নতুন উদ্যোক্তাদের রপ্তানি সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন এক্সপোর্ট সেবার প্রতিষ্ঠাতা জাহিদ হোসেন।
নতুন উদ্যোক্তাদের রপ্তানি সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন এক্সপোর্ট সেবার প্রতিষ্ঠাতা জাহিদ হোসেন।

রপ্তানির পথ সহজ করছে ‘এক্সপোর্ট সেবা’

পণ্য রপ্তানি করতে দেশের উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ, মালামাল পরিবহন ও সরবরাহ পর্যন্ত নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। তা ছাড়া বিদেশি বাজার এবং ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ ও পণ্যের দাম নির্ধারণের ঝক্কিও কম নয়। তাই নতুন উদ্যোক্তাদের পক্ষে এসব কাজ গুছিয়ে করা খুব কঠিন। এ কারণে অনেক সময় ভালো পণ্য তৈরির পরও রপ্তানি বাজারে ভালো করতে পারেন না অনেক উদ্যোক্তা। নতুন এসব উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিচ্ছে ‘এক্সপোর্ট সেবা’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, যাঁদের ১০ শতাংশ বা হাজারের বেশি উদ্যোক্তা এখন নানা ধরনের পণ্য রপ্তানি করছেন। অনেকে রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এ ছাড়া করপোরেট গ্রাহকদেরও পরামর্শ–সহায়তা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। এ পর্যন্ত ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ‘এক্সপোর্ট সেবার’ মাধ্যমে ১৭টি দেশে ১২ শতাধিক পণ্য রপ্তানি করেছে।

যেভাবে যাত্রা শুরু

রপ্তানিকারকদের সহায়তা দিতে ৪ বছর আগে ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন জাহিদ হোসেন নামের এক উদ্যোক্তা। নিজে এই প্রতিষ্ঠান তৈরির আগে একাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে রপ্তানি দলের প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। রপ্তানি এ খাতে তাঁর রয়েছে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০২২ সালে নিজেই গড়ে তোলেন এক্সপোর্ট সেবা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১০ জন কর্মী কাজ করছেন।

সম্প্রতি এক্সপোর্ট সেবা নিয়ে কথা হয় জাহিদ হোসেনের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে জানতে পারলাম রপ্তানির জন্য প্রাথমিক সনদ বা নিবন্ধন কীভাবে নিতে হয়, সেই ধারণায় নেই বেশির ভাগ উদ্যোক্তার। কৃষি, পাট ও হস্তশিল্পের মানসম্মত পণ্য থাকার পরও অনেক উদ্যোক্তা তাই রপ্তানিও করতে পারছেন না। অথচ বিদেশে এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই এসব উদ্যোক্তাদের কথা ভেবে রপ্তানি সেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিই।’

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘রপ্তানিপ্রক্রিয়াকরণের সব ধাপ একটি ওয়েসসাইটের মাধ্যমে বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। সে জন্য এসএমই ফাউন্ডেশন, ইপিবি এবং ব্র্যাকের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার পরিকল্পনা করছি।’ পণ্য পরিবহন এবং লাইসেন্স নিতে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি চ্যালেঞ্জে পড়েন বলে জানান তিনি।

যেভাবে সেবা মিলবে

একদম নতুন উদ্যোক্তারা প্রতিষ্ঠানটি থেকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে রপ্তানিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পান। আর যাদের পণ্য রপ্তানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে, তাদের জন্য বিদেশি ক্রেতা ঠিক করে দেওয়া, লাইসেন্স এবং কাগজপত্র ঠিক করা থেকে পণ্য পাঠানো এবং রপ্তানি আয় নিয়ে আসা পর্যন্ত সব ধরনের সেবা দেওয়া হয়। অর্থাৎ ‘এক্সপোর্ট সেবা’ রপ্তানি ব্যবস্থাপক হিসেবে সব দায়িত্ব পালন করে।

প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। যেমন ৩ হাজার টাকা ফিতে রয়েছে ৫ দিনের অনলাইন প্রশিক্ষণ। আর ১০০ দিনের মেন্টরশিপের মাধ্যমে সরাসরি রপ্তানিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও রয়েছে। সে ক্ষেত্রে খরচ ২৫ হাজার টাকা। আর ৬ মাসের একক সেবা নিতে গুনতে হবে ৯০ হাজার টাকা। আর সারা বছর প্রতিষ্ঠানটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সেবা দেয় ৬ লাখ টাকা খরচে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই মাশুল ১২ লাখ টাকা। মূলত পাট, চামড়া ও হস্তশিল্প পণ্য এবং ফল, মাছ, মসলাপণ্য রপ্তানিতে প্রয়োজনীয় সেবা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

* এ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ* প্রশিক্ষণ শেষে রপ্তানি করছে হাজারের বেশি উদ্যোক্তা* ৩ থেকে ৯০ হাজার টাকার প্রশিক্ষণ* ৫০টির বেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠান সেবা নিয়েছে* ভবিষ্যতে রপ্তানি নিয়ে ফ্রি প্ল্যাটফর্ম করার চিন্তা

প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, কৃষিপণ্যের প্রধান গন্তব্য মধ্যপ্রাচ্য ও আশিয়ানভুক্ত দেশগুলো। আর হস্তশিল্প বেশি যায় ইউরোপের দেশগুলোয়। সৌদি আরবেও নতুন বাজার তৈরি হচ্ছে।

এক্সপোর্ট সেবার ব্যবসা উন্নয়নবিষয়ক ব্যবস্থাপক জাবের অঙ্কুর প্রথম আলোকে বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণকে সবচেয়ে বড় সমস্যা মনে করেন উদ্যোক্তারা। কৃষি পণ্য রপ্তানিতে প্যাকেজিং করাটাও একটি বড় সমস্যা। রপ্তানি করতে গেলে প্রাথমিকভাবে ট্রেড লাইসেন্সসহ কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকতে হয়। এ ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী সংগঠনের সদস্য হলে রপ্তানি করা সুবিধা। এ ছাড়া আরও বিভিন্ন ধরনের কাগজপত্র লাগে। সব মিলিয়ে ৮ থেকে ১০ ধরনের কাগজপত্র লাগে। এসব বিষয়ে উদ্যোক্তাদের নানাভাবে সহায়তা করা এক্সপোর্ট সেবা।

সাভারের বাসিন্দা মো. শামীম কৃষিপণ্য রপ্তানির চিন্তা থেকে গত সেপ্টেম্বর মাসে এক্সপোর্ট সেবা থেকে অনলাইনে একটি কোর্স করেছেন, যার মাধ্যমে রপ্তানিপ্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পান তিনি। তবে এখনো রপ্তানি শুরু করতে না পারলেও নেপালে আলু রপ্তানি করার চেষ্টা করছেন বলে তিনি জানান।

সফল হয়েছেন যাঁরা

হস্তশিল্প পণ্যের প্রতিষ্ঠান গনি ক্রিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজুল গনি। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠান জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানি করছে। এক্সপোর্ট সেবার প্রশিক্ষণ থেকে তিনি রপ্তানির ধারণা নিয়েছিলেন। পরে ২০২২ সালে প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের ক্রয়াদেশ পান। প্রথম আলোকে এই উদ্যোক্তা জানান, ‘২০১৫ সাল থেকেই আমরা কাজ শুরু করি। ২০১৯ সালে ট্রেড লাইসেন্স করি। পরে রপ্তানির চিন্তা করতেই এক্সপোর্ট সেবার একটি বিজ্ঞাপন দেখি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেখান থেকে প্রথমে ৫০০ টাকার এবং পরে ৫ হাজার টাকার দুটি প্রশিক্ষণ নেই। তারপরেই রপ্তানি শুরু করেছি।

একইভাবে নূরানী অ্যাগ্রো এবং ট্রাস্ট অ্যাগ্রোর মতো অনেক প্রতিষ্ঠান বিদেশে পণ্য রপ্তানি করছেন এক্সপোর্ট সেবা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে। ইতালিতে কাঁঠাল রপ্তানি করছেন রবিন হোসেন নামের আরেক উদ্যোক্তা। এসব উদ্যোক্তা এক্সপোর্ট সেবা থেকেই রপ্তানির প্রশিক্ষণ নিয়ে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।

দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ, ঋণ দেওয়া এবং বাজার–সুবিধা নিয়ে কাজ করে এসএমই ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতেও কাজ করেন এক্সপোর্ট সেবার জাহিদ হোসেন।