
কৃষিতেই সম্ভাবনা—এমন বিশ্বাস থেকে ২১ বছর বয়সে ব্যবসা শুরু করেন রংপুরের উদ্যোক্তা গাউসুল আজম। ২০১৭ সালে অনলাইনে ছবি ও ভিডিও দিয়ে কৃষিযন্ত্র বিক্রি শুরু করেন তিনি। এ পর্যন্ত দেশের সব জেলার ৪০ হাজারের বেশি কৃষকের কাছে কৃষিযন্ত্র বিক্রি করেছেন এই উদ্যোক্তার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান কৃষি বাজার লিমিটেড। ৩৫০ ধরনের বেশি কৃষিযন্ত্র ও পণ্য বিক্রি করে এই প্রতিষ্ঠান।
এ ছাড়া দেশের চার জেলায় ১ হাজার ৮০০ একর ভূমিতে ভুট্টা ও আলুর চুক্তিভিত্তিক চাষ করছে গাউসুল আজম। সব মিলিয়ে ১ হাজার ১১৫ কৃষক এই চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সেই সঙ্গে সরকারের তিন প্রকল্পের আওতায় বেসরকারি অংশীদার হিসেবে প্রায় আট হাজারের বেশি কৃষককে কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিয়েছে কৃষি বাজারের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘কৃষকের স্কুল’।
একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিওর সহায়তায় ১২৯ কৃষকের ফার্মার হাব বা নার্সারির ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছে কৃষি বাজার। এসব কৃষককে চারা উৎপাদনে বীজ ও সারসহ সব উপাদান সরবরাহ করে কৃষি বাজার। উৎপাদিত চারা অনলাইনে বিক্রি করার সেবাও দেয় এ প্রতিষ্ঠান।
চলতি বছর থেকে কৃষি বাজার কৃষি বর্জ্য (কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ ও ভুট্টার গাছ ইত্যাদি) দিয়ে তৈরি জ্বালানি পণ্য তৈরি শুরু করেছে। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কৃষি খড়ি’। এই খড়ি বাসাবাড়ির রান্নার কাজে ব্যবহার করা যাবে। রান্নায় প্রাকৃতিক গ্যাসের তুলনায় অর্ধেকের কম খরচ পড়বে তাতে। আর গোবর থেকে জৈবসার বানাতে তৈরি করেছে ডি ওয়াটারিং যন্ত্র। সব উদ্যোগ মিলিয়ে বর্তমানে এই উদ্যোক্তা বছরে ব্যবসা করেন প্রায় ১০ কোটি টাকার। ২১ বছর বয়সে ব্যবসা শুরু করা গাউসুল ২৯ বছর বয়সে এসে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
২০১৪ সালে গাউসুল আজম রংপুর পলিটেকনিক্যালে ডিপ্লোমা করতে তড়িৎ ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগে ভর্তি হন। টাকার অভাবে ২০১৭ সালে ফাইনাল পরীক্ষা দেওয়া হয়নি তাঁর। এরপর একদিন গাইবান্ধা জেলায় গ্রামীণফোনের ‘জিপি এক্সিলারেটরে’ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। উদ্দেশ্য ছিল প্রশিক্ষণ থেকে কিছু অর্থ পাওয়া যায় যদি। অথচ সেই প্রশিক্ষণই বদলে দেয় তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রশিক্ষণে পরিচয় হয় ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। চীন থেকে ‘হ্যান্ড রিপার’ (ধান বা শস্য কাটার যন্ত্র) আমদানি করতেন ময়মনসিংহের বাসিন্দা ইকবাল হোসেন। পরিচয়ের পর গাউসুল আজমও এই কৃষিযন্ত্র বিক্রিতে আগ্রহী হন। সেই আগ্রহ থেকে যন্ত্রটির ভিডিও সামাজিক যোগযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করে যন্ত্রটি বিক্রির উদ্যোগ নেন। সে সময় ধান কাটার মৌসুম হওয়ায় ব্যাপক সাড়াও পান তিনি। প্রথম ক্রয়াদেশ পান সিলেট থেকে। তাতে দেড় হাজার টাকা লাভ করেন। এভাবে কয়েক মাসে ফেসবুকে ভিডিও প্রচার করে প্রায় ধান কাটার ৮০টি যন্ত্র বিক্রি করেন। ফেসবুক পেজের নাম দেন ডিজিটাল মার্কেটিং ফর রুরাল এন্টারপ্রাইজ। তবে এই নাম কিছুটা কঠিন হওয়ায় কৃষকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। তাই পেজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন কৃষি বাজার।
একপর্যায়ে যন্ত্রের মজুত শেষ হয়ে যায়। তাই বিনিয়োগকারী ও আমদানিকারক খুঁজতে শুরু করেন। দুজন বিনিয়োগকারীও পেয়ে যান। বর্তমানে কৃষি বাজারে ১৬ জন আমদানিকারক ও বিনিয়োগকারী রয়েছেন। ২০১৮ সালে কৃষি বাজার নামে নতুন ওয়েবসাইট চালু করেন। সে সময় হাতে চালানো যায়, এমন পাওয়ার টিলার আমদানি করতেন গাউসুল আজম। এক মাসে প্রায় ৫০০টি পাওয়ার টিলার বিক্রি করেন। এরপর ২০১৮ সালে স্ত্রী রাজিয়া সুলতানাকে ব্যবসায় যুক্ত করেন। রংপুর শহরে রাধাবল্লভ এলাকায় নেন এক রুমের ভাড়া অফিস। শুরুতে স্বামী–স্ত্রী ও আরেক কর্মীসহ মোট তিনজন মিলে শুরু করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৫৫ জন কর্মী কাজ করছেন। এ ছাড়া রাধাবল্লভ এলাকায় ১০ শতাংশ জমিতে একটি পণ্যভান্ডার (ওয়্যারহাউস) ও বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।
কৃষি বাজারের উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাউসুল আজম বলেন, ব্যবসা সম্প্রসারণে ২০২২ সালে যন্ত্রের সরাসরি সার্ভিসিং সেবা চালু করা হয়। প্রয়োজনে গ্রাহকদের ভিডিও কলে সেবা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। সব মিলিয়ে প্রতি মাসে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকার কৃষিযন্ত্র বিক্রি হয়।
২০২৪ সালের শুরুতে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের দুই প্রকল্পের আওতায় কৃষি বাজার কৃষকদের কৃষিযন্ত্র ও আধুনিক কৃষির ওপর প্রশিক্ষণ শুরু করে। গত দেড় বছরে এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় আট হাজারের বেশি কৃষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ২০২৪ সালে এ প্রকল্পের বেসরকারি অংশীদার হিসেবে সেবা দিচ্ছিল গাউসুল আজম। পরবর্তী সময়ে সরকারের আরেকটি প্রকল্পে যুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি।
কৃষকদের সেবা দিতে তাই কৃষি বাজারের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান ‘কৃষকের স্কুল’ চালু করা হয়। এই কার্যক্রমের জন্য রংপুরের কদমতলা বাজারে প্রায় চার একর জমি ইজারা নেওয়া হয়। সেখানে কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র চালু করেন এই উদ্যোক্তা। গাউসুল আজম বলেন, গুড অ্যাগ্রিকালচার প্র্যাকটিস সম্পর্কে কৃষকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্যই গবেষণাকেন্দ্রটি চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃষকের স্কুল থেকে ৮৫টি কৃষিপণ্য চাষের ওপর অনলাইন ভিডিও তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে কৃষি বাজার কন্টাক্ট ফার্মিং বা চুক্তিভিত্তিক আলুর চাষ শুরু করে। সেবার নীলফামারীর জলঢাকা এলাকার ৩৪০ জন কৃষককে নিয়ে সাড়ে ৭০০ একর জমিতে আলু চাষ করেন গাউসুল আজম। আর রংপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট—এই তিন জেলায় প্রায় ৭৭৫ জন কৃষককে নিয়ে ১ হাজার ৪৮ একর জমিতে ভুট্টা চাষ করেন তিনি।
মূলত এসব জমিতে প্রসেস পটেটো (চিপসের আলু) চাষ করা হয়। চুক্তিভিত্তিক চাষের আওতায় কৃষককে বীজ, সার ও কীটনাশকসহ সব ধরনের সেবা দেয় কৃষি বাজার। এ ছাড়া কৃষকদের ঋণ নিতে জামিনদারও হয় এই প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ঢাকা ব্যাংকের সঙ্গে যৌথভাবে এই ঋণসুবিধা দিয়ে আসছে কৃষি বাজার। আর এসব কৃষকের কাছ থেকে ভুট্টা কিনে বিক্রি করে কৃষি বাজার। মৌসুমে প্রায় সাত কোটি টাকার ভুট্টা বিক্রি করেন এই উদ্যোক্তা।
গাউসুল আজম বলেন, প্রায়ই শোনা যায় কৃষক শস্য উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন না। তাই আমরা চুক্তিভিত্তিক চাষ শুরু করেছি। চলতি বছর থেকে কৃষি বর্জ্য (কাঠের গুঁড়া, ধানের তুষ, ভুট্টার গাছ ইত্যাদি) থেকে ‘কৃষি খড়ি’ তৈরির কাজ করছি। এই খড়ি গ্যাসে রান্নার খরচের চেয়ে ৫০ শতাংশ খরচ কমাবে। এ ছাড়া ডি-ওয়াটারিং যন্ত্রের মাধ্যমে জৈব সার তৈরি করছি আমরা।