
আট বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ, আয় ও কর্মী কয়েক গুণ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন ৬০ জন নারী-পুরুষ।
সিরাজুম মুনিরা ও ফেরদৌস আহমেদ—এই দম্পতির উভয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছিলেন। কিন্তু কর্মস্থলে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। তাই স্বাধীনভাবে কিছু করার তাগিদ থেকেই তাঁরা ব্যবসার সুযোগ খুঁজছিলেন।
বেশ কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত পাট ও সুতা নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। সেই ভাবনা থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে হস্ত ও কারুশিল্প, তাঁত ও বুটিকস পণ্যের কারখানা ও দোকান দেখেন। অবশেষে ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে যৌথ উদ্যোগে ‘সুতার কাব্য’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে যাত্রা শুরু করেন।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার রাজাবাসর গ্রামের একটি ভাড়া বাসায় মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি ও ২০ জন নারী কর্মী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় ‘সুতার কাব্য’র। আট বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ, আয় ও কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। বর্তমানে এখানে কাজ করছেন ৬০ জন নারী-পুরুষ। মোট বিনিয়োগ ইতিমধ্যে কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
সিরাজুম মুনিরা পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাতত্ত্ব বিভাগে। তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলায়। অন্যদিকে ফেরদৌস আহমেদ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর বাড়ি বরগুনা জেলায়।
ক্যাম্পাস জীবনের শুরু থেকেই তাঁদের মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে ওঠে, যা পরিণতি পায় বিয়েতে। পারিবারিক বন্ধন গড়ে তোলার পর এখন তাঁরা ব্যবসায়িক উদ্যোগে পরস্পরের সহযোগী।
► ১০ হাজার টাকায় শুরু, মাসে আয় ২০ লাখ টাকা। ► যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে পণ্য রপ্তানি।
২০০৭ সালে পড়াশোনা শেষ করে সিরাজুম মুনিরা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ফেরদৌস আহমেদ যোগ দেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে। বিয়ের পর তাঁরা দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায় স্থায়ী হন। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁদের ব্যবসার পথচলা।
সম্প্রতি পার্বতীপুরের রাজাবাসর গ্রামে অবস্থিত সুতার কাব্যর কারখানা ঘুরে দেখেন প্রথম আলোর প্রতিবেদক। সে সময় প্রতিষ্ঠানের যাত্রা, বর্তমান ব্যবসা পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন এই উদ্যোক্তা দম্পতি।
সিরাজুম মুনিরা বলেন, ‘চাকরির পাশাপাশি ভিন্ন কিছু করার আগ্রহ ছিল আমাদের। দেশীয় পণ্য দিয়ে পরিবেশবান্ধব শৌখিন কিছু করার কথা ভাবছিলাম। আমরা দুজনেই ভ্রমণ করতে পছন্দ করি। সেই সূত্রে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে হ্যান্ডিক্রাফট, তাঁত, বুটিকস ও কারুশিল্প পণ্যের দোকানগুলো দেখি। একপর্যায়ে স্থির করি, পাট ও সুতা নিয়েই কাজ করব।’
সিরাজুম মুনিরা জানান, ব্যবসা শুরু করলেও তখনো দুজনেই চাকরি করছিলেন। ঘুরতে ঘুরতে রংপুরের একটি হস্তশিল্প প্রতিষ্ঠানের কাজ তাঁদের ভালো লাগে। সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেন তাঁরা। পরে পার্বতীপুরে ফিরে স্থানীয় ২০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দেন।
২০১৭ সালের শেষে একটি বাসা ভাড়া নিয়ে মাত্র ১০ হাজার টাকার কাঁচামাল কিনে নকশিকাঁথা, শতরঞ্জি ও ফ্লোরম্যাট তৈরি শুরু হয়।
ব্যবসার শুরুতে এই দম্পতি স্থানীয় বাজার থেকে তেমন সাড়া পাননি। পরে ফেসবুকে একটি পেজ খুলে পণ্যের ছবি প্রচার শুরু করেন তাঁরা।
সিরাজুম মুনিরা বলেন, ‘যত সহজ ভেবেছিলাম, বাস্তবে কাজটি তত সহজ ছিল না। গ্রামে নারী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করতে নানা প্রতিবন্ধকতা ছিল। বাজার পাওয়া ছিল আরও কঠিন। তবে আমরা হাল ছাড়িনি।’
একদিন অনলাইনে চট্টগ্রামের এক ক্রেতার কাছ থেকে প্রথম পাঁচ হাজার টাকার পণ্য বিক্রির আদেশ পান। তাতেই তাঁদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে।
২০২২ সালে ভাড়া জায়গা ছেড়ে নিজেদের আয়ে কেনা জমিতে কারখানা গড়ে তোলেন তাঁরা। বর্তমানে অনলাইনের পাশাপাশি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অর্ধশতাধিক দোকানে পাইকারিতে পণ্য সরবরাহ করছে সুতার কাব্য। এতে প্রতি মাসে গড়ে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা আয় হচ্ছে বলে জানান তাঁরা।
বর্তমানে ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে সুতার কাব্যের পণ্য বিক্রি হচ্ছে। এখন ঢাকায় নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্র খোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।
রাজাবাসর গ্রামের নিরিবিলি পরিবেশে ৯ হাজার বর্গফুটের আধা পাকা টিনশেড কারখানায় চলছে তাঁদের উৎপাদন কাজ। ভেতরে সারি সারি ৪০টি তাঁত মেশিন ও ১০টি সেলাই মেশিন। সুতা, পাট ও হোগলাপাতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে গৃহস্থালির নানা শৌখিন পণ্য।
কারখানার পাশে ৯০০ বর্গফুটের একটি বিক্রয়কেন্দ্রে সাজানো রয়েছে ফ্লোরম্যাট, প্লেসম্যাট, ফ্লোররাগ, টেবিলরানার, শতরঞ্জি, ওয়ালহ্যাঙ্গিং, প্ল্যান্ট বাস্কেট, লন্ড্রি বাস্কেট, গ্লাসকোস্টার, কুশন কাভার, অ্যাপ্লিক বেড কাভার, বুকমার্ক, কিডসরাগ ও টাফটিং রাগসহ নানা পণ্য।
সুতার কাব্যে নারী শ্রমিকদের সংখ্যাই বেশি। সিরাজুম মুনিরা জানান, এই কয়েক বছরে বিনা মূল্যে পাঁচ শতাধিক নারী ও পুরুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
সুতার কাব্যের বুনন কাজে যুক্ত বিউটি বেগম বলেন, ‘দুই মাস প্রশিক্ষণের পর কাজ শুরু করি। প্রায় তিন বছর ধরে এখানে আছি। মাসের বেতনে সংসারের খরচ ও ছেলের পড়াশোনা চলছে।’
পাটভিত্তিক টেকসই পণ্য উৎপাদন, নারীর কর্মসংস্থান ও স্থানীয় কারুশিল্পকে বৈশ্বিক বাজারে পরিচিত করার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে জাতীয় এসএমই মেলায় সুতার কাব্য শ্রেষ্ঠ পাটজাত পণ্যের স্টলের পুরস্কার পায়।
এ ছাড়া ২০২২ সালে ডিএইচএল-ডেইলি স্টার বাংলাদেশ বিজসেন অ্যাওয়ার্ড, ২০২৩ সালে উপজেলা শ্রেষ্ঠ নারী উদ্যোক্তা পুরস্কার এবং ২০২৫ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন থেকে সেরা নারী উদ্যোক্তার পুরস্কার পান সিরাজুম মুনিরা।
ফেরদৌস আহমেদ বলেন, নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে সুতার কাব্য আজ এই জায়গায় এসেছে। গুণগত মান ও শৈল্পিক দিকের ওপর সব সময় বিশেষ নজর দিতে হয়। তবে মানুষের রুচির পরিবর্তন হচ্ছে, দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
ফেরদৌস আহমেদ আরও বলেন, ‘নিজেরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি অনেকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারাই আমাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য।’