
বাড়ির দরজা-জানালা কিংবা আসবাব তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় দেশি ও বিদেশি কাঠের সবই মিলবে পুরান ঢাকার ফরাশগঞ্জে। এখানে বেশ কিছু করাতকলও আছে। তাই গাছের বড় টুকরা যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনমাফিক কাঠ করাতকলে কাটিয়ে নিতে পারেন ক্রেতারা। ঢাকায় এটিই সবচেয়ে বড় কাঠের পাইকারি ও খুচরা বাজার।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানালেন, ব্রিটিশ শাসনামলে বুড়িগঙ্গার তীরেঘেঁষা ফরাশগঞ্জে কাঠের বাজারটি গড়ে ওঠে। তখন চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে নদীপথে ও রেলপথে কাঠ আসত। সেই কাঠ ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যেতেন। তবে দিন বদলেছে। রেল ও নদীপথে সস্তায় কাঠ আনা বন্ধ হয়ে গেছে। কাঠের বিকল্প হিসেবে প্লাস্টিক, প্লাইউড ও ইস্পাতের ব্যবহার বাড়ছে। এ ছাড়া মিরপুর, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কাঠের বাজার গড়ে উঠেছে। সে জন্য ফরাশগঞ্জের কাঠের ব্যবসার পরিধি ছোট হয়ে আসছে।
সূত্রাপুর থানা ডানে রেখে সামনে এগিয়ে গেলেই ফরাশগঞ্জের উল্টিনগঞ্জ লেনের দুপাশে সারি সারি কাঠের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বড় প্রতিষ্ঠানে গুদামে বিভিন্ন জাতের গাছের বড় টুকরা ও কাঠের টুকরা ছাড়াও আছে এক বা একাধিক করাতকল। এসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও করাতকলে কাজ করেন ৮-১০ হাজার শ্রমিক। প্রতি রাতেই চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঠ নিয়ে ফরাশগঞ্জে আসে ১০-১৫টি ট্রাক। এখানকার শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দিনে ২-৩ কোটি টাকার কাঠ, কাঠের দরজা-জানালা ও চৌকাঠ বিক্রি হয় বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা।
ফরাশগঞ্জের পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এইচএ টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজ। ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দেশি চিটাগাং টিক, জারুল, টিক চাম্বুল, চাপালিশ, শিল কড়ই এবং বিদেশি বার্মাটিক, রেড ওক, বিচসহ বিভিন্ন জাতের কাঠ বিক্রি হয়। মিয়ানমার, জার্মানি, কানাডা ও আফ্রিকা অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ থেকে কাঠ আমদানি করে তারা। প্রতিষ্ঠানটিতে ৪০-৫০ জন দিনমজুর ও ১০-১২ জন কাঠমিস্ত্রি কাজ করেন।
এইচএ টিম্বারের দুটি যন্ত্রচালিত করাতকল এবং গাজীপুরে সিজনিং বা কাঠ শুষ্ককরণ প্রকল্প আছে। সিজন হচ্ছে কাঠের ভেতরের পানি বের করতে যন্ত্রের মাধ্যমে শুকানোর প্রক্রিয়া। এতে কাঠের আয়ুষ্কাল বাড়ে। ঘুণে ধরে না। বর্ষায় কাঠ ফোলে না কিংবা শীতে বেঁকে যায় না।
এইচএ টিম্বারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘কাঠের অনেক বিকল্প বের হয়েছে। তারপরও নতুন বাড়ি নির্মাণ, করপোরেট প্রতিষ্ঠান এবং অফিস ও গৃহসজ্জার কাজ করার জন্য আমাদের কাছ থেকে কাঠ কেনেন অনেকে। সব মিলিয়ে মাসে গড়ে ৬-৭ হাজার ঘনফুট কাঠ বিক্রি হয়। তবে দেড় দশক আগেও পরিমাণটি অনেক বেশি ছিল।’
মাহফুজুর রহমান আরও বলেন, ‘নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত নদীপথ এবং ২০০৫ সাল পর্যন্ত রেলপথে ফরাশগঞ্জে কাঠ আসত। এসব বন্ধ হওয়ায় খরচ বেড়েছে। অন্তত রেলপথে গেন্ডারিয়া পর্যন্ত কাঠ পরিবহনের ব্যবস্থাটি চালু করা গেলে খরচ কিছুটা কমবে। ফরাশগঞ্জ আবার চাঙা হয়ে উঠবে।’ তিনি বলেন, দেশি কাঠের চেয়ে আমদানি করা কাঠই বর্তমানে বেশি বিক্রি হয়। তাই শুল্কহার কমানো গেলে কাঠের দাম আরও কমবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গত রোববার পুরো এলাকা ঘুরে দেখা গেল, ছোট আকারের বেশ কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে দরজা-জানালার চৌকাঠ বিক্রি হচ্ছে। কয়েকটি করাতকলে কাঠ চেরাইয়ে ব্যস্ত শ্রমিকেরা। উল্টিনগঞ্জ লেনের শেষ মাথায় বাকল্যান্ড বাঁধ ও বুড়িগঙ্গা নদী। সেখানে বড়সড় একটি ঘাট আছে। এলাকার লোকজন গোসল ও কাপড় ধোঁয়ার কাজ করলেও নব্বইয়ের দশকে এই ঘাটেই চট্টগ্রাম থেকে কাঠবাহী নৌকা আসত। বাঁধের ওপর করাত দিয়ে মোটাসোটা একটি গাছ কাটতে কাটতে এমনটাই জানালেন শ্রমিক শিমুল হোসেন।
শিমুল জানালেন, ট্রাক থেকে প্রতি ঘনফুট কাঠ গুদামে নিতে শ্রমিকেরা ১২ টাকা, মাপজোখ করতে প্রতি ঘনফুটে ২ টাকা এবং করাতকলে কাটতে ১০ টাকা মজুরি পান। সব মিলিয়ে মাসে সর্বোচ্চ ১০-১২ হাজার টাকা আয় করতে পারেন শ্রমিকেরা।
ফরাশগঞ্জে দীর্ঘদিন চাকরি করার পর ১৯৯৯ সালে নিজেই কাঠের ব্যবসায় নামেন স্বাধীন আহমেদ। প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীন টিম্বার। প্রতিষ্ঠানটি থেকে মাসে গড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ ঘনফুট টিক চাম্বুল, সেগুন ও বার্মাটিক কাঠ বেশি বিক্রি হয়।
জানতে চাইলে স্বাধীন আহমেদ বলেন, সাধারণত মানুষ শীতের সময় নতুন বাড়িঘরে দরজা-জানলার কাজ করান। সে জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত কাঠের ব্যবসা খানিকটা ভালো হয়। তবে বিভিন্ন এলাকায় কাঠ বিক্রির ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় যানজট ঠেলে নতুন ঢাকার লোকজন খুব একটা ফরাশগঞ্জে সহজে আসতে চান না।
চিটাগাং উড ইন্ডাস্ট্রিজ পাইকারদের কাছে কাঠ বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী জমির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, মাপে সঠিক ও ভেজালবিহীন কাঠ বিক্রিতে ফরাশগঞ্জের সুনাম আছে। তাই যাঁরা জানেন, তাঁরা কাঠ কিনতে এখানে আসেন। পুরান ঢাকার যানজট কমানো গেলে ফরাশগঞ্জের কাঠের ব্যবসা কিছুটা হলেও চাঙা হবে বলে মনে করেন তিনি।