লাস্টিকের বালতি—এগুলো দিয়ে তারা হাত ধুত, পানি খেত। সোপি ওয়াটার, মানে একটা বোতলে সাবানপানি, ওই যে ডিটারজেন্টের একটা প্যাকেটে করে রেখে দিত তারা বাড়িতে বাড়িতে এবং সেটা থেকে তারা হাত ধুত টয়লেট থেকে এসে। কিন্তু পরে দেখা গেল, একটা ভ্যাকসিন দিলেই কাজ হচ্ছে। ওই রকম করে আমরা ক্লোরিনেটেড ওয়াটার, সোপি ওয়াটার দিয়ে খুব একটা বেশি ভ্যাকসিনের মান বাড়াতে পারলাম না। তার পর থেকে বোঝা গেল, ইট ইজ ফিজিবল অ্যাফোর্ডেবল টু টেক দ্য ভ্যাকসিন। ভ্যাকসিনের দাম কিন্তু খুবই কম। আমরা তো তখন ওই স্টাডির জন্য ভ্যাকসিনটা পেয়েছিলাম লেস দ্যান টু ডলার। সব সময় গ্যাভি (Gavi, the Vaccine Alliance) যেই ভ্যাকসিনগুলো বিক্রি করতে আনে দেশে দেশে, সেটা কিন্তু খুব কম দামে তারা কোম্পানির কাছ থেকে কেনে। তো এটাও খুব লো প্রাইসড। ওই যে আরম্ভ হলো, সেখান থেকে দেখা, এটা টু ডোজ ভ্যাকসিন। আমরা তো জানি, অনেকগুলো ভ্যাকসিন টু ডোজ। কোভিডের ভ্যাকসিনও তো টু ডোজ ভ্যাকসিন ছিল, তাই না?

প্রশ্ন

জি। পরে তো থ্রি ডোজ, ফোর ডোজও দিতে হয়েছে।

 ফিরদৌসী কাদরী: থ্রি ডোজও ছিল, ফোর ডোজও ছিল। এটা ছিল টু ডোজ। তখন চিন্তা করলাম, টু ডোজ দেওয়া, এটা তো এটা কঠিন। কারণ, আমরা যদি বাংলাদেশের ৭০ লাখ মানুষের কথাই চিন্তা করি, তাদের একবার টিকা দিয়ে আরেকবার দেওয়াটা তো কঠিন। আর এটার কি আসলে দরকার আছে? চিন্তা করলাম যে একটা ডোজ দিয়ে দেখি না কী হয়। সেটাও একটা বড় পপুলেশনের মধ্যে করা হলো, ওই মিরপুর এলাকায়। আরও সাতটা ওয়ার্ড নিয়ে না পনেরোটা ওয়ার্ড নিয়ে। সেখানে আবার দেখা গেল যে হ্যাঁ, একটা টিকা দিয়ে খুব ভালোই প্রোটেকশন হয়, যারা পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে। কিন্তু যারা ছোট, তাদের একটা টিকায় খুব একটা বেশি লাভ হয় না। সেই প্রবলেমটা রয়েই গেছে। পাঁচ বছরের নিচে যারা, ছোট বাচ্চাদের কিন্তু টিকার যে ওরাল টিকার সাথে তাদের রেসপন্স অত ভালো হয় না—যেকোনো ওরাল টিকার। এভাবেই আমরা কাজটা করলাম। এটা হলো কলেরার ভ্যাকসিন। তারপর এখন সেই ভ্যাকসিন তো ওখানে থেমে যায়নি। আমরা আমাদের যে প্রপোজাল লিখলাম, সেটাতেই ছিল যে আমার সব সময় বাংলাদেশের জন্য এত ভালোবাসা যে আমি ভাবলাম যে টিকা আরেক জায়গায়, পার্শ্ববর্তী দেশেই তৈরি হচ্ছে, বাইরে তৈরি হচ্ছে, বাংলাদেশে তৈরি হবে না কেন? বাংলাদেশে তো কোম্পানি আছে, যারা তৈরি করতে পারে ভ্যাকসিন বা করছে। তখন সেই কোলাবোরেশন সেটআপ করিয়ে দিলাম। ইন্টারন্যাশনাল ভ্যাকসিন ইনস্টিটিউটে তারা আমাদের সঙ্গে ছিল, তারা ভ্যাকসিন ট্রান্সফার অব টেকনোলজি করবে বাংলাদেশে। এটা একটা আমাদের সূত্র ছিল এখানে। খুব কষ্ট করে পুরোটা করালাম। এটা হয়ে গেল। আমরা সবাই মিলে করলাম এবং এখন বাংলাদেশে কলেরার টিকা উৎপাদিত হয়।

প্রশ্ন

এখন বাংলাদেশে কলেরার টিকা উৎপাদিত হয়?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, কলভ্যাক্স বলে একটা টিকা আছে। একেবারে সমান। এখন জিজ্ঞেস করবেন যে কেন আমরা এটা ব্যবহার করি না?

প্রশ্ন

বলেন।

 ফিরদৌসী কাদরী: তাহলে এটার একটা দুঃখের কথা বলি। আমাদের বাংলাদেশের ডিজিডিএ যেটা আছে, ন্যাশনাল কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি যেটা বলে, সেটার ডব্লিউএইচও প্রিকোয়ালিফিকেশন নেই। এটা হলেই কিন্তু এই টিকা গ্যাভি (Gavi, the Vaccine Alliance) কিনতে পারবে, মানে এই টিকা দেশ–বিদেশে এখনো কিনতে পারে, কিন্তু গ্যাভি না কিনলে তো সিস্টেমে আসবে না, তাই না? আমরাই আমাদের সরকারি ক্রয়ে নিতে পারবে না।

গবেষণাগারে ফেরদৌসী কাদরী
প্রশ্ন

তাহলে এটা ডব্লিউএইচওর মানসম্পন্ন—ওদের সার্টিফায়েড করার জন্য আমাদের কী করতে হবে?

ফিরদৌসী কাদরী: এটার জন্য অনেক চেষ্টা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। আমি এটা ওপেনলি বলছি। কারণ, আমার মনে অনেক কষ্ট আছে। ভাবতাম, এই বছর হবে না, না এই বছর, না সামনের বছর; সামনের বছর গেলে বলত, জুলাই মাসে—জুলাই থেকে ডিসেম্বর।

প্রশ্ন

কিছু প্রিকন্ডিশন আছে, এগুলো আমরা মোকাবিলা করি পূর্ণ করে দিই।

ফিরদৌসী কাদরী: এক্সাক্টলি। অনেকগুলো প্রিকন্ডিশন আছে, যেটা ডিজিডিএ আস্তে আস্তে করছে। কিন্তু আমার মনে হয়, এই জিনিসটা একটু ত্বরান্বিত করতে হবে। শুধু ওইটা একটা ভ্যাকসিন নয়। অনেক ভ্যাকসিনই তো বাংলাদেশ তৈরি করতে পারে। আমাদের অনেক রকমের মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি বিভিন্ন কোম্পানি তৈরি করতে আরম্ভ করেছে। পপুলার, ইনসেপ্টা, তারপর বীকন—সবাই করছে। আমাদের তো এই জায়গায় উৎসাহ দিতে হবে। তাই না? কিন্তু আমাদের দেশে আসে সার্টিফিকেশনের জন্য, দেখতে এসে আবার অনেকগুলো সূত্র দিয়ে যায়। সেটা কমপ্লিট করতে করতে আমরা একটু দেরি করি বা হয় না বা আমাদের দেশে অনেক কিছু হয়, যার জন্য দীর্ঘায়িত হয়। আমি আপনার কাছে, যেহেতু আপনি প্রথম আলো থেকে প্রথম আলোতে লিখবেন, আমি একটু জোর গলায় বলতে চাই যে এই কোয়ালিফিকেশন পিকিউটা—এটাকে বলা হয় প্রিকোয়ালিফিকেশন—যদি বাংলাদেশ এর এই এটা সক্ষম করতে পারে খুব তাড়াতাড়ি, আমাদের জন্য ভালো হবে। অনেক ভালো হবে। পুরো বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে। কিন্তু এটা দীর্ঘায়িত হচ্ছে তো হচ্ছেই। চেষ্টা হচ্ছে, কারণ এই প্রিকোয়ালিফিকেশন কিন্তু শুধু ভ্যাকসিনের জন্য নয়। এটা বায়োলজিক্যালসের জন্য। বায়োলজিক্যালসের অনেক রিকোয়ারমেন্ট আছে। কিন্তু আমাদের আগে অন্য দেশগুলো পেয়ে যাচ্ছে। কারণ, আমাদের দেশে জিনিসটা তো খুব সুন্দরভাবে করা হয় আর একটু দেরিও হয়। এখানে অনেক কিছু আছে, মানে একটা প্রিকোয়ালিফিকেশনের জন্য ম্যানপাওয়ার কত থাকবে, কী হবে, কিভাবে বিশ্লেষণ করা হবে, কীভাবে দেখা হবে মান—এগুলো অনেক কিছু আছে। এটা সিম্পল না, কিন্তু এখন তো অনেক বছর হয়ে গেছে, আমার মতে, যে এটা কিছু একটা হওয়া উচিত এখন অনেক কিছু দিন বদলে গেছে যদি বলি দিন আগেও চেষ্টা করেছি এখনো বলব যে এইটাকে একটু ত্বরান্বিত করতে হবে। শুধু ভ্যাকসিন নয়, অনেক বায়োলজিক্যালস। আমাদের এখনো গ্র্যাজুয়েশন হয়নি। মানে, আমরা তো এখনো মিডল ইনকামে যাইনি। আমরা কিন্তু অনেক কিছু সুবিধা পাচ্ছি। ট্রিপের যে সুবিধা, অন্যান্য জিনিসের সুবিধা, সেগুলো সবই পাচ্ছি। এই সময়ে যদি আমাদের গ্র্যাজুয়েশন হয়ে যায়, মানে আমরা পিকিউড হয়ে যায়, তাহলে অনেক ভালো হবে। আসলে অল্প কিছু জিনিস বাকি আছে। ওই অল্প কিছু জিনিসটা যদি আমরা তো অনেক কিছুই করতে পারি বাংলাদেশে। এটা তো করতে পারি।

প্রশ্ন

নিশ্চয়ই। আপা, আপনি যে অনেক বড় বড় পুরস্কার পেয়েছেন—স্বাধীনতা পুরস্কার বা ম্যাগসাইসাই পুরস্কার—বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে লোকে পায়, কিন্তু গবেষণার জন্য আপনাদের প্রফেশনাল বডি থেকেও তো অনেক বড় পুরস্কার পেয়েছেন, তাই না? এটা একটু যদি বলতেন।

 ফিরদৌসী কাদরী: আমাকে ওই ভ্যাকসিন নিয়েই পুরস্কারগুলো দেওয়া হয়েছে—আমি যে কাজ করি

ভিনফিউচার স্পেশাল প্রাইজ গ্রহণ করছেন আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী। ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের হো গুওম অপেরা হাউসে, ৬ ডিসেম্বর ২০২৪
প্রশ্ন

 প্রথম বড় পুরস্কার কোনটা ছিল?

 ফিরদৌসী কাদরী: সবচেয়ে বড় পুরস্কার যেটা দিয়েছিল, সেটা ছিল ফাউন্ডেশন মেরিও থেকে। ওই যে গ্র্যান্ড প্রাইজ ফ্রেঞ্চ একাডেমি অব সায়েন্সের ফ্রেঞ্চ গ্র্যান্ড প্রাইজ, ওটা খুবই সমাদৃত—অনেক হাই অ্যামাউন্ট অব মানি, ফাইভ হান্ড্রেড থাউজেন্ড ইউরো এবং এটা তারা এত চমৎকারভাবে প্যারিসে করেছিল, পুরো ফ্যামিলি গিয়েছিলাম।

প্রশ্ন

এটা কত সালে?

ফিরদৌসী কাদরী: ২০১২–তে। আমি একেবারে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। ছোটখাটো পুরস্কার বাংলাদেশে পেয়েছিলাম।  আমি গাড়িতে যাচ্ছিলাম... গ্র্যান্ড পুরস্কার... হ্যাঁ হ্যাঁ ফোন করে... একটা এক কথা শুনলাম। ফ্রেঞ্চ ইংলিশ তো অন্য রকম। আমি বললাম যে এটা কী? তারপর একটা চিঠি এল। মানে, অনেক ছোট একটা চিঠি—ইউ হ্যাভ রিসিভড দ্য প্রাইজ। অনেক সময় এগুলোর ভুয়া চিঠি আসে না, ও রকম। তো আমার সঙ্গে আরেকজন সরকারেরই ছিলেন, উনি হেলথের, তাঁকে দেখালাম যে ‘দেখেন তো, এটা কী জিনিস?’ বলে, ‘আপা, এটা তো ভুয়া হতে পারে, ঠিকও হতে পারে। আপনি একটু খোঁজ নেন এখানে।’ আমি একটা মেসেজ পাঠালাম, তখন তারা বলল, ‘আমরা বিকেলে তোমাকে ফোন করব।’ বিকেলে ফোন করল। তো ওইটা ওয়াজ আ টার্নিং পয়েন্ট এবং এটা দিয়ে আমি আরও অনেক কিছু করতে পারলাম—এই প্রাইজগুলো দিয়ে। আমার জীবনের যে একটা অনেক বড় ইচ্ছা ছিল, একটা ভালো কাজ করার, দেশের জন্য, সেটা আমি করতে পারলাম। আরেকটা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারলাম।

প্রশ্ন

সেটা কী?

ফিরদৌসী কাদরী: সেটার নাম হচ্ছে আইদেশি। ২০১২–তে পাওয়ার পরই আমার হাজবেন্ড ও বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি কি এটা দিয়ে দিতে পারি এ রকম একটা প্রতিষ্ঠান করতে?’ আমরা কিন্তু খুবই চাকরিজীবী ফ্যামিলি। তারপর আমার হাজবেন্ড বললেন, ‘এটা তো আমাদের টাকা নয়, এটা তো সাদকায়ে জারিয়া।’ আমি উনার কাছে অনেক ঋণী আসলে। এখন উনি নেই। বাচ্চারা বলল, ‘আমাদের কোনো আপত্তি নেই, তুমি যা করবে করো।’ তারপর আমার হাজবেন্ডের সঙ্গেই মিলে ওই আইদেশি করলাম। ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভস। এটা একটা নন–প্রফিট অর্গানাইজেশন। আমরা আসলে ১২ বছর পূর্তি করতে যাচ্ছি এই বছরের শেষে।

প্রশ্ন

এটার কি অফিস আছে কোথাও?

ফিরদৌসী কাদরী: এটার ল্যাবরেটরি, ফিল্ড—সবকিছু আছে। এটা হচ্ছে কালশীতে ইসিবি চত্বরে। ব্লু মুন টাওয়ারের দুইটা ফ্লোর নিয়ে। এসব প্রাইজমানি দিয়ে কেনা। একটা ১১ তলায়, একটা ৫ তলায়।

প্রশ্ন

ওখানে বাংলাদেশি ইয়াং গবেষকরা গবেষণা করছেন?

ফিরদৌসী কাদরী: ১০০ জনের ওপরে ওখানে।

প্রশ্ন

১০০ জন!

ফিরদৌসী কাদরী: আমাদের ওখানে একজন চিফ অপারেটিং অফিসার আছেন, ডা. রফিকুর রহমান। আমার অনেক সৌভাগ্য যে উনি এত সুন্দরভাবে সবকিছু করছেন ওখানে। উনি আর্মি ব্যাকগ্রাউন্ড একজন ডাক্তার, ওনার অনেকগুলো পোস্টগ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিও আছে; তো উনি কঠিন সব ব্যাপার খুব সুন্দরভাবে মেইনটেইন করতে পারছেন। ওখানে অনেক রকমের গবেষণা হয়। এখানে আমরা যে গবেষণা আমি করি না, সেটা ওখানে করি। যেমন ক্যানসারের গবেষণা ওখানে করি। আবার অনেক বাচ্চা জন্মের সঙ্গে অনেক জেনেটিক ডিজঅর্ডার নিয়ে আসে, সেটার অনেক কাজ ওখানে হচ্ছে। আরেকটা জিনিস করি, থ্যালাসেমিয়া ব্লাড ডিজঅর্ডার। সেটার সবচেয়ে বেশি হার যদি বিশ্বের কোনো দেশে থাকে, এটা হচ্ছে বাংলাদেশে এবং আমাদের ১১ থেকে ১৫ শতাংশ বাচ্চার চান্স থাকে এটা হওয়ার। কারণ, আমরা কোনো পরীক্ষা করি না। মানে বিয়ের আগেও পরীক্ষা করি না। হাজব্যান্ড, ওয়াইফ—দুজনেরই যদি ওই জেনেটিক ডিজঅর্ডার থাকে...

প্রশ্ন

বাচ্চাদের মানে যাদের আছে, তাদেরও কষ্ট হয়, ফ্যামিলিরও কষ্ট হয়।

ফিরদৌসী কাদরী: আরেকটা জিনিস আমরা করি, বাংলাদেশে আমাদের যে থ্যালাসেমিয়া রোগটা আছে, সেটা নিয়ে আইদেশিতে আমরা অনেক অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম করি। অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম যে করি আমরা ইউনিভার্সিটি, কলেজ, ব্যাংকসহ অন্যান্য জায়গায় গিয়ে, গার্মেন্টেও এখন আরম্ভ করেছি, একটা কথা বলি ইয়াং পিপলকে। বলি যে তোমাদের এ রকম একটা একটা রোগ হতেই পারে। আমরা সবকিছু বলি এটা হলে কী হয়। তারপর আমরা ফ্রি টেস্টও করে দিই। ১০০–২০০ জনের টেস্ট করে আইদেশি থেকে ওদের কাছে রেজাল্টও পাঠানো হয়। ওদের কাউন্সেলিংও করা হয়। আমরা যখন ১০০ জনের টেস্ট করি, সেখানে ১০ জনের পজিটিভ আসে, ক্যারিয়ার। ক্যারিয়ার মানে রোগ বলছি না ক্যারিয়ার মানে তার ওই ডিফেকটিভ জিন আছে। সে কী করতে পারে? সে বিয়ের আগে তার হাজব্যান্ডকে জানাতে পারে, মানে তার ফ্যামিলিতে টেস্ট করতে পারে। আমার মতে, বাংলাদেশে যখন ইউনিভার্সিটিতে ছেলেমেয়েরা ঢোকে বা ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় যদি বাধ্যতামূলক এই টেস্টটা করা হয়, এই থ্যালাসেমিয়া টেস্ট, এটা এক হাজার টাকা লাগবে। আর সরকারের তরফ থেকে হলে তো আরও সস্তায় করা যেতে পারে। কিন্তু এগুলো তো মানে ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান করছে কিন্তু দশটা–বারোটা ল্যাবে, কিন্তু করা হয় মানে পয়সা দিয়ে বারো শ–চৌদ্দ শ টাকা দিয়ে করা হয়। কিন্তু এই অ্যাওয়ারনেস তো থাকতে হবে যে আমার এই টেস্টটা করা উচিত। সেটা মনে করেন হাজব্যান্ড, ওয়াইফ দুজন ডাক্তার, এ রকম আমার অনেক চেনা আছে, যারা কোনো দিন থ্যালাসেমিয়া টেস্ট করেনি, তাদের বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়েছে। কত দুঃখের কথা বলেন। এটা কিন্তু জাস্ট একটা সিম্পল টেস্ট। এটা যদি বাধ্যতামূলক করা হয় যে ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে বা এইচএসসি পরীক্ষার আগে বা ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার আগে অনেক কিছু টেস্টিং হয় না, সেখানে এই টেস্টটা হয়ে যাক। তারা জানল এবং এই কার্ডটা থাকবে তাদের কাছে। এটা কিন্তু এভাবে অনেক দেশে নির্মূল করা হয়েছে। কার্ড থাকবে, বিয়ের আগে যেমন আমাদের এনআইডি কার্ড দেখে না, তার বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের সময় এই থ্যালাসেমিয়ার কার্ডটাই দেখাবে। বাংলাদেশে একটা হিসাব আছে যে তেরো শ জনের টাইফয়েড হয় প্রতিদিন।

গবেষক ও বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী, ২০০৭
প্রশ্ন

বাংলাদেশের এই ১৮–১৯ কোটি মানুষের মধ্যে ১ হাজার ৩০০ জনের হয়? প্রতিদিন?

ফিরদৌসী কাদরী: তেরো শ জনের হয়। ২২ জন মারা যায়।

প্রশ্ন

প্রতিদিন বাংলাদেশে টাইফয়েডে ২২ জন মারা যায়?

ফিরদৌসী কাদরী: ২২ জন মারা যায় এবং এর মধ্যে বেশির ভাগই বাচ্চা। এ রকম একটা রোগ আমরা সবাই জানি। ডাক্তাররা কলেরা হয়তো চেনে না; কারণ, আমরা ডায়রিয়া বলি, কলেরার নামটা বেশি নিই না। কিন্তু টাইফয়েড জ্বরের টিকা আমাদের ক্লিনিশিয়ানদের কাছে খুব ইম্পর্ট্যান্ট; কারণ, তারা দেখে তাদের রোগীদের এবং বুঝতে পারে যে এটার অনেক কমপ্লিকেশন হয়। টাইফয়েড রোগের অনেক কমপ্লিকেশনও থাকে। সে জন্য টাইফয়েড রোগ অনেক কষ্ট দেয় মানুষকে; বাচ্চাদের, বড়দের—সবাইকে। আর ৫ থেকে ৯ বছরের মধ্যে কিন্তু হারটা অনেক বেশি। আমরা এসব গবেষণা আগে করলাম। যে বার্ডেনটা দেখলাম যে কী ধরনের টাইফয়েড ফিভার বাংলাদেশে আছে, এটা আসলে কম না বেশি? তো আমরা তিনটা দেশে একটা স্টাডি করলাম, আমাদের বাংলাদেশ, নেপাল ও মালাবি। তিন দেশে একই স্টাডি করলাম, ওইটাকে আমরা স্ট্রাটা স্টাডি বলি, বোঝার জন্য যে টাইফয়েডের বার্ডেন কত দেশে। সেখান থেকে বের হলো যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বার্ডেন। এই মিরপুর এলাকায়। দুইটা ওয়ার্ডে আমরা বার্ডেন দেখলাম। বার্ডেন দেখে তো আমরা অবাক হয়ে গেলাম। আমরা জানতাম যে নেপালে সবচেয়ে বেশি টাইফয়েড, তারা বলত যে তারা কিংডম অব টাইফয়েড। আমরা তখন বলতে আরম্ভ করলাম, আমরা তো এম্পায়ার অব টাইফয়েড। এত বেশি টাইফয়েড আমাদের বাংলাদেশে এবং মালাউয়িতেও টাইফয়েড। তারপর ওই টিকার কাজ শুরু হলো। টিকা তৈরি হলো একটা খুব ভালো, সেটা হচ্ছে কনজুগেট। আমরা তো অনেক রকমের টিকা ব্যবহার করি, এটা ইনজেকটেবল টিকা এবং সেটা খুবই হেভি মানের, খুবই ভালো ইফেকটিভ। তারপর আমরা এটার একটা ফেজ থ্রি ট্রায়াল করলাম। ফেজ থ্রি ট্রায়ালটা করে আমরা দেখলাম, বাংলাদেশে এই ভ্যাকসিন দিলে এই মিরপুর এলাকায় ৮৫ শতাংশ রোগ থেকে আমরা মুক্তি পেতে পারি। ৯ মাস থেকে ১৫ বছর বয়সের ছেলেমেয়েদের মধ্যে করলাম এবং এই টিকার যে ভ্যালুটা হলো, বাংলাদেশে তখন নাইট্যাগ চিন্তা করছে টিকা আনবে কি না। হাসপাতাল বেজড অনেক ফ্যাসিলিটি বেসড ডেটা ছিল, যে হ্যাঁ অনেক টিকা অনেক রোগ আছে টাইফয়েড রোগ আছে। কিন্তু আমরা দেখালাম যে কমিউনিটিতে অনেক রোগ আছে। আমরা যেটা দেখালাম, একটা টিকা দিলে ৮৫ শতাংশ কম রোগ হবে। তো এটা কিন্তু অনেক বড় ডেটা, যেটা নাইট্যাগ ব্যবহার করল, অন্যান্য ডেটাও ব্যবহার করল আমাদের বার্ডেন ডেটা যে টাইফয়েড অনেক আছে এবং আমাদের ইফেক্টিভনেস ডেটা সেফটি ইফেক্টিভনেস সেটার জন্য বাংলাদেশে গ্যাভি অ্যাগ্রি করলো ভ্যাকসিন দিতে। ফলে এই যে গবেষণার ফল, আমি যেটা বললাম, শুধু ল্যাবে বসে গবেষণা করলে কিন্তু হয় না। আমি এটা সবাইকে বলি। এই জিনিসটা বাংলাদেশের মতো একটা দেশে, যেখানে আমরা হাংরি ফর ইনফরমেশন, আমরা তো জানি না কোথায় কী আছে। তো আইসিডিডিআরবিতে যে ডেটা জেনারেট হচ্ছে, সেটা আমরা যদি ব্যবহার করে কাজে লাগাই, তাহলে অনেক কাজ হয়। এই যে টিকাটা এলো, এর জন্য কিন্তু আমরা অনেক গর্বিত যে আমরা করতে পেরেছি, আমরা নিজেরাই করেছি। তারপর এখন এই টিকাদান আরম্ভ হলো, আপনারা এর ক্যাম্পেইনের কথা জানেনই তো। সেখানে যখন যেটা বলা হলো, যেখানে যেতে বলা হলো, আমি গেছি, আমার গ্রুপ গেছে। এই ভ্যাকসিন বেশ এফিকেশাস এবং জ্বরও বেশি হয় না। একটা টিকা দিলে কিছু তো জ্বর আসে, তাই না? এই টিকাতেও একটু জ্বর হবে, কিন্তু কোনো নেগেটিভ রেকর্ড নেই।

প্রশ্ন

আপা দুইটা প্রশ্ন আছে গবেষণা, স্বাস্থ্য আর টিকাসংক্রান্ত। একটা হচ্ছে, এই যে আমরা কোভিডের টিকা নিলাম, কোভিড কারও গোপনে হয়েছে, কারও ধরা পড়েছে, কারও হয়নি। এখন তো দেখি, অনেকেরই মনে হয়, স্মৃতি কমে গেছে। এগুলোর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কী হবে?

ফিরদৌসী কাদরী: আসলে আমি টিকা নিয়ে কাজ করি এবং একটা রোগ হলে যে ক্ষতিটা হয়, সেটা তো আমরা সব সময় দেখি, তাই না? কোভিডেও কতজন মারা গেছে পৃথিবীতে, তাই না? কিন্তু রোগ হওয়ার চেয়ে ভ্যাকসিন নেওয়া অনেক ভালো, অনেক ইম্পর্ট্যান্ট। এই যে স্মৃতি আমার একটু হ্রাস পাচ্ছে, আমাদের তো এটা এমনিও হচ্ছে। অ্যালজাইমার্স হচ্ছে না? ডিমেনশিয়া হচ্ছে না? এমনিও হচ্ছে, বয়সের সাথে হচ্ছে, বয়স ছাড়াও তো অ্যালজাইমার্স দেখেছি চেনাজানা মানুষের মধ্যে। এটা তো অন্য অনেক কারণে হয়। আমার কাছে মনে হয় না এসব কোভিড টিকার কারণে হচ্ছে। অ্যাজ আ ভ্যাকসিন পার্সন আমি জানি যে অনেক কিছু অনেক জায়গায় হয়।

প্রশ্ন

টিকার জন্য না হলেও আমার যে করোনা হলো, সে জন্যও তো হতে পারে?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, কোভিডের জন্য হতে পারে, আমার যেমন চিকুনগুনিয়া হলো। আমার কোভিড অ্যাসিম্পটোম্যাটিক অনেকবার হলো। একবার আমি কক্সবাজার গেলাম এই ২০২২ সালে, কোভিড হলো। ঘ্রাণশক্তিটা একদম খারাপ হয়ে গেছে। পারফিউম লাগালেও এখন টের পাই না। খুব কড়া আতর লাগালে আমি বুঝতে পারি। আমি আসলে কড়া আতরই লাগাই আজকাল। কিন্তু সেটা তো একটা ছোট জিনিস। যদিও এটা নিয়েও আরও গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু যেটা বলতে চাচ্ছিলাম, রোগ হলে কিছু একটা হয়, যেমন আমার চিকুনগুনিয়া হলো। আমি এত কষ্ট কখনো পাইনি।

প্রশ্ন

চিকুনগুনিয়া যার হয়, তারা তো অনেক কষ্ট পায়—ব্যথা নাকি?

ফিরদৌসী কাদরী: না, এটার আফটার ইফেক্ট। হ্যাঁ, এখনো আমার ওপর এটার আফটার ইফেক্ট আছে। এ নিয়ে তো এখন অনেক পেপার বার হচ্ছে।

প্রশ্ন

আরেকটা প্রশ্ন, ডেঙ্গি যেটাকে বাংলাদেশে আমরা বলি ডেঙ্গু, এর কী হবে? আমরা কি এর কন্ট্রোল করতে পারব না?

 ফিরদৌসী কাদরী: ডেঙ্গু কন্ট্রোল করা কঠিন। তবে এর বিস্তার কমিয়ে রাখতে পারি। কারণ, এটার তো একটা ভেক্টর আছে। তার ওপর নালা–নর্দমায় পানি জমে থাকে। সিঙ্গাপুরের মতো দেশে যেখানে–সেখানে কেউ থুতু ফেলে না, কেউ ময়লা ফেলে না। ৫০ ডলার চার্জ করা হয় যদি কেউ কোথাও নোংরা করে। কোনো কনটেইনারে পানি আছে কি না, সেটার চেক করতে থাকে সবার বাড়িতে। যদি কারও বাড়িতে জমা পানি পায়, তাহলে তাঁকে ৫০০ ডলার দিতে হবে বা সামথিং লাইক দ্যাট। কিন্তু এখনো সিঙ্গাপুরে ডেঙ্গি হয়। আমার মেয়ে থাকে বলেই আমি জানি। ওর হাজব্যান্ডের খুব কড়াভাবে ডেঙ্গি হলো দু–তিন বছর আগে। আমি তাড়াতাড়ি সেখানে গেলাম হেল্প করার জন্য। সব সময় ওদের ইয়েলো জোন, রেড জোন, গ্রিন জোন থাকে। যেকোনো জোনে তারা থাকছে, চেঞ্জও হয়। কিন্তু দেখেন, সিঙ্গাপুরের মতো পরিষ্কার দেশ আমার মনে হয় না আর কোথাও আছে।

ফিরদৌসী কাদরী
প্রশ্ন

পরিষ্কার বলেই হয়তো ডেঙ্গি হচ্ছে। নোংরা হলে ম্যালেরিয়া হতো।

 ফিরদৌসী কাদরী: বাংলাদেশে কমিয়ে আনার চেষ্টা তো আছেই। সেখানেও ভ্যাকসিনের দরকার আছে। এবং আমাদের যে যতটুকু...

প্রশ্ন

 ডেঙ্গির ভ্যাকসিন কি আছে?

ফিরদৌসী কাদরী: ডেঙ্গির ভ্যাকসিন আছে। গবেষণা চলছে। আমরা আইসিডিডিআরবিতে এটা নিয়ে কিছু কাজ করছি এবং আপনাদের জানাব পরে। এবং ডেঙ্গির একটা ভ্যাকসিন আছে কিউডেঙ্গিয়া আর একটা আছে ডেংভ্যাক্সিয়া। তো ডেংভ্যাক্সিয়াটা এখন আর মনে হয় ব্যবহার হচ্ছে না; কারণ এটা শুধু কার্যকরী অতটুকু না এবং কিউডেঙ্গিয়াটা ছোট বাচ্চাদের দেওয়া যায় না। আমাদের যদি কারও ডেঙ্গি হয়েছে এবং সে তার অ্যান্টিবডি আছে সে কিন্তু ভ্যাকসিন নিতে পারবে।তার জন্য ছোট বয়সে দেওয়া নিষেধ এই ভ্যাকসিন। ছয়ের ঊর্ধ্বে দেওয়া হয়। তো এ জন্য আরকি একটু লিমিটেশন আছে।

প্রশ্ন

আপনারা গবেষণা করছেন তাহলে?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, গবেষণা আইসিডিডিআরবিতে হয়েছে এবং এখনো চলছে এবং আমরা আশাবাদী যে আমরা সামনে দু–তিন বছরের মধ্যে নিয়ে আসতে পারব।

প্রশ্ন

এখন যে আমরা আপনার হাজবেন্ডের কথা শুনছিলাম উনি মারা গেছেন ওনার নাম কী?

ফিরদৌসী কাদরী: সৈয়দ সালেহীন কাদরী।

প্রশ্ন

উনি কী করতেন?

ফিরদৌসী কাদরী: উনিও ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ছিলেন।

প্রশ্ন

কত সালে মারা গেলেন?

ফিরদৌসী কাদরী: এই যে ২০২১–এ। বেশি দিন আগে না। পাঁচ বছরও হয়নি। উনি কিন্তু কোভিডে মারা যাননি। নিউমোনিয়াতে মারা গেছেন।

প্রশ্ন

নিউমোনিয়াটা তো আরেকটা সমস্যা। এটা কী করব আমরা?

ফিরদৌসী কাদরী: নিউমোনিয়া নিয়ে তো আসলে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন এবং তারপর সেখান থেকে মাল্টিপল ইনফেকশন হলো।

প্রশ্ন

নিউমোনিয়ার তো টিকা আছে।

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, টিকা আছে।

আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ফেরদৌসী কাদরী
প্রশ্ন

এটা কি আমাদের দেওয়া উচিত সবার?

ফিরদৌসী কাদরী: সবার দেওয়া উচিত।

প্রশ্ন

এটা নিয়ে একটা ক্যাম্পেইন করবেন?

ফিরদৌসী কাদরী: নিউমোনিয়া তো বাচ্চাদের দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ইপিআইয়ে তো এটা একটা ইম্পর্ট্যান্ট টিকা।

প্রশ্ন

বাচ্চাদের দেওয়া হয়, এখন আমরাও দেব নাকি?

ফিরদৌসী কাদরী: দেওয়া উচিত। সরকার তো আর সবাইকে দিতে পারবে না। লোকালি ম্যানুফ্যাকচার্ড টিকা আছে। বাংলাদেশে তৈরি টিকা আছে, বাইরের টিকা আছে। আমি সব টিকা নিয়েছি নিউমোনিয়ার।

প্রশ্ন

আর আপনার সন্তান?

ফিরদৌসী কাদরী: আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। তিনজনই বাইরে আছে। বাংলাদেশে আমি একাই আছি আর সবাইকে নিয়ে-- সবাই আছে আমার।

প্রশ্ন

সবাইকে নিয়ে আছেন। দেশের জন্য গবেষণা করছেন এইখানে। এখানে আপনার গবেষণার সহযোগী কতজন? পাঁচ শ জন?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, পাঁচ শ জন মিনিমাম এখানে। আবার অনেক বেড়ে যায়, যখন একটা ট্রায়াল চলে তখন পাঁচ শ জন থেকে আরও বেড়ে যায়; আবার কমে যায়।

প্রশ্ন

আর আপনার নিজের প্রতিষ্ঠান যেটা, আপনার পুরস্কার পাওয়ার অর্থ দিয়ে করেছেন, সেখানে এক শ জনের মতো?

ফিরদৌসী কাদরী: এক শ জনের মতো এখন আছে।

প্রশ্ন

হ্যাঁ, আমি সম্প্রতি এই সান ফ্রান্সিসকোতে ইউনিভার্সিটি অব বার্কলিতে সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ আছে, এশিয়ান স্টাডিজ আছে, ওইখানে বাংলাদেশের ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ছিলেন উনি একটা প্রবন্ধ পড়লেন যে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন গবেষণা হয় না বা বাংলাদেশে কেন গবেষণা হয় না। তখন এই কথাটা উঠল যে বাংলাদেশে গবেষণা সবচেয়ে ভালো হয়েছে, যদি বলা যায় সেটা আইসিডিডিআরবিতে। এরপর হয়তো আমরা বলতে পারব কৃষিক্ষেত্রে হয়েছে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ওরা করেছে। কাজেই একদম হয় না তা না; কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হয় না বললেই চলে, তাই না?

 ফিরদৌসী কাদরী: এখন অনেক চেষ্টা করছে কিন্তু। আগের চেয়ে অনেক ভালো। আমি যখন ছিলাম তার চেয়ে এখন অনেক ভালো। ফান্ডিংও পাওয়া যাচ্ছে। বাইরের ফান্ডিংও আনছে। কিন্তু গবেষণা করার জন্য একটা পরিবেশ দরকার। আইসিডিডিআরবি আসলে আমার ইনস্টিটিউশন, আইদেশিও আমার ইনস্টিটিউশন। আইসিডিডিআরবিতে যা শিখেছি এবং যা দেখেছি আপনি দেখেন আমরা এখানে বসে আছি, কেউ আমাদেরকে বিরক্ত করছে না। আমরা সকালে আসি ঠিক, এই পরিবেশে আসি যাদের সঙ্গে কাজ করি তাদের সঙ্গে হাসিও; কাজও করি, ফুর্তিতেও থাকি। এবং এই যে পরিবেশটা আছে যে সবাই কাজ করছে, সবাই গবেষণা করছে; এই পরিবেশটা কিন্তু খুবই দরকার।

ফিরদৌসী কাদরী
প্রশ্ন

অন্যখানে যে নেই এটার কারণ কি এই যে আপনাদের নামের সঙ্গেই যে আইটা আছে, সে কারণে আপনারা বাংলাদেশের আমরা যেসব প্রাত্যহিক এর–ওর পেছনে লেগে থাকি এবং নানা ধরনের রাজনৈতিক কারণের মধ্য দিয়ে পরিবেশ নষ্ট করি, সেটা থেকে আপনারা মুক্ত আছেন নাকি?

ফিরদৌসী কাদরী: আমরা মুক্ত আছি অনেকখানি। আমাদের নিজেদেরও অনেক প্রবলেম থাকে, আমাদেরকে অনেক চিন্তা করতে হয়। সব সময় চিন্তা করতে হয় যে ফান্ডিং কী করে আনি। কারণ, আমি আজকে ফিরদৌসী কাদরী এখানে আছি, কালকে যদি আমার ফান্ডিং শেষ হয়ে যায়, বা কালকে আমি ফিরদৌসী কাদরী চলে যাব। তাই না?

প্রশ্ন

তো আপা আপনি তো বাংলাদেশে থেকে গেলেন। বিদেশের হাতছানি আপনাকে ডাকেনি?

ফিরদৌসী কাদরী: ডাকলেও যাইনি। আমি যখন প্রথম ফেরত এলাম আমি আর আমার হাজবেন্ড তখন তো অনেক সুযোগ ছিল। আমেরিকায় যাওয়া কেউ আসত না ফেরত। আমার যত বন্ধুবান্ধব আছে, সবাই, বান্ধবীরা সবাই বাইরে থেকে গেছেন। যারা কিছুই করেনি তারা ছিল বাকি। আমাদের মতো। যারা গবেষণায় ইন্টারেস্টেড ছিল না, চাকরিতে ইন্টারেস্টেড, তারা কিছু থেকে গেলেন এবং ওই সময় তো আরও বেশি লোকজন যেত। কিন্তু আমার কখনো বাইরে থাকতে ভালো লাগেনি। এবং আমি আমার সৌভাগ্য যে আমার হাজবেন্ডেরও ভালো লাগেনি। ওনার ফ্যামিলির অনেক দায়িত্ব ছিল; প্লাস উনিও মনেপ্রাণে বাংলাদেশের, উনি কিন্তু শিক্ষক ইন দ্য রিয়েল সেন্স। ওনার একাডেমিক লাইফটা ওনার জন্য খুবই ইম্পর্ট্যান্ট ছিল। আর আমার জন্য গবেষণাটা বেশি ইম্পর্ট্যান্ট ছিল। এবং বাইরে যাওয়ার কখনো লোভ করিনি। এখন বাচ্চারা সবাই বাইরে আছে, অনেকে এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করে যে তুমি তো এখন এখানে একা আছ, এখানে একা কেন থাকবা? ওদের কাছে গিয়ে থাকতে পারবা না? আমি বলছি জীবনে আল্লাহ যেন এ রকম দিন না দেয় যে আমাকে যেতে হয়। কারণ, ওরা তো ডাকবেই। প্লাস আমার এখানে অনেক ছেলেমেয়ে আছে। অনেক ফ্রেন্ডস আছে, পুরো বাংলাদেশে আমার আত্মীয়স্বজন ভর্তি। সবাই আমার আত্মার আত্মীয়। আমি আই এম সো আই এম সো ফুলফিলড সো হ্যাপি। আপনি জানেন আমি বাইরে গেলে চার দিন সহ্য করতে পারি, পাঁচ দিনের মাথায় আমার মনে হয় আমি যাব কখন বাসায়।

প্রশ্ন

এই যে আপনি গবেষক এবং আপনি বললেন বিদেশে থাকতে পারেন না এবং আপনি বললেন এমন দিন যেন না আসে আপনাকে আপনার সন্তানদের কাছে গিয়ে থাকতে হয়। এটার মধ্য দিয়েই কিন্তু আসলে একজন নারী গড়ে উঠবেন। মানে আমি বলি নারীকে শুধু মা হিসেবে বেশি আমরা মায়ের বেশি বন্দনা করে কিন্তু প্রত্যাশার চাপ চাপিয়ে দিই যে তুমি গবেষক হয়ো না তুমি মা হও। তার বদলে সবটা মিলিয়েই নারী; কিন্তু তার এই যে গবেষণা বা অন্য পেশাগত কাজ, যিনি লেখেন তিনি লেখক হবেন, যিনি ডাক্তার তিনি ডাক্তারি করবেন—এগুলো মিলিয়েই যে নারী সবাই নারী এবং পুরুষ সেটা নারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাই তো নাকি?

ফিরদৌসী কাদরী: হ্যাঁ, আমি এটা বিশ্বাস করি। আমি মনে করি যে আপনি যেটা বললেন যে নারী হিসেবে তো আমাকে মা হতে হয়েছে, আমি একজনের ওয়াইফও ছিলাম, আমার চাকরি আছে প্লাস আমার একটা লাইফ, আমার নিজের একটা লাইফ ছিল, সব সময় আমার আইসিডিডিআরবির লাইফ। আমি আবার খুব ক্লোজ সবার সঙ্গে। আমার ক্যারেক্টারিস্টিকস এ রকম যে যাদেরকে আমি মনে হয় যে না এর সঙ্গে আমার ওঠাবসা ডিফিকাল্ট হবে, আমি একটু দূরেই থাকি। আর বাদ বাকি সবার সঙ্গে আমি খুবই ক্লোজ। এবং শুধু আমার যে ইউনিট আছে, সেখানে না সব জায়গায়। আমি মানুষ ভালোবাসি। এবং আমি মনে করি একটা মেয়ের ওপর অনেক সময় অনেক অত্যাচার হয় এটা না? যে মানসিক অত্যাচার হয়। আপনি দেখেন বাংলাদেশে এবং বিশ্বে এখনো অনেকে স্টেমে কেউ কাজ করে না, মানে সায়েন্স টেকনোলজি ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যাথমেটিকসে মেয়েরা কম যাচ্ছে। মেয়েরা গিয়েও কিন্তু একটা জায়গায় এসে থেমে যাচ্ছে। এটা বাংলাদেশে অনেক বেশি হচ্ছে। মানে আমি কালকে নিউজপেপারে পড়ছিলাম আপনাদের প্রথম আলোতে অনেক ভালো ভালো ইনফরমেশন থাকে, আমি দুটি পত্রিকা নিই—ডেইলি স্টার আর প্রথম আলো। এখানে লেখা ছিল সত্তর পার্সেন্ট নারী বাচ্চা হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন বা চাকরিতে আর থাকেন না। এটা কত কঠিন ব্যাপার। এবং তাঁরা বাধ্য হন। আইসিডিডিআরবিতে একটা পরিবেশ আলাদা হয়েছে যে আমাদের একটা বাচ্চা রাখার জায়গা আছে এবং আমরা ভেতর থেকে সাহায্য করি। আমার আরেকটা কাজ হচ্ছে মেয়ে হিসেবে আমি মনে করি যে আমার একটা রোল মডেল হিসেবে আমাকে দেখে। আমার একটা রোল আছে, আমার একটা দায়িত্ব আছে। আমি ওদেরকে সব সময় আমার প্রবলেমের কথা বলি, আমি কি তিনটা বাচ্চা খুব ইজিলি মানুষ করেছি? না। হাজবেন্ড তো হাজবেন্ডই তাই না? ওনারা একটা আমাদের রোল মডেল আছে মেনদের জন্য, একটা উইমেনদের জন্য ঠিক না? এটা আমার ক্ষেত্রেও ঠিক ছিল; কিন্তু সাহায্য তো পেতেই হয়। আমাদের দুজনকে ঠিকমতো করে কাজ করতে হয়। কিন্তু এখন আমি যেটা দেখলাম যে আসলে মেয়েদের আরও ধাক্কা দিতে হবে, আরও সাহস দিতে হবে। এই যে যেমনি বাচ্চা হওয়ার কথা ওঠে, তখন অনেকে বলে এখন থাক, বাচ্চা নেব না। আর অনেকে বলে যে তারপর কী করব আর, বাচ্চা হয়ে গেছে সে চিন্তা করতে থাকে চাকরিটা ছেড়ে দেব। কারণ, আমি বাচ্চাকে কার কাছে রেখে আসব। এখন তো নানি–দাদিও বাসায় থাকেন না। কেয়ারগিভারের কাছে সবাই সাহস পায় না। তার জন্য আমি সাংঘাতিক চেষ্টা করি, একজন মেয়ে আছে আমাদের ইউনিটে, তার চারটা বাচ্চা আছে মাশা আল্লাহ। আমি ওকে এত এনকারেজ করি, এত এনকারেজ করি, কারণ সে এই চার বাচ্চা কাউকে এইখানে রাখছে ডে–কেয়ারে, অন্য আরেক জায়গায় রাখছে ডে–কেয়ারে; কিন্তু সে হানড্রেড পার্সেন্ট কাজ করে। দেরি করে থাকতে হলে সে থাকে। যত কাজ দেন, সে কাজ করতে রাজি আছে। শি ইজ স্পেকটাকুলার মানে আমি এটা বলতে পারি না, চাই না যে মেয়েদের অনেক বেশি কাজ করতে হবে, সবকিছু ছেড়ে কাজ করতে হবে; কিন্তু করতে হবে, এটা এক্সেপ্ট করতে হবে অ্যাজ আ ওম্যান ইউ হ্যাভ মেনি রোলস। ঠিক না? এটা আমরা বাদ দিতে পারব না। আমরা তো বলি আমরা সব কাজ একসঙ্গে করতে পারি। হুইচ ইজ ট্রু। আল্লাহ আমাদেরকে এই গুণটা দিয়েছেন। কিন্তু আমাদেরকে নিজের ওপর একটু মানে আমাদের যে ফ্যামিলিতে যারা আছেন, তাদেরকে আরেকটু দয়ালু হতে হবে এবং এখন আমার মনে হয় আগে থেকে একটু চেঞ্জ হয়েছে কিন্তু সব জায়গায় না। এখনই বলে এলাম গ্রামের অবস্থা খুবই খারাপ। নিউজপেপার পড়ে যা দেখলাম এবং যা দেখছি প্রতিদিন। শহরের অবস্থা খারাপ। আমি তো এখন বলি যে চার দেয়ালের ভেতরে কী হচ্ছে আমরা তো জানি না। একেবারেই জানি না। কিন্তু যত বলব তত মেয়েরা আরও বেশি উৎসাহ পাবে এবং ছেলেরাও। ছেলেরা কি উৎসাহ পাবে? তারা বুঝবে যে হ্যাঁ আমি একটা চাকরিজীবী মেয়েকে বিয়ে করব বা আমি একটা মেয়েকে সম্মান করব কাজে। এটা কিন্তু আমাদের আইসিডিডিআরবিতে খুব ভালোভাবে শেখানো হয়। খুবই ভালোভাবে শেখানো হয়। আমি মনে করি যে মেয়েরা আরও অনেক ওপরে উঠতে পারবে, বাংলাদেশের মেয়েরা। আরও ডে–কেয়ার দরকার, আরও সাপোর্ট দরকার। সেটা কিন্তু আস্তে আস্তে হচ্ছে। হচ্ছে না যে তা না, কিন্তু আরও বেশি করতে হবে।

প্রশ্ন

ঠিক আছে আপা, আমরা এই আশাবাদ দিয়ে শেষ করি যে বাংলাদেশের মেয়েরা অনেক দূর এগোবে; আরেকটু সাপোর্ট লাগবে আমাদের মনের মধ্যেও একটু বদলানো দরকার সমাজে পরিবর্তন হচ্ছে দুটি ফোর্সই আছে প্রগতিশীল–প্রতিক্রিয়াশীল এই দ্বন্দ্বে প্রগতিশীল এবং আমাদের নারী–পুরুষ সবাই মিলে আমরা এগিয়ে যাব। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

ফিরদৌসী কাদরী: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

প্রশ্ন

দর্শকমণ্ডলী আমরা ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানে আজকে গবেষক বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরীর কথা শুনলাম। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু ভেতরের খবর জানতে পারলাম আর জানতে পারলাম যে আমাদের মেয়েদেরকে কাজ করে যেতে হবে, গবেষণার মধ্যেও আসতে হবে, সবার একটা নিজের জীবনও থাকবে; কিন্তু আবার একটা কাজের জীবনও থাকবে। সবাই ভালো থাকবেন।