বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন তৈরির স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন লিমিটেডের চার প্রতিষ্ঠাতাসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা
বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন তৈরির স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন লিমিটেডের চার প্রতিষ্ঠাতাসহ অন্য শীর্ষ কর্মকর্তারা

বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার

চার্জিং স্টেশন তৈরির উদ্যোগে সফল স্টার্টআপ ‘ক্র্যাক প্লাটুন’

বিশ্বের উন্নত দেশে দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে। সেই তুলনায় দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে ধীরে। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি ক্রেতাদের কম আগ্রহের বড় কারণ বেশি দাম ও চার্জিং অবকাঠামোর ঘাটতি। বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং–সুবিধা তৈরিকে তাই বড় ব্যবসায়িক সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে এ খাতে কাজ শুরু করেছে একটি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান।

বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন লিমিটেড নামে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসায়ীদের চাহিদার ভিত্তিতে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের কাজ করছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি র‍্যানকন মোটরস, ডিএইচএস মোটরস ও র‍্যানকন ব্রিটিশ মোটরসের সঙ্গে যৌথভাবে দেশের ১৭টি স্থানে মোট ৩০টি বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশন চালু করেছে। এসব স্টেশনে একসঙ্গে ৫০টি গাড়ি একসঙ্গে চার্জের  সুবিধা রয়েছে। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাজশাহী, বগুড়াসহ অন্যান্য বড় শহরে এসব চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের বেশ কিছু স্থানেও  চার্জিং স্টেশন চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানটি এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০২৭ সালের মধ্যে সারা দেশে র‍্যানকনের মোটরস, ডিএইচএস মোটরস ও র‍্যানকন ব্রিটিশ মোটরসের সঙ্গে প্রায় ২০০ চার্জিং স্টেশন স্থাপনের চুক্তি করেছে ক্র্যাক প্লাটুন।

জানা যায়, দেশে প্রথম বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশন (ইভি চার্জিং) স্থাপন করা হয় ২০২৩ সালের আগস্টে। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) সহায়তায় প্রোগরেস মোটর ইমপোর্টস লিমিটেড রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রথম বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশন চালু করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু

২০২২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ক্র্যাক প্লাটুন। তবে এটি গল্প শুরু হয় তারও আগে। ২০১৫ সালে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) একদল তরুণ শিক্ষার্থী সহপাঠ্য কার্যক্রমের (কো–কারিকুলাম) অংশ হিসেবে অটোমোবাইল দল ‘টিম ক্র্যাক প্লাটুন’ গড়ে তোলে। এ দলে অনেকের মধ্যে ছিলেন চার তরুণ ফারহান খলিল, মো. তানভীর শাহরিয়ার, মো. মুসা মাহমুদ রানা ও আবু মুছাইব খান। পরে এই চার তরুণ মিলে গড়ে তোলেন ক্র্যাক প্লাটুন। ২০১৭ সালে জাপানে শিক্ষার্থীদের ফর্মুলা গাড়ির তৈরির প্রতিযোগিতা ‘ফর্মুলা স্টুডেন্ট জাপানে’ অংশ নেয় দলটি। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে অংশ নেওয়া প্রথম দল ছিল তারা। ২০১৯ সালে দলটি আবারও জাপানের ফর্মুলা স্টুডেন্ট জাপান প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। সেখানে স্থানীয় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের জন্য দলটি পায় বিশেষ সম্মাননা। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষে দলটির বেশির ভাগ সদস্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি শুরু করেন।

তবে ফারহান খলিল, তানভীর শাহরিয়ার, মুসা মাহমুদ খান ও আবু মুছাইব খান চাকরির পাশাপাশি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নাম দেন ক্র্যাক প্লাটুন চার্জিং সলিউশন। ২০২২ সালে তারা চার্জিং স্টেশনের জন্য অ্যাপ ও হার্ডওয়্যার তৈরি নিয়ে গবেষণা করেন। তারপর নিজেদের এই ধারণা বাস্তবায়নে স্টার্টআপ বাংলাদেশ নামে সরকারি তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ পান। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটির নিবন্ধন নেন। ২০২২ সালেই চাকরি ছেড়ে তারা পুরোপুরি ব্যবসায় মন দেন। শুরুতে মো. তানভীর শাহরিয়ারের মোহাম্মদপুরের বাসাই ছিল প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়। ২০২৩ সালে ৩০ লাখ টাকার অ্যাঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট বা বিনিয়োগ পায় স্টার্টআপটি। পাশাপাশি নিজেরা ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন। বিনিয়োগের বেশির ভাগ অর্থ ব্যয় হয় নিজস্ব ক্লাউড ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ও অ্যাপ তৈরিতে। এই অ্যাপের মাধ্যমে দেখা যাবে, কখন ও কোথায় চার্জিং স্টেশন খালি রয়েছে। এই অ্যাপের নাম ‘চার্জ ইজি’। অ্যাপে রয়েছে একটি ডিজিটাল ওয়ালেট, যেখানে বিকাশ, নগদ বা কার্ড দিয়ে রিচার্জ করা যায়। এ ছাড়া অ্যাপটিতে স্মার্ট নেভিগেশন, প্রি বুকিং সুবিধাও রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা জানান, এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির যে আয়, তা দিয়ে পরিচালন খরচ উঠছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মসংস্থান হয়েছে ২৩ জনের। স্টার্টআপটির উদ্যোক্তারা জানান, দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় ফিরতে কিছুটা বাড়তি সময় লাগছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা যত বাড়বে, প্রতিষ্ঠানটির আয়ও তত বাড়বে। চলতি বছরের মধ্যে স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানটি মুনাফায় আসার আশা করছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে পুরোপুরি বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির সংখ্যা এক হাজারের মতো। আর বৈদ্যুতিক ও জ্বালানি–চালিত উভয় সুবিধা রয়েছে, এমন গাড়ির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। দেশে বর্তমানে ৮ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

২০২৩ সালে সরকারি দরপত্রের মাধ্যমে পিডিবি, পল্লী বিদ্যুৎ ও ডেসকোর জন্য নারায়ণগঞ্জ, ভালুকা, কুমিল্লা ও ঢাকায় মোট পাঁচ জায়গায় চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হয়। এরপর ২০২৪ সালে দেশে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য চুক্তি হয় মার্সিডিজ বেঞ্জের পরিবেশক র‍্যানকন মোটরসের সঙ্গে।

ক্র্যাক প্লাটুনের ব্যবসা উন্নয়নবিষয়ক পরিচালক মো. মুসা মাহমুদ রানা বলেন, দেশে আমদানি করা পেট্রোলিয়ামের প্রায় ৫৪ শতাংশ ব্যবহার হয় অটোমোবাইল খাতে। প্রচলিত ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ। তার বিপরীতে বৈদ্যুতিক গাড়ির ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা ৮০ থেকে ৯২ শতাংশ। জ্বালানি চালিত গাড়িতে যেখানে প্রতি কিলোমিটারে ৮ থেকে ১০ টাকা ব্যয় হয় সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়িতে খরচ হয় ২ টাকা।

প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তারা জানান, যে কেউ চাইলে বাসায় ও বাণিজ্যকভাবে চার্জিং স্টেশন স্থাপন করে দেয় তারা। বাসায় চার্জিং স্টেশন স্থাপনে জন্য খরচ ১ থেকে ৩ লাখ টাকা। আর বাণিজ্যকভাবে চার্জিং স্টেশন স্থাপনে খরচ ৪০ থেকে ৮০ লাখ টাকা।

ক্র্যাক প্লাটুনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তানভির শাহরিয়ার বলেন, বর্তমানে হোটেল র‍্যাডিসন ব্লু, দুসাই রিসোর্ট ও স্পা, দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টসহ বেশ কিছু হোটেল এবং অভিজাত এলাকায় মার্সিডিজ বেঞ্জের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে চার্জিং স্টেশন বসানো হয়েছে। এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে র‍্যানকনের মোটরস, ডিএইচএস মোটরস ও র‍্যানকন ব্রিটিশ মোটরসের সঙ্গে মিলে সারা দেশে ২০০টি চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।