কবি আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানকে নিয়ে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের বিশেষ প্রদর্শনী ‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি’ ঘুরে দেখেন অতিথিরা। বাঁ থেকে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট, নাসির আলী মামুন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক ফ্রাঁসোয়া শম্ভো, শিল্পী মনিরুল ইসলাম ও দর্শকেরা। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা, ৩ এপ্রিল
কবি আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমানকে নিয়ে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের বিশেষ প্রদর্শনী ‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি’ ঘুরে দেখেন অতিথিরা। বাঁ থেকে ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট, নাসির আলী মামুন, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক ফ্রাঁসোয়া শম্ভো, শিল্পী মনিরুল ইসলাম ও দর্শকেরা। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ধানমন্ডি, ঢাকা, ৩ এপ্রিল

প্রদর্শনী

আলোকচিত্রে দুই কবির অদেখা জীবন

পবিত্র রমজান মাস চলছিল তখন। ২০০৪ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিন। এক অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল রাজধানীর ৩/১ শ্যামলীর এক গৃহকোণে, মিলিত হয়েছিলেন সমকালীন বাংলা কবিতার দুই প্রধান কবি। মেঝেতে পাতা জায়নামাজে নামাজে দাঁড়িয়েছেন কবি আল মাহমুদ। আর ইফতারির থালা নিয়ে নিজ শয়নকক্ষের বিছানায় বসে কবি শামসুর রাহমান তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে। দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন ক্যামেরার কবি খ্যাত বিশিষ্ট আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন।

বাংলার কাব্যের দুই অনন্য কীর্তিমান কবির এমন অনেক দুর্লভ মুহূর্ত এবার দর্শকদের সামনে উন্মোচিত করলেন নাসির আলী মামুন তাঁর ‘ফটোজিয়াম: লাইফ অব পোয়েট্রি’ নামের প্রদর্শনীতে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রসেঁজের লা গ্যালারিতে শুরু হয়েছে এই দুই সপ্তাহের প্রদর্শনী। চলবে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে।

কবি শামসুর রাহমান ও কবি আল মাহমুদের কাব্যকৃতি নিয়ে যেমন কাব্যানুরাগী ও বিদগ্ধজনের মধ্য রয়েছে বিপুল মুগ্ধতা, তেমনি এই দুই কবির মধ্যে রাজনৈতিক বিশ্বাস, মত–পথ নিয়ে পারস্পরিক দূরত্বের বিষয়টিও অনেকে অনেক রকমভাবে ভেবে থাকেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ব্যাপারটা কেমন ছিল, সেদিকেই আলোকপাত করলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করে তিনি বলেন, ‘শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ নিজেরা নিজেদের মধ্যে যত না দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন, তার চেয়ে বেশি দূরত্ব তৈরি করেছি আমরা তাঁদের ভক্ত–অনুরাগীরা।’

আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের সঙ্গে প্রদর্শনী উদ্বোধন করছেন অতিথিরা

আলোচনার শুরুতে দুই কবির কাজের তুলনামূলক আলোচনা করে মতিউর রহমান বলেন, শামসুর রাহমান ঢাকা শহরে বেড়ে উঠছেন; নগরজীবন, নাগরিক চেতনা তাঁর কাব্যে নান্দনিকভাবে রূপায়িত হয়েছে। অন্যদিকে আল মাহমুদ এসেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্রাম থেকে। গ্রামীণ প্রকৃতি, প্রকৃতিলগ্ন মানবজীবনের মহিমাকেই তিনি তাঁর কবিতার অবলম্বন করে তুলেছেন। প্রথম দিকে তিনি প্রগতিশীল রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, পরে ধর্মীয় আধ্যাত্মিকতার আস্থাশীল হয়েছেন। অপর দিকে শামসুর রাহমান জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিকতাবাদ—এসব মতাদর্শ ধারণ করেছেন।

প্রথম আলো সম্পাদক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে তাঁরা দুজনই কবিতায় তাঁদের মতো করে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু আমরা কোনো বিশেষ কারণে তাঁদের মধ্যে পার্থক্য করে শামসুর রাহমানকে এগিয়ে রেখেছি। তাঁর প্রতি যতটা প্রশ্রয় ও পক্ষপাত করেছি, ততটা আল মাহমুদের ক্ষেত্রে করিনি।’

মতিউর রহমান আরও বলেন, এমন পক্ষপাত শিল্পকলার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান, মোহাম্মদ কিবরিয়ার প্রতি যেমন প্রাধান্য ও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; ততটা এস এম সুলতানের প্রতি দেওয়া হয়নি। তিনি মফস্‌সলে থাকতেন। তাঁকে একরকম আড়াল করার চেষ্টা তো ছিলই। এ ধরনের পক্ষপাত আসলে সার্বিক বিচারে আমাদের শিল্প-সাহিত্যের জন্যই ক্ষতিকর হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথম আলোতে আরও বেশি ভিন্নমত, যুক্তিতর্কের বিষয়কে উপস্থাপন করতে চাই। শুধু শিল্প–সাহিত্য ও সৃজনশীলতার জন্যই নয়; দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্যই এই মুক্ত পরিবেশ ও পরমতসহিষ্ণুতা প্রয়োজন।’

প্রদর্শনীর একটি ছবিতে আল মাহমুদ নামাজে দাঁড়িয়েছেন শামসুর রাহমানের শ্যামলীর বাসভবনের কক্ষে। ২০০৪ সালের অক্টোবরে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের তোলা।

আলোচনায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, নাসির আলী মামুন দীর্ঘদিন থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিকৃতির ছবি তুলছেন। কাজটি বেশ কঠিন। এটা কেবল ক্যামেরার শাটারে চাপ দেওয়া না। আলোকচিত্রের মাধ্যমে সেই ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করাটাই সার্থক পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফারের কৃতিত্ব। তিনি এ ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট বলেন, বাংলা সাহিত্যের দুই প্রধান কবির আলোকচিত্র নিয়ে এই প্রদর্শনীতে কবিতা, সাহিত্য ও আলোকচিত্রের মধ্য একটি নিবিড় সংযোগের সৃষ্টি হয়েছে।

নাসির আলী মামুন বলেন, তিনি স্বাধীনতার পর থেকেই এই দুই কবির সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। ক্যামেরা ছিল এই যোগাযোগের মাধ্যম। দেশে ও দেশের বাইরে, ভারতের শান্তিনিকেতনে তিনি এই দুই কবির সঙ্গে ভ্রমণ করেছেন। তিনি লক্ষ করেছেন, দুই কবির মধ্যে কথাবার্তা হতো না। তিনি তাঁদের মধ্য এই দূরত্ব ঘোচাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ২০০৪ সালে শামসুর রাহমানের বাড়িতে আল মাহমুদকে নিয়ে গিয়ে তাঁদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া আলোকচিত্র ফ্রেমবন্দী করছেন এক দর্শক

নাসির আলী মামুন বলেন, তাঁর কাছে আরও বহু দুর্লভ ছবি ও নিদর্শন রয়েছে। এগুলো নিয়ে তিনি ‘ফটোজিয়াম’ নামের একটি সংগ্রহশালা করতে চান। এ জন্য তিনি সবার সহায়তা কামনা করেছেন।

স্বাগত বক্তব্য দেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক সাঁজোয়া শম্ভো। তিনি বলেন, এ বছর আলোকচিত্রের ২০০ বছর পূরণ হচ্ছে। এমন একটি সময়ে বাংলাদেশের দুই প্রধান কবিকে নিয়ে এমন একটি ব্যতিক্রমী আলোকচিত্র প্রদর্শনী করতে পেরে তাঁরা আনন্দিত।

প্রদর্শনী দেখছেন একজন

দুই কবির দুই ভুবন

প্রদর্শনীতে আলোকচিত্র রয়েছে ৫৮টি। অধিকাংশই সাদাকালো। সেখানে দুই কবির তরুণ থেকে বৃদ্ধ বয়সের নানা রকমের প্রতিকৃতি রয়েছে। আছে অনেক ঘরোয়া জীবনের পরিবার–পরিজনের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সময় কাটানোর মুহূর্ত। ফলে দর্শকেরা দুই কবির বেড়ে ওঠার পাশাপাশি তাঁদের জীবনযাপনের বিষয়েও অনেক ধারণা পাবেন। শামসুর রাহমানের কবিতা, লেখা, চুল আঁচড়ানো, মুখে শেভিং ক্রিম মাখিয়ে ক্ষৌরকর্মের প্রস্তুতি, স্ত্রীর সঙ্গে পাশাপাশি বসে থাকা, রিকশায় পুরান ঢাকার রাস্তায়—এমন অনেক দৃশ্য দেখতে পাবেন দর্শকেরা।

আল মাহমুদকে পাওয়া যাবে তাঁর গ্রামে দেহাতি মানুষদের সঙ্গে, মমতাময়ী মায়ের নিবিড় সান্নিধ্যে, গভীর কাব্যভাবনায় গভীর নিমগ্ন হয়ে থাকার মুহূর্ত, স্ত্রী ও নাতি–নাতনিদের সঙ্গে পারিবারিক পরিবেশে।

প্রদর্শনীতে দর্শকেরা আরও দেখতে পাবেন দুই কবি একসঙ্গে মেতেছেন আড্ডায়, খাওয়াদাওয়া করছেন, করমর্দন করছেন পরস্পরের উষ্ণ হৃদ্যতায়। এই ছবিগুলো নতুন করে ফিরিয়ে আনবে তাঁদের অনুরাগীদের মনে। কবিরা সশরীর নেই কিন্তু তাঁদের কাব্যকৃতি মহাকালের পাতায় অক্ষয় হয়ে আছে।