
দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের আত্মহত্যার ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ভুক্তভোগীর পরিবারের একটি আপসনামা আদালতে দাখিল করা হয়েছে গতকাল বুধবার।
আপসনামায় মরিয়মের বাবা ও মামলার বাদী এস এম মাসুম বিল্লাহ বলেছেন, আসামি গাজী নজরুল ও তাঁর (নজরুল) প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম জামিন পেলে কোনো আপত্তি নেই।
গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর বিরুদ্ধে এ মামলা আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে করা। এখন প্রশ্ন উঠেছে, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মতো ফৌজদারি অপরাধে বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে এমন আপসনামা কি মামলার আইনি পরিণতি বদলে দিতে পারে? এ ধরনের মামলায় আদৌ আপস-মীমাংসার সুযোগ আছে কি?
হত্যা, চুরি, ধর্ষণ, প্রতারণা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, বেআইনি সমাবেশের মতো অপরাধের অভিযোগে যেসব মামলা হয়, সেগুলো ফৌজদারি মামলা। এসব মামলায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে কারাদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা হতে পারে।
অন্যদিকে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অধিকার, সম্পত্তি, টাকাপয়সা বা চুক্তি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য যে মামলা হয়, তা দেওয়ানি মামলা। যেমন জমির মালিকানা, পাওনা টাকা বা সম্পত্তির ভাগ নিয়ে বিরোধ।
গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের উল্টো দিকের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর রাতেই গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদাকে হেফাজতে নেয় পুলিশ।
আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সেদিন রাতেই গাজী নজরুল, মাকসুদা ও নিহত নারীর মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ। এটি একটি ফৌজদারি মামলা।
আপস-মীমাংসা হলো বিবদমান পক্ষগুলোর সম্মতির ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি আইনি প্রক্রিয়া। তবে আইনবিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সব মামলায় আপসের সুযোগ নেই। কোনো অপরাধ আপসযোগ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত থাকে।
বাংলাদেশে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলা উভয় ক্ষেত্রেই আপস-মীমাংসার আইনগত বিধান রয়েছে।
ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধিতে কোন কোন অপরাধ আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যাবে, তার বিধান আছে। ধারা ৩৪৫ অনুযায়ী, সাধারণ আঘাত করা (দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারা), বেআইনিভাবে বাধা দেওয়া বা আটক রাখা (৩৪১ ও ৩৪২ ধারা), চুরি (৩৭৯ ধারা), প্রতারণা (৪১৭, ৪১৮ ও ৪১৯ ধারা), নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতারণা (৪২০ ধারা), মানহানি (৫০০ ধারা), ভয়ভীতি দেখানোসহ (৫০৬ ধারা) আরও কিছু অপরাধে আপস করা যায়।
এসব অপরাধের কোনো কোনোটি বাদী নিজেই আপস করতে পারেন। আবার কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন হয়।
দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৬ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি আত্মহত্যা করলে, তাঁকে কেউ আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিলে বা আত্মহত্যায় সহায়তা করলে সেই ব্যক্তির সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় আপসযোগ্য অপরাধগুলোর যে তালিকা রয়েছে, সেখানে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা নেই। ফলে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ ৩৪৫ ধারার অধীন আপসযোগ্য অপরাধ নয় বলে মত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হারুণ অর রশিদ।
আইনজীবী হারুণ অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনা আপসযোগ্য নয়। এ মামলায় বাদী যদি আসামির সঙ্গে আপস করেন, সেটা আদালত গ্রহণ করতে বাধ্য নন। আসামিকে জামিন দিতেও বাধ্য নন আদালত।
আইনজীবীরা বলছেন, আপসযোগ্য অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে মামলার উভয় পক্ষ আপসে যেতে চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে অথবা সরাসরি আদালতে আগ্রহ প্রকাশ করতে পারে।
উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে আপসের শর্ত নির্ধারণ করে লিখিত ‘আপসনামা’ তৈরি করবে। শর্তের মধ্যে ক্ষতিপূরণ, সম্পত্তি হস্তান্তর, ঋণ পরিশোধ, ব্যবসায়িক লেনদেন বা অন্যান্য সমাধানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
পরে আপসনামা আদালতে দাখিল করতে হবে। আদালত নিশ্চিত করবেন যে শর্তগুলো উভয় পক্ষের সম্মত ও আইনসংগত। আদালত উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে বা আইনজীবীর মাধ্যমে আপস প্রস্তাব গ্রহণ করবেন।
অনুমোদনের পর আপসনামা আইনি কার্যকারিতা পায়। আদালত আপস গ্রহণ করলে মামলা আপসনামার শর্ত অনুযায়ী নিষ্পত্তি হয়। এরপর মামলা আর চলমান থাকে না। একই সঙ্গে উভয় পক্ষের আইনি অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
যেমন কয়েক মাস আগে রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা রিফাত বিন জামানের মুঠোফোনটি চুরি হয়। মুঠোফোনে থাকা বিকাশ নম্বর থেকে ৮৫ হাজার টাকা বের করে নেয় চোর। পরে রিফাত রাজধানীর গুলশান থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) অনুসন্ধান চালিয়ে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করে। পরে বাদী ক্ষতিপূরণ পাওয়া সাপেক্ষে আদালতে মামলাটি আপস-মীমাংসা করেন।
দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে—এমন একটি লিখিত নথি আদালতে দাখিল করলেই মামলা আইনগতভাবে আপস হয়ে যায় না।
আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি মামলায় আপসের ক্ষেত্রে প্রথমে দেখতে হয়, সংশ্লিষ্ট অপরাধটি ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় আপসযোগ্য কি না।
আপসযোগ্য অপরাধ হলে আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আপসের মাধ্যমে মামলার নিষ্পত্তি হতে পারে। কিন্তু আপসযোগ্য নয়, এমন অপরাধে শুধু বাদীর সম্মতি বা আপসনামার ভিত্তিতে মামলা শেষ হয়ে যায় না।
গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের পরিবারের আপসের বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ ধরনের মামলায় আদালতে এসে বাদীর আপসনামা দেওয়ার সুযোগ নেই। মামলা দায়ের হওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত প্রতিবেদন দেবেন। আদালত কাকে জামিন দেবেন, কেন দেবেন, সেটা তাঁর নিজস্ব এখতিয়ার। বাদীর এ ধরনের দরখাস্তের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।’
আদালতে দাখিল করা আপসনামায় মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ উল্লেখ করেছেন, তাঁর মেয়ে গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকসুদার সঙ্গে ‘হৃদ্যতাপূর্ণ’ পরিবেশে সংসার করছিলেন।
আপসনামায় মাসুম বিল্লাহ বলেছেন, গাজী নজরুলের বাসায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটায় তিনি (বাদী) তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে (গাজী নজরুল) সন্দেহ করে মামলা করেছিলেন। পরে জানতে পারেন, গাজী নজরুল বা তাঁর প্রথম স্ত্রীর প্ররোচনায় কিংবা তাঁদের ওপর রাগ-অভিমান করে মরিয়ম আত্মহত্যা করেননি।
আপসনামায় আরও বলা হয়, বাদী ও আসামিপক্ষ আগে থেকেই আত্মীয়। উভয় পক্ষের মধ্যে শান্তি বজায় রাখা এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার জন্য তাঁরা আপস করেছেন।
আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় বাদী আপস করতে চান বা আসামির জামিনে আপত্তি নেই—এমন বক্তব্য আদালতের সামনে আসতে পারে। কিন্তু এর ফলে ৩০৬ ধারার অভিযোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। এ ক্ষেত্রে তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মামলার পরবর্তী সিদ্ধান্ত আদালতের মাধ্যমে হয় বলে জানান আইনজীবীরা।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান প্রথম আলোকে বলেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে আপস হলেও তার ভিত্তিতে আসামিকে জামিন দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আপস-মীমাংসার ঘটনাটি অভিযোগের সত্যতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
যদিও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আপসযোগ্য নয়, এমন অনেক মামলায় বাদী ও আসামিপক্ষ সমঝোতা করে ফেলে। তখন সাক্ষী অনুপস্থিত থাকে। দুর্বল সাক্ষ্য দেওয়া হয়। এতে অপরাধ প্রমাণ করা যায় না।
বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, একবার আপস হয়ে গেলে মামলার সাক্ষীরা তখন আর সত্যিকার অর্থে সাক্ষ্য দিতে চান না। এতে অনেক সময় মামলায় প্রভাব পড়ে।