সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেম
সেলিম রায়হান, নির্বাহী পরিচালক, সানেম

বিশ্লেষণ

নতুন গভর্নর: প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে একজন কস্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট (ব্যয় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে এফসিএমএ ডিগ্রিধারী) ও ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই বিস্তৃত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকার ব্যাংক খাত সংস্কারকে সত্যিই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে কি না, এ প্রশ্ন এখন শুধু নীতিনির্ধারক মহলেই নয়, সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও উচ্চারিত হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু মুদ্রানীতি প্রণয়নকারী একটি সংস্থা নয়; এটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক ও তদারকি কর্তৃপক্ষ, আর্থিক স্থিতিশীলতার শেষ ভরসা। এমন একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে কে আসছেন, তাঁর পেশাগত পটভূমি কী এবং তিনি কতটা স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এসব প্রশ্ন তাই স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্ব পায়, বিশেষত যখন ব্যাংক খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।

একজন ব্যবসায়িক পটভূমির ব্যক্তিকে এই দায়িত্বে বসানোর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য স্বার্থ-সংঘাতের আশঙ্কা উত্থাপিত হওয়াটাও অযৌক্তিক নয়। ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা অর্থনীতির বাস্তব চিত্র বুঝতে সহায়ক হতে পারে—এ কথা সত্য। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাজ করপোরেট স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা নয়; বরং প্রয়োজনে সেই স্বার্থের বিরুদ্ধেও কঠোর ও অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়া। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মুদ্রানীতির বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা এবং দুর্বল বা অনিয়মে জড়িত ব্যাংকের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার মতো দায়িত্ব পালনে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা কতটা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করা যাবে, সেটিই এখন মূল উদ্বেগের জায়গা।

এ বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল, যিনি সংস্কারের এজেন্ডাকে স্পষ্টভাবে সামনে আনতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নতুন নিয়োগ সেই প্রত্যাশা পূরণ করবে কি না, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাত ইতিমধ্যে বহুমাত্রিক সংকটে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের উচ্চহার, ঋণ পুনঃ তফসিলের অপব্যবহার, পরিচালনা পর্ষদে রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমিত কার্যকারিতা—এসব সমস্যা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করেছে। অনেক ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, যা আমানতকারীদের আস্থাকেও প্রভাবিত করছে। এ বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন ছিল, যিনি সংস্কারের এজেন্ডাকে স্পষ্টভাবে সামনে আনতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করবেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নতুন নিয়োগ সেই প্রত্যাশা পূরণ করবে কি না, তা এখন সময়ের অপেক্ষা।

বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক খাতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর সব পদক্ষেপের সঙ্গে সবাই একমত ছিলেন না, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু এটিও অস্বীকার করা কঠিন যে তিনি খেলাপি ঋণ ও সুশাসনের প্রশ্নে কিছু কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন।

অনেকের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে তিনি (আহসান এইচ মনসুর) যথেষ্ট নীতিগত ও রাজনৈতিক সমর্থন পাননি। ফলে কিছু ক্ষেত্রে তাঁকে একক উদ্যোগে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। তবু সংস্কারের প্রশ্নে একটি সক্রিয় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা ছিল বলেই তাঁর মেয়াদকে চিহ্নিত করা যায়। সেই প্রক্রিয়া হঠাৎ থেমে যাওয়া বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে ভিন্ন পথে মোড় নেওয়া স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের অবকাশ রাখে। তাঁর এ ধরনের বিদায় কোনোভাবেই কাম্য নয়।

সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলাদেশে ব্যাংক খাত সংস্কার বহু বছর ধরেই একটি জরুরি কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত। আন্তর্জাতিক সংস্থা, অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকেরা বারবার এ খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে সংস্কার বাস্তবায়ন সহজ হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে যে রাজনৈতিক অভিজাত, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং প্রশাসনের একটি অংশ মিলিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক সংস্কারবিরোধী জোট দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর রয়েছে। খেলাপি ঋণের কঠোর ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা জোরদার করার মতো পদক্ষেপগুলো তাই প্রায়ই বাধার মুখে পড়েছে। ফলে সংস্কারের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

শুধু নীতিগত বক্তব্য বা শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে আস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়; বাস্তব পদক্ষেপ ও কঠিন সিদ্ধান্তই প্রমাণ করবে ব্যাংক খাত সত্যিই সংস্কারের পথে এগোচ্ছে, নাকি আবারও আপসের রাজনীতির কাছে নতি স্বীকার করছে।

নতুন সরকারের প্রতি শুরু থেকেই একটি উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল যে তারা অতীতের প্রচলিত ধারা থেকে সরে এসে ব্যাংক খাতে কার্যকর ও টেকসই সংস্কার বাস্তবায়নে দৃঢ় অবস্থান নেবে। বিশেষ করে আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি অনেকের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছিল। তবে নতুন গভর্নর নিয়োগ সেই প্রত্যাশার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অনেকে এই নিয়োগকে সরকারের অঙ্গীকারের প্রথম বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন। এখন মূল প্রশ্ন হলো, নতুন নেতৃত্ব কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রমে কতটা দৃঢ়তা দেখাবেন। শুধু নীতিগত বক্তব্য বা শুভেচ্ছা বার্তা দিয়ে আস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়; বাস্তব পদক্ষেপ ও কঠিন সিদ্ধান্তই প্রমাণ করবে ব্যাংক খাত সত্যিই সংস্কারের পথে এগোচ্ছে, নাকি আবারও আপসের রাজনীতির কাছে নতি স্বীকার করছে।

  • সেলিম রায়হান, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নির্বাহী পরিচালক, সানেম