বাংলাদেশ বর্তমানে এক আর্থিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। গত ৭ মাসে ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ঘাটতি। এর মধ্যে নতুন সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি—ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণের সুদ মওকুফ এবং খাল খনন—বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তাতে বড় ধরনের ঋণজালের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ অবস্থায় টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে নতুন সরকারকে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যয় ও দক্ষতার সঙ্গে রাজস্ব আদায় করতে হবে। আমাদের এমন একটি কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, যেখানে করদাতাদের নিছক আয়ের উৎস হিসেবে না দেখে দেশ গড়ার অংশীদার হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে। সে জন্য রাজস্ব কাঠামো আধুনিকায়নে তিনটি স্তম্ভের কৌশলগত রূপরেখা অনুসরণ করা যেতে পারে। এই তিন স্তম্ভ হচ্ছে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন বা রূপান্তর, কাঠামোগত সংস্কার এবং করজাল ও করভিত্তির সংস্কার। এই তিন স্তম্ভ নিয়ে এবার বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
১. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে আয়কর, মূসক ও কাস্টমসের আন্ত তথ্য সংযোগ স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি গড়ে তুলতে হবে এনবিআরের সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি ডেটাবেজের সংযোগ। তাতে আয়কর রিটার্ন সিস্টেমে তৈরি হয়ে যাবে, করদাতা শুধু প্রয়োজনীয় সংশোধন করবেন। করদাতার সঙ্গে এবং বিভাগীয় সব কার্যক্রম অনলাইনে সম্পাদন হবে। এসব সংযোগ গড়ে তোলা গেলে তাতে আয় এবং সম্পদের যাচাই–বাছাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি বা ঘুষ লেনদেনের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
২. সঠিক ও সিস্টেম জেনারেটেড ভ্যাট চালান বা ই-ইনভয়েস প্রদান সাপেক্ষে পরিশোধিত ভ্যাটের একটি অংশ নাগরিকদের সরাসরি কর ফেরত হিসেবে দাবি করার সুযোগ দিতে হবে। সেটি হলে দেশের প্রত্যেক নাগরিক রাষ্ট্রের একজন সক্রিয় নিরীক্ষক হিসেবে কাজ করবেন। ভ্যাট কাজ করে ব্যবসার মোট বিক্রির ওপর, আর আয়কর কাজ করে নিট মুনাফার ওপর। বিক্রির সঠিক হিসাব নিশ্চিত করতে পারলে, নিট মুনাফার হিসাব খুব সহজেই ও নির্ভুলভাবে বের করা সম্ভব হবে।
৩. বাংলাদেশ ব্যাংকে সেন্ট্রাল ক্যাশলেস ইউনিট গঠনের বাস্তবায়ন দ্রুত করতে হবে, যা করপোরেট ও ব্যবসায়িক লেনদেনকে স্বচ্ছ ও ডিজিটাল কাঠামোর দিকে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে। নগদবিহীন লেনদেনের যেসব আইনি বিধান কর আইনে রয়েছে, তা আক্ষরিক অর্থে বাস্তবায়ন করতে হবে।
সরকারের কাঠামো যৌক্তিক আকারে আনা এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকার উভয়ের জন্য ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ বা ব্যবসায়ের ব্যয় কমানো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে আয়কর ও ভ্যাট বিভাগকে একীভূত করে একটি একক ও সুসংহত সমন্বিত রাজস্ব কর্তৃপক্ষ গঠন করা জরুরি। এ ছাড়া অতিদ্রুত নিচের কাঠামোগত সংস্কারগুলো করতে হবে। যেমন
ক. করনীতি ও করনীতি বাস্তবায়ন দুটি আলাদা প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত করা।
খ. আয়কর বিভাগের বিদ্যমান কাঠামো-সার্কেলব্যবস্থার বিপরীতে কার্যকর বা সুনির্দিষ্ট কর্মভিত্তিক করতে হবে; অর্থাৎ ২২টি সার্কেলে সবাই একই ও সব কাজের পরিবর্তে অডিট, গোয়েন্দা, বিরোধ নিষ্পত্তি, করদাতা সেবা, বকেয়া আদায় ইত্যাদি সুনির্দিষ্ট কর্মভিত্তিক টিমে বিভক্ত করতে হবে।
গ. অডিট বা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে কাস্টমস, ভ্যাট ও কর—তিনটি নিরীক্ষা একই সঙ্গে সম্পন্ন করতে হবে।
১. দেশে বর্তমানে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি ই-টিআইএনধারী রয়েছেন। অথচ মাত্র ৪০ লাখের কিছু বেশি করদাতা নিয়মিত রিটার্ন দেন। আইনে রিটার্ন জমা নিশ্চিত করার বিধান থাকলেও তার প্রয়োগ এখনো বেশ দুর্বল। একইভাবে, দেশে ভ্যাট নিবন্ধিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭ লাখের কিছু বেশি। তাদের মধ্যে মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করে। তাই কার্যকর করজাল তৈরিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন
ক. বিদ্যমান টিআইএন ও বিআইএন ডেটাবেজ পুনর্গঠন করে প্রকৃত নিবন্ধিত করদাতার সংখ্যা নিশ্চিত করা। এ দুটি ডেটাবেজ থেকে মৃত, বন্ধ ও বাস্তব অস্তিত্ববিহীন করদাতা বা কাগুজে করদাতাদের বাদ দিয়ে বাকি করদাতাদের রিটার্ন দাখিল নিশ্চিত করা।
খ. তৃতীয় পক্ষের ডেটা সম্পূর্ণভাবে ডিজিটালি সংগ্রহ ও বিশ্লেষণপূর্বক নতুন করদাতা শনাক্ত করতে হবে।
গ. রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (পিএসআর) ভেরিফিকেশন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
ঘ. ভ্যাট নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও পিএসআরের মতো পিএসভিআর ভেরিফিকেশন চালু করা যেতে পারে।
২. রাজস্বের ভিত্তি সম্প্রসারিত করতে ঢালাও কর অব্যাহতি সুবিধা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়া। বিদ্যমান সব আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক অব্যাহতি জাতীয় বৃহত্তর স্বার্থ বা কৌশলের অনুকূলে কাজ করছে কি না, তা কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। এসব করছাড়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। সব ধরনের অব্যাহতির ক্ষেত্রে একটি বাধ্যতামূলক মেয়াদোত্তীর্ণের সময়সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।
৩. আয়কর, ভ্যাট এবং শুল্কের অত্যধিক হার অনেক সময়ই কর ফাঁকিকে উৎসাহিত করে এবং দুর্নীতি বাড়ায়। করের হার সাশ্রয়ী ও বাস্তবসম্মত করা হলে তা সবাইকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উৎসাহিত করবে।
৪. কর পরিপালনের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে কর পরিপালন বৃদ্ধির জন্য একটি গবেষণভিত্তিক রোডম্যাপ বা রূপকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
৫. কর কর্মকর্তাদের কর আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. কর পরিপালনের ক্ষেত্রে একটি ট্রাস্ট-বেজড বা বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ জন্য সংস্কার করতে হবে সব কর আইন। যার মাধ্যমে করদাতার পরিশোধিত অতিরিক্ত কর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরাসরি তার ব্যাংক হিসাবে ফেরতের বিধান করতে হবে।
৭. কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণের নিয়মকানুন সহজ করা এবং করের হার তাদের উপযোগী করতে হবে। এই খাতের উদ্যোক্তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্ত না করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করা সম্ভব। এসএমই এবং সিএমএসএমই খাতের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য প্রিজাম্পটিভ ট্যাক্স ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি চিন্তা করা যেতে পারে।
৮. সরকার চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত কিস্তি সুবিধাসহ নগদ অর্থ, অপ্রদর্শিত সম্পদ প্রদর্শনের জন্য শেষবারের মতো একটি সুযোগ দিতে পারে। তবে এই সময়সীমা পার হওয়ার পর রাষ্ট্রকে অবশ্যই কঠোর, নিরপেক্ষ এবং আপসহীন পরিদর্শনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
৯. নিরীক্ষা সিলেকশন ঝুঁকি ও তথ্যপ্রমাণভিত্তিক করতে হবে।
রাজস্ব আদায় বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে যাঁরা ইতিমধ্যে করজালের আওতায় আছেন, শুধু তাঁদের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ানো। তার বদলে ডিজিটালাইজেশন, কৌশলগত প্রণোদনা এবং কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী, বৈষম্যহীন এবং সম্পূর্ণ আধুনিক করব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
লেখক: পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস