মার্কিন ডলার ও সোনার মতো ডিমের দামও প্রতিদিন সকালে নির্ধারিত হয়। দেশের তিনটি জায়গায় মূলত ডিমের দর ঠিক করা হয়।

প্রতিদিন সকালে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম নির্ধারণ করা হয়। প্রতিটি ব্যাংকের ওয়েবসাইটে সকালেই ডলারের নতুন দর ভেসে ওঠে। সারা পৃথিবীতে স্বর্ণের দরও প্রতিদিন সকালেই ওয়েবসাইটে নতুন করে জানিয়ে দেওয়া হয়। একইভাবে সকালবেলায় ডিমেরও নতুন দর জানা যায়। দেশে দৈনিক নতুন দামে ডিম বিক্রি হয়। কোনো দিন বাড়ে, কোনো দিন কমে। আবার কোনো দিন হয়তো অপরিবর্তিত থাকে।
ডলার ও সোনার মতো প্রতিদিন ডিমের দাম কীভাবে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে, তা নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল থাকতে পারে। তাঁদের মনে প্রশ্নও জাগতে পারে, ডিম তো ডলার বা সোনাদানা নয়, তাহলে দৈনিক কে এর দাম কমাতে–বাড়াতে বসেন? আসুন, প্রশ্নটির মুখস্থ উত্তর শুনুন ডিম ব্যবসায়ীদের মুখে। তাঁরা জানান, দেশের তিনটি জায়গায় ডিমের দর বাঁধা হয়। এই দরকে কেন্দ্র করেই দেশব্যাপী ডিমের দর ওঠানামা করে। জায়গা তিনটি হলো রাজশাহী, ঢাকা ও কিশোরগঞ্জ। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, পাবনাতেও দর বাঁধা হয়। তবে তার প্রভাব বাজারে পড়ে না। আরেক দল ব্যবসায়ীর মতে, কিশোরগঞ্জেও ঢাকার দরেই বেচাকেনা হয়। পাইকারি দরের সঙ্গে খুচরা ব্যবসায়ীরা পরিবহন খরচ ও মুনাফা যোগ করে বিক্রি করেন।
সিলেটের ডিম ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সুমনের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজশাহী, ঢাকা ও কিশোরগঞ্জের আড়তদারেরা সারা দেশের ডিমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এই তিন জায়গার দরকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ডিমের বাজার আবর্তিত হয়। পাবনাতেও ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাজারে তার প্রভাব খুবই কম।
মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে মোহাম্মদ সুমন জানান, সিলেটের জুড়ি ও বড়লেখায় তাঁর ডিমের আড়ত রয়েছে। তিনি এক দিন পরপর রাজশাহী থেকে ৮০ হাজার করে ডিম নেন। সুমন বলেন, রাজশাহীতে যে দর বাঁধা হয়, তা ঢাকার তুলনায় প্রতি ডিমে ২০ থেকে ৩০ পয়সা কম হয়। আবার কিশোরগঞ্জে যে দর বাঁধা হয়, তা ঢাকার চেয়ে কিছু বেশি হয়। সিলেট চলে ঢাকার দরে। সেখানে আলাদা করে ডিমের দর বাঁধা হয় না। সুমন মনে করেন, এখন বাজারে ডিমের যে দাম চলছে, তাতে খামারিদের মুখে হাসি ফুটেছে। তাঁরা দুইটা পয়সার মুখ দেখছেন। বাজারে একটু টান আছে। গত ঈদের মধ্যে তাঁরা খুব লোকসানের শিকার হয়েছেন।
সিলেটের ব্যবসায়ী আবু সুফিয়ানের আড়ত রাজশাহীতে। তিনিও জানান, কিশোরগঞ্জেও ঢাকার দরই চলে। তবে কিশোরগঞ্জের দর ঢাকার চেয়ে একটু কমই থাকে। মূলত ঢাকার আড়তদার সমিতি বসে প্রতিদিন ডিমের দাম নির্ধারণ করে। চাহিদা বেশি থাকলে দাম বাড়ানো হয়। চাহিদা কম থাকলে দাম কমানো হয়। কারণ, ডিম মজুত করা যায় না। প্রতিদিনই বিক্রি করে দিতে হয়। এ ব্যাপারে ঢাকার আড়তদার সমিতির কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ডিমের বাজারদরের এসব তথ্য জানা গেল রাজশাহী শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার পূর্ব দিকে জেলার পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের মোসলেমের মোড়ের একটি আড়তে। রাজশাহী শহর বাইপাস সড়কের পাশের এই মোড়ে বড় কোনো দোকানপাট নেই। বাইপাস সড়ক চালু হওয়ার পর মোসলেম নামের এক ব্যক্তি রাস্তার পাশে বটতলায় একটি ছোট্ট দোকান খুলে বসেছিলেন। তারপর থেকে এই মোড়ের নাম হয়ে যায় মোসলেমের মোড়। এখানেই রয়েছে ‘মোসলেমের মোড় ডিম আড়ত সমিতির সভাপতি’র দোকান। এই দোকানে বসেই প্রতিদিন রাজশাহীর ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয়। সভাপতির দোকানের ব্যবস্থাপক মো. নাসির উদ্দিন প্রতিদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ১১০ জন ডিম ব্যবসায়ীর ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে ডিমের নতুন দর জানিয়ে দেন। ২৬ আগস্ট তাঁর মোবাইলের খুদে বার্তা থেকে জানা যায়, ওই দিন সাদা ডিমের দর বাঁধা হয়েছে ৬ টাকা ৭০ পয়সা আর লাল ডিমের দাম সাড়ে ৭ টাকা। ১ আগস্ট সাদা ডিমের দর ছিল ৫ টাকা ৬০ পয়সা, আর লাল ডিমের দর ছিল ৭ টাকা। ২৭ জুলাই সাদা ডিমের দাম ছিল ৪ টাকা ৭০ পয়সা, আর লাল ডিমের দাম ছিল ৬ টাকা ১০ পয়সা।
মোসলেমের মোড় ডিম আড়ত সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে জানান, জুলাই মাসের ওই সময়ে ডিমের দাম পড়ে গিয়ে খামারিরা পথে বসে যান। ডিমের দাম নির্ধারণের ব্যাপারে তিনি জানান, চাহিদা অনুযায়ী ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয়। যখন বাজারে টান থাকে তখন দাম বাড়ানো হয়। মোবাইলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হয়। সবাই ঢাকার দরটি জেনে নেন। তারপর দরাদরি শুরু করেন। ব্যবসায়ীদের চাহিদা জানার পর ডিমের দাম নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত ৫০ পয়সার বেশি দাম বাড়াতে বা কমাতে হলে সমিতির সদস্যদের বৈঠক ডাকা হয়। তা ছাড়া ফোনে কথা বলে সভাপতি হিসেবে তিনি একটা দাম ঠিক করে দেন, যা তাঁর নামে ব্যবসায়ীদের ফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে দেন ব্যবস্থাপক মো. নাসির উদ্দিন।
সভাপতির দোকানেই ছিলেন রাজশাহী পোলট্রি ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান কামাল হোসেন। তিনি জানান, ২০১৭ সালের জুন থেকে তাঁরা মোসলেমের মোড়ে বসে ডিমের দাম বাঁধছেন।
কামাল হোসেন আরও বলেন, রাজশাহীর পবা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর ও চারঘাটের অংশবিশেষ নিয়ে তাঁদের সমিতির এলাকা। বর্তমানে তাঁদের ১৯ থেকে ২০ লাখ ডিম পাড়া মুরগি রয়েছে। এখন প্রতিদিন মোসলেমের মোড় থেকে সারা দেশে ১২ লাখ ডিম পাঠানো হয়। এ ছাড়া জেলার বাগমারার ভবানীগঞ্জে এ রকম আরও একটি মোকাম রয়েছে। সেখান থেকেও বিভিন্ন অঞ্চলে ডিম যায়। কখনো কখনো কক্সবাজারেও রাজশাহীর ডিম যায়।