ব্যবসায়ী সংগঠন এমসিসিআই ও গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথভাবে আয়োজিত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে অতিথিরা। আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে
ব্যবসায়ী সংগঠন এমসিসিআই ও গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের যৌথভাবে আয়োজিত প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে অতিথিরা। আজ সোমবার রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে

এমসিসিআইয়ের প্রকাশনা

অর্থনীতিতে এখন সাত বড় চ্যালেঞ্জ

নতুন সরকারের সামনে দেশের অর্থনীতি নিয়ে সাতটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ; দুর্বল রাজস্ব ও ঋণ ব্যবস্থাপনা; ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিসহ আর্থিক খাতের ঝুঁকি; সীমিত রপ্তানি বৈচিত্র্য; দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ ও কম বেসরকারি বিনিয়োগ; জ্বালানি–সংকট ও ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান ও দক্ষতার ঘাটতি।

আজ সোমবার ‘বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পুনরুজ্জীবন: নতুন সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এ কথা বলা হয়েছে। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।

রাজধানীর গুলশানে এমসিসিআই কার্যালয়ে আয়োজিত এই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন দৈনিক বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ ও এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। আরও উপস্থিত ছিলেন এমসিসিআইয়ের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এন করিম ও সাবেক সভাপতি এম আনিস উদ দৌলা প্রমুখ।

এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান তাঁদের প্রতিবেদনে প্রকাশিত সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তথা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব করেন।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন

মূল প্রবন্ধে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, নতুন রাজনৈতিক সরকার একটি সংকটাপন্ন রাজনৈতিক অবস্থায় তাদের কার্যক্রম শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যেই সংস্কারপ্রক্রিয়ার সূচনা করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারা পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে। তবে এই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে কাজ হবে না; বরং সমন্বিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সংস্কার প্রয়োজন।

জ্বালানিনিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ

অনুষ্ঠানে জ্বালানি–সংকট নিয়ে কথা বলেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দেশে অনেক দিন ধরে সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো সংক্ষিপ্তকালীন সংকট মোকাবিলার (শর্ট-টার্মিজম) দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করছে। এ ধরনের মনোভাব দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করে। আমাদের জ্বালানিনিরাপত্তা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।’

উদাহরণ দিয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমরা বঙ্গোপসাগরের সীমা নির্ধারণের কাজ করেছি, সমুদ্র বিজয়ের সেমিনার করেছি, কিন্তু গ্যাস অনুসন্ধান বা এক্সপ্লোরেশন নিয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। পাশের দেশ মিয়ানমার পুরোপুরি অনুসন্ধান করে ফেলেছে। সুতরাং প্রতিটি সংকট মোকাবিলার জন্য আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) তৈরি করতে হবে। তা না হলে আমরা “শর্ট-টার্মিজমের” মধ্যে আটকে থাকব।’

জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি থাকা দরকার। শুধু উন্নত দেশগুলোর মডেল অনুসরণ না করে আফ্রিকার কিছু সফল দেশের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে, যেমন রুয়ান্ডার কিগালি শহরের উন্নয়ন। মূলত জনগণের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করলে বাংলাদেশ দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

হয়রানির প্রভাব দুর্নীতির চেয়েও বেশি

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘হয়রানি রাষ্ট্রের একটি কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য (সমস্যা)। যদি কোনো অনুমোদন এক দিনের মধ্যে দেওয়ার কথা থাকে, কিন্তু সেটা এক মাসে দেওয়া হয়, এই হয়রানির প্রভাব দুর্নীতির চেয়েও বেশি।’

হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সুশাসনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো কাজের ধীরগতি। অবশ্যই আমাদের কাজের গতি বাড়াতে হবে। কিন্তু সেটি অবৈধ পথে নয়, যথাযথ ও নৈতিক উপায়ে তা করতে হবে।’

আমলাতন্ত্রের বিষয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ নিয়ে অনেকে কথা বলেছেন। অনেকের প্রত্যাশার সঙ্গে এটি মেলেনি। আবার যে প্রক্রিয়ায় সাবেক গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া হয়, সেটিও যথাযথ ছিল না। কিন্তু সরকার চাইলে আমলাতন্ত্রকে পরিচালিত করতে যে কাউকেই নিয়োগ দিতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন মাসেই আমরা বলেছিলাম যে তারা আমলাতন্ত্রকে ঠিকভাবে পরিচালিত করতে পারছে না। নতুন সরকারের জন্যও এটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে।’

রাষ্ট্রায়ত্ত বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ফরেনসিক অডিট করার পরামর্শ দেন বণিক বার্তা সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর ফরেনসিক অডিট করা অত্যন্ত জরুরি। বিপিসি, পেট্রোবাংলা, সরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে নতুন সরকারের স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে, কিন্তু এ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা বা তদন্ত হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারও কাজটি করতে পারেনি। রাষ্ট্রের সেবা প্রদানের সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায়বদ্ধতার বাস্তব চিত্র জানা অত্যন্ত জরুরি।