বিনিয়োগ

মহামারিতে বড় বিনিয়োগে ডিবিএল গ্রুপ

ডিবিএল সিরামিকের কারখানা
 ছবি: ডিবিএলের সৌজন্যে

করোনাকালে অনেক প্রতিষ্ঠান যেখানে টিকে থাকতে সংগ্রাম করছে, সেখানে নতুন বিনিয়োগের পথে হাঁটছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড বা ডিবিএল। মহামারির এই সময়ে বস্ত্র ও সিরামিক খাতে তারা নতুন করে বিনিয়োগ করছে ৯১২ কোটি টাকা। এতে ২ হাজার ১৭৫ মানুষের কর্মসংস্থান হবে।

দেড় বছর ধরে চলমান মহামারিতে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের ব্যবসায় চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুযোগও তৈরি হয়েছে। সেটি কাজে লাগাতে ডিবিএল গ্রুপ তাদের মতিন স্পিনিং মিলসের ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে। বিদ্যমান ইউনিটের পাশাপাশি নতুন করে স্পেশাল ইয়ার্ন ইউনিট স্থাপন করছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন এ ইউনিটে ম্যানমেইড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুসহ বিশেষায়িত বেশ কিছু সুতা উৎপাদন হবে। তার জন্য বিনিয়োগ হচ্ছে ২ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। ৪ শতাংশ সুদে এই অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে জার্মান ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউট (ডিইজি)।

এ ছাড়া ডিবিএল গ্রুপ তাদের হামজা টেক্সটাইলের দ্বিতীয় ইউনিটে বিশেষায়িত সুতা-কাপড় ডায়িং ও ফিনিশিংয়ের জন্য ৪ কোটি ৪৩ লাখ ডলার বা ৩৭৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। ৪ শতাংশ সুদে এই অর্থ দিচ্ছে ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)।

নতুন এই দুই ইউনিটে বিনিয়োগে প্রায় ২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। রপ্তানিও বাড়বে। চলতি বছরই সম্প্রসারিত দুই ইউনিটের উৎপাদন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটি হলে কৃত্রিম তন্তু উৎপাদনে আরেক ধাপ এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দিনে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকই বিশ্বব্যাপী ছড়ি ঘোরাবে। এ কারণে প্রতিযোগী অনেক দেশ কৃত্রিম তন্তুতে বড় ধরনের বিনিয়োগ করলেও বাংলাদেশে এখনো এ খাতে আশানুরূপ বিনিয়োগ হচ্ছে না।

১৯৯১ সালে ঢাকার ১০২ গ্রিন রোডে ছোট কারখানা দিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি আজকের ডিবিএল গ্রুপ। পোশাক দিয়ে শুরু হলেও গত ২৯ বছরের ব্যবসায় সিরামিক টাইলস, তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও ড্রেজিং ব্যবসায় নাম লিখিয়েছে তারা। ওষুধ ব্যবসায়ও আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

ডিবিএলের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমানে ২৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন ৩৯ হাজার কর্মী। ২০১৯-২০ অর্থবছরে গ্রুপের বার্ষিক লেনদেন ছিল প্রায় ৬৫ কোটি মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৫ হাজার ৫২৫ কোটি টাকার সমান। এর মধ্যে তৈরি পোশাক ব্যবসা থেকেই এসেছে ৯০ শতাংশ অর্থ।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ আবদুল কুদ্দুস দুলালের নামেই প্রতিষ্ঠান শুরু করেন তাঁর ছোট চার ভাই—আবদুল ওয়াহেদ, এম এ জব্বার, এম এ রহিম ও এম এ কাদের। তাঁরা যথাক্রমে ডিবিএল গ্রুপের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), ভাইস চেয়ারম্যান ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)।

পোশাকের ব্যবসা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক কারখানা করেছে ডিবিএল। এসব কারখানা নির্মাণের সময় দেখা গেল, সময়মতো টাইলস দিতে পারছে না সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। নতুন সমস্যা। সমাধান কী? তখন ভাবতে ভাবতে নিজেরাই সিরামিক টাইলস কারখানা করার পরিকল্পনা করলেন চার ভাই। যেই ভাবা সেই কাজ।

টাইলসের বাজারের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে গাজীপুরের মাওনায় ৩০ একর জমির ওপর ডিবিএল সিরামিক কারখানা নির্মাণ করে। উৎপাদন শুরু হয় ২০১৭ সালের এপ্রিলে। কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা দিনে ৪৫ হাজার বর্গমিটার টাইলস। দ্রুত তারা দেশের সিরামিক খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হয়েছে।

বস্ত্র খাতের বাইরে সিরামিক খাতে ৩৫০ কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ করছে ডিবিএল গ্রুপ। স্থানীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া এই ঋণ কারখানা সম্প্রসারণে ব্যয় করা হবে। আগামী জানুয়ারিতে উৎপাদনে যাবে সম্প্রসারিত ইউনিটটি। তাতে নতুন করে ১৭৫ জনের কর্মসংস্থান হবে।

জানতে চাইলে ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার প্রথম আলোকে বলেন, ‘চীন থেকে আমরা বেশ কিছু বিশেষায়িত সুতা আমদানি করি। তবে জাহাজসংকট ও কনটেইনার ভাড়া বৃদ্ধির কারণে সেই পণ্য সময়মতো পাওয়া যাচ্ছিল না। সে কারণে লিড টাইমের মধ্যে পোশাক জাহাজীকরণে সমস্যা হচ্ছে। তা ছাড়া চীন থেকে নতুন কিছু পোশাকের ক্রয়াদেশ বাংলাদেশে আসছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘করোনাকালে অনেকগুলো বিষয় বিবেচনায় আমাদের বিনিয়োগে সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে।’

এম এ জব্বার বলেন, ‘কাশিমপুরে হামজা টেক্সটাইল ও মতিন স্পিনিংয়ের সম্প্রসারিত ইউনিট দুটি যথাক্রমে আগস্ট ও ডিসেম্বরে উৎপাদনে যাবে। ম্যানমেইড ফাইবার, ব্লেন্ডসহ আমাদের কিছু উদ্ভাবিত সুতা নতুন কারখানায় উৎপাদন হবে। তা ছাড়া ডায়িং ইউনিটে পলিস্টার ও সিনথেটিক কাপড় রং করা হবে। কিছু বিশেষ ধরনের ফিনিশিং প্রক্রিয়াও থাকবে সেখানে।’