
করোনার ধাক্কা সামাল দিতে মার্চে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে আমিও ঢাকা ছেড়ে আমার গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। চট্টগ্রামের মোহরায় গ্রামের বাড়িতে বসেই ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বিস্তৃত ব্যবসা পরিচালনা করেছি। এখনো এভাবেই চলছে। কারখানা বা কার্যালয়ে না গিয়েও যে কারখানা ও ব্যবসা পরিচালনা করা যায়, সেটি এ করোনাকাল আমাদের শিখিয়েছে। আমি মনে করি, এতে সময়ের অপচয় কমেছে। আমি দেখেছি, স্বাভাবিক সময়ে আমাদের গাজীপুরের কারখানায় যাওয়া–আসাতেই আমার চার ঘণ্টার বেশি সময় রাস্তায় কেটে যেত। এখন সেই ঝামেলা নেই। প্রতিদিন নিয়ম করে অনলাইনে সভা করছি। সবার সঙ্গে কথা বলছি। দিকনির্দেশনা দিচ্ছি। ব্যবসা পরিচালনায় কোথাও কোনো অসুবিধা বোধ করছি না। আমি মনে করি, আমাদের উদ্যোক্তারা অনলাইনে ব্যবসা পরিচালনার এ ব্যবস্থা আগামী দিনেও অব্যাহত রাখবেন।
তবে করোনার কারণে ব্যবসা–বাণিজ্যে বড় ধরনের বিপর্যয়ের পরও কোনো খাতেই সে ধরনের কোনো অসন্তোষ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। এটি আমাদের সবার জন্য মঙ্গলজনক। আমাদের সবচেয়ে বেশি শ্রমঘন শিল্প খাত পোশাক। করোনার একেবারে প্রথম পর্যায়ে এ খাতের জন্য সরকার বিশেষ তহবিলের ঘোষণা দেয়। শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্যই মূলত এ তহবিল গঠন করা হয়েছিল। সরকারের সেই উদ্যোগ পুরো পোশাকশিল্প খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করেছে।
করোনার কারণে সার্বিকভাবে ব্যবসা–বাণিজ্যের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, ব্যবসা স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসার পরও তা কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। ব্যবসায়ীরা যাতে দ্রুত ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেন, এ জন্য সরকারের প্রণোদনা সুবিধা ও ব্যাংকঋণ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সময় দিতে হবে। এ মুহূর্তে ব্যবসায়ীদের ওপর যদি ব্যাংকঋণ ফেরত দেওয়ার চাপ তৈরি হয়, তাহলে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।
তৈরি পোশাক ছাড়াও খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে। পোশাকের ব্যবসা গত কয়েক মাসে কিছুটা ভালো হলেও গত মাস থেকে আবার কিছুটা খারাপ হতে শুরু করেছে। এ ছাড়া নিজেদের খাদ্যপণ্যের ব্যবসার অভিজ্ঞতা থেকে দেখছি, এ খাতের ব্যবসার ৪০ শতাংশও এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি। ব্যবসার অবস্থা খারাপ হলেও আমরা আমাদের কোনো শ্রমিকের বেতন দিতে দেরি করিনি। আমাদের প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তা–কর্মচারীকে চাকরিচ্যুতও করিনি। বর্তমানে আমাদের প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। পোশাক, বস্ত্র, খাদ্যপণ্য, সেবা খাতসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা রয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানটি খুব ছোট পর্যায় থেকে আজকের অবস্থানে এসেছে। সমাজে আজ আমাদের যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা ব্যবসার সুবাদে। তাই আমরা ঠিক করেছিলাম, যতক্ষণ সামর্থ্য আছে, ততক্ষণ পর্যন্ত শ্রমিক–কর্মচারীদের পাওনা দিয়ে যাব। প্রয়োজনে নিজেরা ঋণ করে, ধারদেনা করে হলেও এ কাজ করব। তবে সরকার এগিয়ে আসায় আমাদের খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।
করোনার কারণে শুরুতে কয়েক মাস শ্রমিক–কর্মচারীদের মধ্যে ভয়ভীতি ও আতঙ্ক কাজ করলেও সময়ের ব্যবধানে তা কেটে যায়। শ্রমিকেরা কাজে ফিরে আসেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়েছে ঠিকই কিন্তু অর্থনীতির ঝুঁকি অনেক কমে গেছে। পাশাপাশি আমরা দেখেছি, গ্রামগঞ্জের হাটবাজার এ করোনাকালেও বেশ সচল ছিল। এর ফলে গ্রামগঞ্জে চাহিদার খুব বেশি তারতম্য হয়নি। এটিই আমাদের অর্থনীতি ও ব্যবসা–বাণিজ্যের জন্য একটি বড় শক্তির দিক।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। তবে আমি মনে করি, গত কয়েক মাসে আমাদের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে আমরা আগামী দিনগুলোর চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে সক্ষম হব।